কেঁদে ফেরে ওসমান হাদীর আত্মা; দলগুলো ব্যস্ত ভোটের অংকে
নির্বাচনের তপ্ত হাওয়া বইছে দেশজুড়ে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িং রুম—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার। প্রতিটি দলই তাদের ইশতেহারে মোটা অক্ষরে লিখেছে—‘ক্ষমতায় গেলে দেশে আইনের শাসন ও প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ কিন্তু এই গালভরা প্রতিশ্রুতির অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক বিভীষিকাময় বাস্তবতা।
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অজ্ঞাত কারণে প্রাণ দিতে হলো এক ‘জুলাই যোদ্ধা’কে—যিনি গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে বুক পেতে দিয়েছিলেন স্বৈরাচারের গুলির সামনে। সেই বিপ্লবীর রক্ত এখনো শুকায়নি, অথচ ভোটের উৎসবে মত্ত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তার বিচার এখন ‘গৌণ’ বিষয়। যে যোদ্ধার আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে দলগুলো আজ মুক্ত বাতাসে রাজনীতির সুযোগ পাচ্ছে, সেই যোদ্ধার খুনের বিচার নিয়ে সবার এই রহস্যময় নীরবতা কি আগামীর বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে শুরুতেই ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে না? আরো পড়ুন: AI যুগের সেরা ১০ টি ফ্রিল্যান্সিং স্কিল
ইশতেহারের গোলকধাঁধা বনাম লাশের মিছিল
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা, বিগত আমলের সব হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রতিটি জনসভায় নেতারা বলছেন, “আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না।”
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে যখন একজন জুলাই যোদ্ধাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়, তখন কোনো দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে জোরালো কোনো প্রতিবাদ আসেনি। এমনকি নির্বাচনী ইশতেহারেও এই সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারের কোনো অঙ্গীকার স্থান পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো এখন ব্যস্ত ‘ক্ষমতার সমীকরণ’ মেলাতে। জুলাই যোদ্ধাদের আদর্শের চেয়ে তাদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচনে জয়লাভের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল। ফলে যে যোদ্ধারা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তারা আজ কেবলই ইশতেহারের শোভাবর্ধক শব্দে পরিণত হয়েছেন।

কেন বিচার হচ্ছে না?
জুলাই যোদ্ধার খুনের বিচার না হওয়ার পেছনে কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত কারণ দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা:
জোট ও সমঝোতার রাজনীতি: নির্বাচনের আগে দলগুলো বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করে। যদি এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা গোপন শক্তির হাত থাকে, তবে তাদের চটিয়ে নির্বাচনের মাঠে ঝুঁকিতে পড়তে চাইছে না কোনো পক্ষই।
বিপ্লবের ওপর নির্বাচনী রাজনীতির প্রাধান্য: জুলাই বিপ্লব ছিল একটি আদর্শিক লড়াই। কিন্তু নির্বাচন হলো সংখ্যার লড়াই। দলগুলো মনে করছে, এখন খুনের বিচার নিয়ে পড়ে থাকলে তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় ভাটা পড়তে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক নির্লিপ্ততা: অন্তর্বর্তীকালীন সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা পুরনো ব্যবস্থার দোসররা এই বিচার প্রক্রিয়াকে ধামাচাপা দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে।
ন্যায়বিচার কি আদৌ সম্ভব?
প্রশ্ন উঠেছে, যারা নির্বাচনের আগে নিজের সহযোদ্ধা বা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের খুনের বিচার নিশ্চিত করতে পারে না, তারা ক্ষমতায় গিয়ে কীভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে?
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, “ন্যায়বিচার কোনো সিজনাল বিষয় নয়। এটি একটি চর্চা। যদি ভোটের আগেই দলগুলো তাদের সদিচ্ছা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে ইশতেহারের রঙিন কাগজগুলো কেবল ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হবে।”
একজন জুলাই যোদ্ধার মৃত্যু মানে কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়; এটি একটি স্বপ্নের মৃত্যু। যদি এই খুনের বিচার না হয়, তবে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল হবে যে—ক্ষমতার মসনদ অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে, কেবল মুখগুলো বদলেছে।
জনতার আদালত ও আগামীর বার্তা
নির্বাচনী ডামাডোলে হয়তো এই হত্যাকাণ্ডটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য রাজপথে নামেনি, তারা নেমেছিল একটি ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচার ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য।
যদি ইশতেহারের লম্বা ফিরিস্তি শেষে বাস্তবে জুলাই যোদ্ধার খুনিরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তবে সেই সরকার জনগণের আস্থা হারাবে শপথ নেওয়ার আগেই। দেশের মানুষ এখন আর স্রেফ প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নয়, তারা চায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ। আরো পড়ুর: AI দিয়ে কিভাবে আয় করা যায়? ধাপে ধাপে গাইড
জুলাই যোদ্ধার রক্তের দাগ মুছার আগে যারা ভোটের হিসাব কষছে, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে কি না—তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, এই বিচারহীনতা বজায় থাকলে দেশে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কেবল একটি ‘রাজনৈতিক মরীচিকা’ হয়েই থেকে যাবে।



