নিঃসন্দেহে বাঙালি মুসলমানের সমগ্র ইতিহাসে বৃহত্তম দুইটা জানাযা নামায অনুষ্ঠিত হলো গত মাসে, ২০২৫ এর ডিসেম্বরে। প্রথমে শরিফ ওসমান বিন হাদি, আর তারপরে বেগম খালেদা জিয়া।
তাদের মধ্যে কি এমন গুণ আছিল যার জন্যে সমগ্র বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠী তাদের মৃত্যুতে শোকাভিভূত হইছিল, নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়া, তীব্র শীতের মইধ্যে নানান বাধাবিপত্তি সত্বেও ঢাকায় আসছিল তাদের জানাযার নামাযে শরিক হইতে?
এমন ত না যে, খালেদা জিয়ার থাইক্যা আর কোন বড় নেতা, ক্ষমতাবান নেতা আসে নাই। আর ওসমান হাদি ত এমনকি কোন প্রকার ক্ষমতার মইধ্যেই আছিল না!
একেবারে সরল চোখে দেখলেও তাদের দুইজনের মইধ্যেই দুইটা বিষয় লক্ষ্য করা যায়, যা দিয়া তারা বাঙালি মুসলমানের অন্তরে জায়গা কৈরা নিছিলেন –
খালেদা জিয়ার জানাজায় লাখ লাখ মানুষ হওয়ার রহস্য
১, মুসলমান পরিচয়কে আঁকড়ায়া ধরা। নানান বাধাবিপত্তি, লোভ-লালসা, শাস্তি-পুরস্কার কোনকিছুই তাদেরকে মুসলমান পরিচয়কে বাদ দিয়া আর কোন পরিচয় (যেমন, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, বাঙালি, ইত্যাদি) গ্রহনের দিকে প্রলুব্ধ করতে পারে নাই।
এই মুসলমান পরিচয় ধারণ করার জন্য বেগম খালেদাকে সহ্য করতে হইছে ব্যক্তিগত হয়রানি, কুৎসা, উপহাস থাইক্যা নিয়া ক্ষমতাচ্যুতি, রাষ্ট্রীয় নির্যাতনে এক সন্তানের অকালমৃত্যু ও আরেক সন্তানের অসহনীয় শারীরিক নির্যাতন এবং নির্বাসন, সুদীর্ঘকাল কারাবাস, কারাগারে স্লো-পয়জনিং, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না-দিয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকা আগায়া যাওয়া।
ওসমান হাদির বেলাতেও একই ফরমুলা প্রয়োগ করা হইছে, কিন্তু খুবই দ্রুততার সাথে। তাকে মব-স্টার ট্যাগ দেওয়া হইছে, আনকালচারড বলা হইছে, তার রাজনীতিকে বিভাজনকারী বৈলা বাতিল করার চেষ্টা করা হইছে। অবশেষে জুম্মা নামাযের পরে তাকে মাথায় গুলি কৈরা খু-ন করা হইছে, তার শিশু সন্তানকে এতিম করা হইছে।
২, বেগম খালেদা জিয়া আর ওসমান হাদির রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য আছিল হি-ন্দু-ত্ব-বাদী আগ্রাসন থাইক্যা বাঙালি মুসলমানের স্বাধীনতা।
১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করার পরে জমির মালিকানা থাইক্যা শুরু কৈরা শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতিতে হিন্দু ভদ্রলোকদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা হয়। সেই ভদ্রলোক গোষ্ঠীর হাতেই জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণার অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলায়, যেইখানে তাদের কল্পিত মহা-ভারত রাষ্ট্র গঠনের নানান রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে বাঙালি মুসলমান নিজেদের পরাধীনতা দেইখ্যা শুরু থাইক্যাই স্বাধীনতার সংগ্রাম চালু করে।
আরো পড়ুন: জানাজা নামাজের নিয়ম ও সূরা ফাতিহা পড়া
এরই ধারাবাহিকতায় আসে ফকির বিদ্রোহ, তিতুমীর, হাজী শরিয়তুল্লাহ, মুন্সী মেহেরুল্লাহ হয়ে শেরে বাঙলা, সোহরাওয়ার্দি, নাজিমুদ্দিন হয়ে ৪৭এর পূর্ববাংলা, সেই থাইক্যা পূর্ব পাকিস্তান, এবং সবশেষে ৭১ স্বাধীন বাংলাদেশ।
হি-ন্দু-ত্ব-বাদের বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানের স্বাধিকারের লড়াই দক্ষিণ এশিয়ায় জাতীয়তাবাদ ধারণার উৎপত্তি ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্মের সাথে সম্পর্কিত। যতদিন জাতিরাষ্ট্র থাকবে আর সেই রাষ্ট্রে হি-ন্দু-ত্ব-বাদের আছর থাকবে, বাঙালি মুসলমানের এই লড়াইও ততদিনই জারি থাকবে।
বেগম খালেদা জিয়ার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার আর জুলাই২৪-এ ধূমকেতুর মতো হঠাৎ আইস্যা পরা ওসমান হাদির সংক্ষিপ্ত জীবন এই সত্যটাই চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখায়া গেল।
বাঙালি মুসলমানের সংগ্রামের এই সর্বশেষ দুই বীরের আত্মার মুক্তির জন্য রহমানুর রহিম আল্লাহর দরবারে এই জুম্মাবারে দোয়া চাই।
আল্লাহ্ যেন তাদের সমস্ত গুনাহখাতা মাফ করে দিয়ে তাদের কবরকে জান্নাতের টুকরা বানায়া দেন, আর আখেরাতে চূড়ান্ত সাফল্য দান করেন।
আমিন। লিখেছেন, হাসান মাহমুদ।



