বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে এক ঐতিহাসিক ঐক্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ ধর্মপ্রাণ জনতা আশা করেছিল, যাবতীয় মতভেদ ভুলে ইসলামী শক্তিগুলো এবার এক কাতারে দাঁড়াবে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর কথিত হঠকারী সিদ্ধান্ত, গোপন তৎপরতা এবং সমঝোতার টেবিলে অনীহার কারণে সেই স্বপ্ন আজ ভঙ্গুর। চরমোনাইর পীর সাহেবের নিরলস প্রচেষ্টা ও উদারতা সত্ত্বেও ঐক্যের চূড়ান্ত ফয়সালা না হওয়ায় তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের ভূমিকা ও ইসলামী ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে হাবীবুর রহমান মেছবাহ তার ফেসবুক পোষ্টে লিখেছেন,
জামায়াতের গোপন ছক ফাঁস! কেন ভেস্তে গেল ইসলামী ঐক্য?
আমি আশা করেছিলাম, পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে জামায়াতের আন্ডারগ্রাউন্ড পলিসি বা গোপন নীতিটা আর প্রকাশ্যে আসবে না, অথবা আসার প্রয়োজন হবে না। মনোনয়নের শেষ দিন তো পার হয়েই গেল, আর কোনো ফায়সালা না হওয়ার দায়ভার পুরোটাই জামায়াতের অধৈর্য ও হঠকারী আচরণের ওপর বর্তায়। এ নিয়ে একটা লেখা লিখে ‘অনলি মি’ করে রেখেছিলাম, ভেবেছিলাম পাবলিক করতে হবে না। কিন্তু দুদিনের মাথায় বাস্তবতা সামনে চলে এলো। আরো পড়ুন: সমঝোতার টেবিলে অনুপস্থিত জামায়াত, অপেক্ষায় পীর সাহেব চরমোনাই
জামায়াত এখনো সত্যিকার অর্থে উদার হতে পারেনি। অথবা আমিরে জামায়াত চাইলেও নেতাকর্মীদের চাপে হয়তো পারছেন না। আমিরের প্রতি আনুগত্য বড় নেয়ামত, যা সবাই মেনে নিতে পারে না। জামায়াত মনে করছে সারাদেশে তাদের পক্ষে জোয়ার এসেছে। বাস্তবে এই জোয়ার তাদের দলের নয়, এই জোয়ার ইসলামের। এমন অনেক মানুষ আছেন যারা আগে কখনো কোনো ইসলামী দলকে ভোট দেননি, তারা এবার শুধু ঐক্যের সম্ভাবনার কারণে ইসলামের পক্ষে ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে আছেন।
উদাহরণস্বরূপ, কাউকে যদি ‘দাঁড়িপাল্লা’য় ভোট দিতে বলা হয়, সে হয়তো সরাসরি না করে দেবে। ‘হাতপাখা’য় দিতে বললে হয়তো বলবে ‘ভেবে দেখি’। কিন্তু যখন দেখবে সব ইসলামী শক্তি এক, তখন সেই ব্যক্তিই বলবে ‘এবার ভোটটা ইসলামকেই দেব’। এটাই আসল জোয়ার। এদেশে জামায়াতের একক কোনো অস্তিত্ব নেই। তারা হয়তো এই বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে জামায়াত নিয়ে তেমন কোনো আবেগ নেই। এটা সত্য যে কলেজ-ভার্সিটির ইসলামী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন তুলনামূলক বেশি। কিন্তু শুধু তার ওপর ভিত্তি করে সারাদেশের জনমত বিচার করা মারাত্মক ভুল হিসাব।
সাধারণ মানুষের কাছে জামায়াতের একাত্তর বিরোধী বয়ান এখনো প্রবলভাবেই আছে। অন্যদিকে আকিদাগত বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত—বিশেষ করে দেওবন্দি ঘরানার আলেম সমাজ—জামায়াতের ঘোর বিরোধী। সাধারণ মানুষ জামায়াতকে বিচার করার সময় এসব বিষয় মাথায় রাখে।

সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন খুব সহজ: সব ইসলামী শক্তি এক হোক, ইসলাম রাষ্ট্রক্ষমতায় আসুক। মানুষ বিশ্বাস করে ইসলামী শক্তি ক্ষমতায় এলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। যখন তারা দেখল চরমোনাইর পীর সাহেব, ইবনে শায়খুল হাদিস এবং কওমি আলেমদের বিশাল অংশ জামায়াতের পাশে দাঁড়িয়েছে, তখন সাধারণ মানুষ জামায়াতের ঐতিহাসিক ভুলগুলো নিয়েও আর প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু জামায়াত এটাকে নিজেদের জনপ্রিয়তা হিসেবে গণ্য করেছে—আর ঠিক এখানেই সমস্যার শুরু। তারা ধরে নিয়েছে তারা একাই ২০০-এর বেশি আসনে জিতবে এবং এককভাবে সরকার গঠন করবে। আরো পড়ুন: ওরাল সেক্স কি? ওরাল সেক্স কি হারাম
চরমোনাইর পীর সাহেব (হাফিজাহুল্লাহ) মানুষের স্বপ্ন পূরণে ‘এক বাক্স’ নীতি পেশ করেছিলেন। সব আকিদাগত মতভেদ আর পারস্পরিক শত্রুতা একপাশে রেখে তিনি শুধু নির্বাচনী সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ইসলামী ভোট যাতে এক বাক্সে থাকে, সেজন্য এই দরদী নেতা ইসলামী দলগুলোর দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন ইসলাম, দেশ ও মানবতা বাঁচাতে।
জামায়াতের গোপন ছক ফাঁস! কেন ভেস্তে গেল ইসলামী ঐক্য?
তিনি জোট বা মহাজোটের সবচেয়ে বিতর্কিত সমস্যারও সমাধান করেছিলেন: এই সমঝোতায় কোনো একক নেতা থাকবে না। ছোট-বড় সব দল সমান হবে। আগে থেকে কে কয়টা সিট পাবে তা নিয়ে দরকষাকষি হবে না; বরং যার যেখানে সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তা বেশি, সেখানে তাদের প্রার্থীই মনোনীত হবে। জামায়াত যখন এই নীতি থেকে সরে এসে ২০০ সিট দাবি করল—যেন এটা শরিয়তের কোনো আবশ্যিক ফতোয়া—তখন সংকট আরও ঘনীভূত হলো।
তাদের হঠকারিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, সমঝোতার বাকি সাত দলকে না জানিয়েই তারা নতুন একটি দলের সাথে আলোচনা শুরু করল। আসন চূড়ান্ত করার বৈঠকের নামে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সবাইকে বিভ্রান্ত করল। সারাদেশে ইসলামের পক্ষে জোয়ার দেখে তারা সেটাকে নিজেদের জনপ্রিয়তা মনে করে অতি-আত্মবিশ্বাসের নেশায় মত্ত হয়ে উঠল।
যদি শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা আলোর মুখ না দেখে, তবে জামায়াত একদিন বুঝবে তাদের ঐতিহাসিক ভুলের দীর্ঘ তালিকায় আরও একটি ঐতিহাসিক ভুল যুক্ত হলো—যার জন্য হয়তো তাদের সারাজীবন আফসোস করতে হবে। জনগণ তাদের থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নেবে।




2 Responses
কথা অনেকাংশে সত্য কিন্তু চোরমোনাই হুজুরের দলের এত জনপ্রিয়তা নেই যে পরিমাণ আসন তিনি দাবি করছিলেন । এই দরকষাকষির মধ্যে পড়ে ইসলাম প্রিয় মানুষের এতদিনের আশা আর বাস্তবে রূপ নেয়া খুবই কঠিন হয়ে গেল।
বাস্তব বলেছেন ভাই। সব আশা শেষ। তবে দলের প্রধানরা এগিয়ে আসলে এখনো অনেক কিছু সম্ভব।