বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্যের প্রত্যাশা বারবার হোঁচট খেয়েছে আধিপত্যবাদী মানসিকতার কারণে। বিশেষ করে ‘মার্চ ফর গাজা’র মতো মহৎ উদ্যোগেও যখন দলীয় সংকীর্ণতা ও উগ্রতা প্রকাশ পায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে জমে থাকা আস্থার সংকট আরও গভীর হয়।
বিশ্বাসের অপমৃত্যু ও জামায়াতের রাজনীতি
কওমি আলেমদের প্রতি অবজ্ঞা এবং শিষ্টাচারবর্জিত আচরণ মূলত ‘জামায়াতের রাজনীতি’র এক ভিন্ন রূপ সবার সামনে উন্মোচিত করেছে। একেই অনেকে দেখছেন রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও ‘বিশ্বাসের অপমৃত্যু’ হিসেবে। এমনই এক তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আরিফ জাব্বার তার ফেসবুক পোষ্টে বলেন,
আপনাদের সবার মনে আছে, ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল শনিবার ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে “মার্চ ফর গাজা” ব্যানারে একটি বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একেবারে শুরু থেকে—প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কাজ পর্যন্ত—আমাদের সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ। প্রোগ্রামের দিন সকালে তরুণ আলেমদের একটি দল অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে মঞ্চের দিকে গিয়েছিল।
সেখানে আমরা যা দেখলাম তা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। পুরো চিত্রটিই ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা দেখলাম পুরো মঞ্চটি জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। দায়িত্বপূর্ণ সব অবস্থানে সবুজ ব্যাজ পরিহিত জামায়াত ও শিবিরের ছেলেরা অবস্থান নিয়েছিল। তাদের ভাবভঙ্গি এমন ছিল যেন তারা আমাদের কাউকেই চেনে না।
তাদের আচরণ এতটাই আক্রমণাত্মক ছিল যে তারা আমাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দিতেও রাজি ছিল না। পরে রেজাউল করিম আবরার ভাই আমাদের বাউন্ডারির ভেতরে নিয়ে যান। বাউন্ডারির ভেতরে ঢোকার পরেও তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে কাউকেই মঞ্চে উঠতে দেওয়া হবে না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন: মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফী, লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, ইয়াহইয়া তাকী, উমর ফারুক ইব্রাহিমী, নারায়ণগঞ্জের মাওলানা ইসমাইল সাহেব এবং আমি নিজে।
শিবিরের ছেলেদের জন্য আমাদের ভেতরে উপস্থিতি মেনে নেওয়াটা খুব কঠিন মনে হচ্ছিল। চোখের সামনেই আমরা দেখলাম—আমাদের কঠোর পরিশ্রম, পরামর্শ এবং আন্তরিকতা দিয়ে গড়ে তোলা একটি প্রোগ্রাম হাইজ্যাক হয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তেই আমাদের মন ভেঙে গেল।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো সংগঠনের সাথে যুক্ত নই। আমি মার্চ ফর গাজার জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছি, কিন্তু তাদের উগ্রতা দেখে আমি ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে গেলাম। আমরা প্রত্যেকেই চরমভাবে মর্মাহত ছিলাম। সাভারের ইসলামী আন্দোলনের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এসে মন্তব্য করলেন: “এটা কি শিবিরের প্রোগ্রাম? এখানে তাদের দায়িত্ব কে দিল?”
বিশ্বাসের অপমৃত্যু ও জামায়াতের রাজনীতি
এই মন্তব্যের কারণে তাকেই জেরার মুখে পড়তে হলো। যাই হোক। জোহরের আজান হলে বিশাল মঞ্চটি সম্পূর্ণ খালি ছিল। প্রায় বারো-তেরো জন জামায়াতে ইসলামীর নেতা মঞ্চে জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন। মুফতি নোমান কাসেমী এবং ফরায়েজী সাহেব যখন মঞ্চে নামাজে শরিক হতে চাইলেন, তখন তাদের সেখানে নামাজ পড়তে দেওয়া হয়নি।
এমনকি শামসুদ্দোহা আশরাফী ভাইকেও তারা বলে যে, মঞ্চ খালি থাকা সত্ত্বেও অন্যদের নামাজে শরিক হতে দেওয়া হবে না। এ নিয়ে কিছুটা তর্ক-বিতর্ক ও কথা কাটাকাটি হয়। শেষ পর্যন্ত আমরা নিজেদের সরিয়ে নিলাম। আমরা কেউই অপরিণামদর্শী ও অযোগ্য শিবিরের ছেলেদের সাথে ঝগড়া করে এই মহৎ প্রোগ্রামের সৌন্দর্য নষ্ট করতে চাইনি। আমরা রেজাউল করিম আবরার ভাইয়ের কাছে অভিযোগ করলাম, তিনি বললেন: “আমি একা কত দিক সামলাব? আমি আসলে হিমশিম খাচ্ছি।” আরো পড়ুন: জামায়াত বনাম চরমোনাই: শক্তির লড়াইয়ে কে এগিয়ে?
যা হোক, সবকিছু পরিকল্পনা মাফিক শেষ হলো। কাউকেই বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ঘোষণাপত্র পাঠ করা হলো এবং দোয়ার মাধ্যমে প্রোগ্রাম শেষ হলো। সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতারা মঞ্চে উঠলেন, হাতে হাত রেখে এক সারিতে দাঁড়ালেন এবং অবশেষে মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব সমাপনী মোনাজাত পরিচালনা করলেন। পরদিন দেখলাম, মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের দোয়া নিয়ে জামায়াত সমর্থকরা অশালীন ভাষায় লেখালেখি করছে এবং কুরুচিপূর্ণ সমালোচনা করছে।
তাকে আক্রমণ করতে গিয়ে এমন কোনো নোংরামি নেই যা তারা বাকি রেখেছে। মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব বেগম জিয়ার জানাজার নামাজও পড়িয়েছিলেন। দেখলাম, সেটা নিয়েও শিবিরের চরম এলার্জি—বিদ্বেষের তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে তারা। আমি বুঝতে পারি না মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের প্রতি তাদের মনে এত গভীর ঘৃণা কেন।
এর কারণ কি এই যে, দেশে এত বড় একটা বিপ্লবের পরেও একজন কওমি আলেম জাতীয় মসজিদের খতিব হয়েছেন—আর তারা সেটা মেনে নিতে পারছে না? বাস্তবতা হলো: আমি একসময় বিশ্বাস করতাম যে জামায়াত-শিবিরের সদস্যরা শিক্ষিত এবং ভদ্র। আরো পড়ুন: সমঝোতার টেবিলে অনুপস্থিত জামায়াত, অপেক্ষায় পীর সাহেব চরমোনাই
কিন্তু তাদের পোস্টগুলো পড়ে আমি আগেই বুঝতে শুরু করেছিলাম যে তারা আসলে কতটা উগ্র, অসভ্য এবং বেয়াদব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জামায়াত কওমি আলেমদের কোনোদিন মূল্যায়ন করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।
বিশ্বাসের অপমৃত্যু ও জামায়াতের রাজনীতি
তারা শুধু কওমি সমাজকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। তারা সফল হবে কি না তা অনেকাংশে চরমোনাই পীর সাহেব এবং মাওলানা মুফতি নুরুল হক সাহেবের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বি আলেমরা এখনও জামায়াতের বিরোধী। যখন সকল শ্রদ্ধেয় মুরুব্বিরা জামায়াতের সাথে ঘনিষ্ঠতাকে আত্মঘাতী মনে করেন, তখন আমি মনে করি তাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত একটি বিশাল রাজনৈতিক ভুল। ইসলামী আন্দোলন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভাইদের প্রতি আমার শেষ বার্তা হলো:
যাদের জন্মই হয়েছে ঘৃণার মধ্য দিয়ে—তাদের কাছ থেকে বিশ্বস্ততা আশা করা ভুল। খচ্চর দেখতে ঘোড়ার মতো হতে পারে, কিন্তু সে কখনোই ঘোড়া হতে পারে না। একইভাবে, নামের সাথে “ইসলামী” শব্দ থাকলেই জামায়াত ইসলামী দল হয়ে যায় না। তারা যদি সত্যিই ইসলামী দল হতো, তবে তাদের কাছে ইসলামী আন্দোলনের চেয়ে সেক্যুলার এনসিপি (NCP) কখনোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতো না। ব্যক্তিগতভাবে আমি জামায়াতকে কখনোই একটি “ইসলামী দল” মনে করি না।
পরিশেষে, ১২ই এপ্রিলের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য এক গুরুতর অশনিসংকেত। মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের মতো সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্বের প্রতি বিদ্বেষ এবং সাধারণ কওমি আলেমদের কোণঠাসা করার এই মানসিকতা জামায়াতের ‘ব্যবহার ও ছুড়ে ফেলা’র পুরনো নীতিরই বাস্তব প্রমাণ।

ইসলামী আন্দোলন ও অন্যান্য সমমনা দলগুলোর এখনই সতর্ক হওয়ার উপযুক্ত সময়। মুরুব্বি আলেমদের দূরদর্শী পরামর্শ উপেক্ষা করে অবিশ্বস্ত শক্তির সাথে আপস করা হবে চরম রাজনৈতিক ভুল। সুতরাং, বাহ্যিক চাকচিক্যে বিভ্রান্ত না হয়ে, ইতিহাসের এই নির্মম শিক্ষা নিয়েই আগামীর পথ চলা উচিত—নতুবা এই ভুলের মাশুল পুরো কওমি অঙ্গনকেই দিতে হতে পারে।



