সাম্প্রতিক ইসলামী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নানা প্রশ্ন ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী মনোনয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বৈঠকের বারবার সময় পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সেই উদ্যোগ ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ে।
ঢাকায় অবস্থান করে ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত আন্তরিকতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। ফলে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত পৃথক মনোনয়ন দাখিলের দিকে গড়ায়, যা তৃণমূল পর্যায়ে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা বৃদ্ধি করেছে। এ প্রসঙ্গে শরিফুল ইসলাম রিয়াদ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন:
সমঝোতার টেবিলে অনুপস্থিত জামায়াত, অপেক্ষায় পীর সাহেব চরমোনাই
গত ১২ ডিসেম্বর প্রথম সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। চরমোনাইর পীর সাহেব এই বৈঠকে যোগ দিতে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসেন। তবে তিনি ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, সেদিন বৈঠক করা সম্ভব হবে না। পীর সাহেব তখন প্রস্তাব দেন যে অন্তত একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে। জামায়াত জানায়, সেটাও আপাতত সম্ভব নয় কারণ ড. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অসুস্থ।
পীর সাহেব তখন বলেন যে তিনি তাহের ভাইকে দেখতে যেতে চান। জবাবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জানান, তাহের ভাই এতটাই অসুস্থ যে চিকিৎসকরা তাকে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। এরপর পীর সাহেব ঢাকায় অবস্থান করেন এবং বারবার সমঝোতা বৈঠকের তাগিদ দিতে থাকেন। তিনি বারবার জোর দেন যে সমঝোতা চূড়ান্ত করা জরুরি কারণ মনোনয়ন জমাদানের সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে। সময়মতো সিদ্ধান্ত না হলে সব দলকে আলাদাভাবে মনোনয়ন জমা দিতে হবে, যা দেখতে দৃষ্টিকটু হবে এবং তৃণমূলে বিভ্রান্তিকর বার্তা যাবে।
যেহেতু সিদ্ধান্ত ছিল সব দল মিলে প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী দেবে, তাই সমঝোতা চূড়ান্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবুও বৈঠকের ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যাশিত আগ্রহ দেখা যায়নি। এমতাবস্থায় হঠাৎ দেখা গেল, অন্য সাতটি দলের সাথে পরামর্শ না করেই জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে। আরো পড়ুন: চ্যাটজিপিটি দিয়ে অনলাইনে আয় করার উপায়
পীর সাহেব বিষয়টি জামায়াতের হাইকমান্ডকে জানান এবং বলেন যে এভাবে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি। এতে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হবে এবং তৃণমূলে নেতিবাচক সংকেত যাবে। বরং সব দল মিলে একক প্রার্থীর পক্ষে মনোনয়ন তোলার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যের ভিত আরও মজবুত হতো। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পীর সাহেব বাধ্য হয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি)-এর প্রার্থীদেরও মনোনয়ন সংগ্রহের নির্দেশ দেন।
যদিও তিনি নিজে চাননি যে আলোচনার বাইরে গিয়ে সবাই মনোনয়ন তুলুক, অবশেষে ১৯ ডিসেম্বর প্রথম সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি জামায়াতের এক সিনিয়র নেতার বাসায় অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এক-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়, আর বাকি দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সিদ্ধান্ত হয় যে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক চলবে।
পরবর্তী নির্ধারিত বৈঠকের দিন আইএবি নেতারা যথাসময়ে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হন। জামায়াতের লিয়াজঁ কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে একাধিকবার ফোন করা সত্ত্বেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। নেতারা বাসার নিচে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। এক ঘণ্টা পর ওই সিনিয়র নেতার ব্যক্তিগত সহকারী ফোন করে জানান যে নেতা মিটিংয়ে আছেন, তাই ফোন ধরতে পারেননি। নেতারা তাকে জানান যে আজ পূর্বনির্ধারিত বৈঠকের দিন এবং তারা নিচে অপেক্ষা করছেন, বিষয়টি যেন তাকে জানানো হয়।
পরে ওই সিনিয়র নেতা ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন যে তিনি বৈঠকের কথা ভুলে গিয়েছিলেন, তাই সেদিন বৈঠক করা সম্ভব নয়। নেতারা এতে বিস্মিত হন এবং অপমানিত বোধ করেন যে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠকের কথা কীভাবে ভুলে যাওয়া সম্ভব। তারা তখন প্রস্তাব দেন যে যেহেতু তারা এসেই পড়েছেন, অন্তত তাহের ভাইয়ের সাথে কিছু আলোচনা করা হোক। উত্তরে বলা হয়, তাহের ভাই জরুরি কাজে আমিরে জামায়াতের বাসায় গেছেন, তাই দেখা করা কঠিন।
সমঝোতার টেবিলে অনুপস্থিত জামায়াত, অপেক্ষায় পীর সাহেব চরমোনাই
তবে পরে জানা যায় যে ড. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আসলে নিজের বাসাতেই ছিলেন এবং এনসিপি (NCP)-র সাথে বৈঠক করছিলেন। এতে ধারণা করা হয় যে, এনসিপির সাথে বৈঠকের জন্য জামায়াতে ইসলামী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাথে সমঝোতা বৈঠক উপেক্ষা করেছে এবং তাহের ভাইয়ের অবস্থানের বিষয়ে অসত্য তথ্য দেওয়া হয়েছে।
১৯ ডিসেম্বরের পর আর কোনো বৈঠক হয়নি। বৈঠক পেছানোর জন্য বিভিন্ন কারণ দেখানো হয়—যেমন তাহের ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে, আজাদ ভাইয়ের ওমরাহ পালন এবং আমিরে জামায়াতের লন্ডন সফর। এদিকে মনোনয়ন জমাদানের শেষ সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছিল। এমতাবস্থায় পীর সাহেব আবারও জামায়াতের হাইকমান্ডকে চাপ দেন সমঝোতা শেষ করার জন্য এবং সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। আরো পড়ুন: AI যুগের সেরা ১০ টি ফ্রিল্যান্সিং স্কিল
অবশেষে একদম শেষ মুহূর্তে ২৫ ডিসেম্বর একটি বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হয়। বৈঠকটি হলেও জামায়াতে ইসলামীর অনড় অবস্থানের কারণে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে সব দল বাধ্য হয়ে আলাদাভাবে মনোনয়ন জমা দেয়। এতে নানা ভুল বুঝাবুঝি, তৃণমূল ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং প্রশ্ন ওঠে যে এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে কি না।
পরিশেষে বলা যায়, ঐক্যের রাজনীতির এই ঐতিহাসিক প্রচেষ্টায় কোন দলের কতটুকু দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতা ছিল, তা জনগণই বিচার করবে। তবে এটি উল্লেখ করা জরুরি যে, চরমোনাইর পীর সাহেব গত ১২ ডিসেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত কেবল সমঝোতা বৈঠকের উদ্দেশ্যেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত অবস্থান করছেন—যা তার রাজনৈতিক জীবনে নজিরবিহীন। এর মধ্যে তিনি কুড়িগ্রামে তিন দিনের মাহফিলে যোগ দিতে আকাশপথে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন।




