জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া: Mufti Rejaul Karim
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা সেই মহান সত্তার, যিনি আমাদের ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ধর্ম ইসলাম দান করেছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি।
সম্মানিত মুসল্লি ভাইগণ! আজ জুমার এই পবিত্র দিনে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আলোচনা করব, তা হলো—
জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া
। বর্তমান পৃথিবীতে অশান্তির মূল কারণ হলো মানুষের ওপর মানুষের যুলুম। অথচ ইসলাম একজন মুসলমানের জান, মাল ও সম্মানকে অন্য মুসলমানের জন্য হারাম করে দিয়েছে। আজকের খুতবায় আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে যুলুমের ভয়াবহ পরিণাম এবং জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া ও পথ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. আল্লাহ নিজের ওপর যুলুম হারাম করেছেন
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সর্বশক্তিমান হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর সৃষ্টিজগতকে ন্যায়বিচারের চাদরে ঢেকে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহর বাণী বর্ণনা করেছেন:
“হে আমার বান্দাগণ! আমি নিজের ওপর যুলুম হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের মাঝেও এটিকে হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পরের ওপর কখনো যুলুম করো না।” (সহিহ মুসলিম)
শিক্ষণীয় ঘটনা: প্রাচীন যুগে এক অহংকারী বাদশা তার রাজ্যে এক বৃদ্ধার ছোট কুঁড়েঘর ভেঙে সেখানে রাজপ্রাসাদ বড় করতে চেয়েছিল। বৃদ্ধা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমি যখন ছিলাম না তখন বাদশা ঘর ভেঙেছে, কিন্তু আপনি তো তখন ছিলেন!” ঐতিহাসিকগণ বলেন, সেই রাতেই এক ভূমিকম্পে বাদশার রাজপ্রাসাদ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ যুলুম সইলেও যালিমকে ছাড় দেন না।
২. অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগ করার পরিণতি
যুলুমের অন্যতম রূপ হলো অন্যের হক নষ্ট করা। নবীজি (সা.) বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন:
“তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য তেমন পবিত্র ও হারাম, যেমন আজকের এই দিন (আরাফার দিন), এই মাস এবং এই শহর (মক্কা) পবিত্র।”
হাদিসের ঘটনা: একবার এক সাহাবী একখণ্ড জমি নিয়ে বিবাদে জড়িয়েছিলেন। নবীজি (সা.) সতর্ক করে বললেন, “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জমিও আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি)। অন্যায়ভাবে দখলকৃত সম্পদ দুনিয়াতে সুখ দিলেও আখেরাতে তা আগুনের লেলিহান শিখা হয়ে আসবে।
৩. খারাপ আচরণের বদলা যুলুম দিয়ে নয়
ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, কেউ আপনার সাথে মন্দ ব্যবহার করলে আপনি তার ওপর যুলুম করার অধিকার রাখেন না। কুরআন মজিদে আল্লাহ বলেছেন, “মন্দের বদলা যেন মন্দের সমান হয়, তবে যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে।”
নবীজি (সা.)-এর সহনশীলতার ঘটনা: মক্কার কাফেররা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ওপর অকথ্য যুলুম করেছিল। তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত, উটের ওঝড়ি তাঁর পিঠের ওপর দিয়ে রাখত। কিন্তু বিজয়ী হয়ে মক্কায় প্রবেশের পর নবীজি (সা.) তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এটিই ইসলামের সৌন্দর্য—প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুলুম না করে ক্ষমা করা।
৪. যালিমের সহযোগী হওয়া লানতজনক
অনেকে নিজে সরাসরি যুলুম করে না, কিন্তু যালিমকে সাহায্য করে বা সমর্থন দেয়। এটিও কবিরা গুনাহ। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো যালিমকে সহযোগিতা করার জন্য তার সাথে চলে, অথচ সে জানে যে লোকটি যালিম, তবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল।”
ঐতিহাসিক সতর্কবাণী: হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) যখন যালিম বাদশার কারাগারে বন্দী ছিলেন, তখন কারাগারের জল্লাদ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “হুজুর! আমি কি যালিমের সহযোগী?” ইমাম সাহেব বলেছিলেন, “না, তুমি নিজেই যালিম! যালিমের সহযোগী তো তারা যারা তোমাকে কাপড় দেয়, সুঁই-সুতো দেয়।” অর্থাৎ যালিমের সাথে যে কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা ধ্বংসের কারণ।
৫. কিয়ামতের দিন যালিম হবে ‘নিঃস্ব’ (মুফলিস)
সম্মানিত উপস্থিতি! কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বড় নিঃস্ব হবে সেই যালিম, যার কাছে অনেক নামাজ-রোজার নেকি থাকবে। নবীজি (সা.) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি জানো মুফলিস কে?” সাহাবীরা বললেন, “যার টাকা-পয়সা নেই।” নবীজি (সা.) বললেন, “না, আমার উম্মতের মুফলিস সে, যে কিয়ামতে নামাজ-রোজা নিয়ে আসবে কিন্তু কাউকে গালি দিয়েছে, কারো সম্পদ খেয়েছে, কাউকে মেরেছে। ফলে তার নেকিগুলো পাওনাদারদের দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে মজলুমের গুনাহ যালিমের ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে ফেলা হবে।” (সহিহ মুসলিম) আরো পড়ুন: যুগে যুগে ইহুদীদের ষড়যন্ত্র ও তাদের শেষ পরিণতি
৬. মজলুমের বদদোয়া ও আল্লাহর আরশ
যুলুমের সবচেয়ে ভয়ের দিক হলো মজলুমের চোখের পানি। নবীজি (সা.) হযরত মুয়াজ (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় বলেছিলেন:
“মজলুমের বদদোয়াকে ভয় করো, কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো অন্তরায় বা পর্দা থাকে না।”
ঘটনা: পারস্যের বিখ্যাত উজির ইবনে বারমাক যখন সপরিবারে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেন, তখন তাঁর ছেলে জিজ্ঞেস করল, “বাবা! আমরা কেন আজ এই অবস্থায়?” বৃদ্ধ বাবা উত্তর দিলেন, “বৎস! রাতে কোনো এক মজলুম হয়তো আমাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে হাত তুলেছিল। আমরা যখন ঘুমে মগ্ন ছিলাম, আল্লাহ তখন জাগ্রত ছিলেন।” সুতরাং যালিম যখন যুলুম করে আনন্দ পায়, আল্লাহ তখন তার জন্য আকাশ থেকে গজব প্রস্তুত করেন।
৭. দুনিয়াতেই পাওনা মীমাংসা করার গুরুত্ব
কারো জান, মাল বা সম্মানের ক্ষতি করে থাকলে কিয়ামতের আগেই ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। নবীজি (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কারো কাছে যদি তোমার ভাইয়ের কোনো পাওনা থাকে, তবে আজই তা মিটিয়ে নাও। কারণ সেদিন কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না।”
সাহাবীদের আমল: হযরত তালহা (রা.) এবং হযরত জুবায়ের (রা.)-এর মতো সাহাবীরা কোনো ভুল হয়ে গেলে ব্যাকুল হয়ে মজলুমের কাছে ক্ষমা চাইতেন এবং বিনিময়ে প্রচুর সম্পদ দান করে দিতেন যাতে আখেরাতে আটকে না পড়েন। আরো পড়ুন: অভিজ্ঞতা ছাড়া গ্রামে ৫টি লাভজনক ব্যবসা
৮. যালিম ও মজলুম উভয়কেই সাহায্য করুন
হাদিস শরিফে এসেছে, “তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে যালিম হোক বা মজলুম।” সাহাবীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মজলুমকে তো সাহায্য করব, কিন্তু যালিমকে কীভাবে?” নবীজি (সা.) বললেন, “তাকে যুলুম থেকে বিরত রাখার মাধ্যমেই তাকে সাহায্য করা হবে।” কারণ তাকে না থামালে সে জাহান্নামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
৯. যালিমের দোয়া কবুল হয় না
আল্লাহ তাআলা যালিমের ওপর এতটাই অসন্তুষ্ট থাকেন যে, যালিম যদি দীর্ঘ সময় প্রার্থনাও করে, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন না। কারণ সে হারাম সম্পদ বা যুলুমের মাধ্যমে জীবন পার করছে। অন্যদিকে মজলুম যদি কাফেরও হয়, আল্লাহ তার ফরিয়াদ শোনেন।
১০. দ্বীনি ইলম ও নৈতিক শিক্ষা
যুলুম থেকে বাঁচতে হলে আখেরাতের ভয় এবং দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যারা জানে যুলুমের শাস্তি কী, তারা কখনো অন্যের ওপর হাত তুলতে পারে না। বর্তমান সমাজে নৈতিক শিক্ষার অভাবে যুলুম বাড়ছে। তাই আসুন আমরা নিজেরা এবং আমাদের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করি।
জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া ও আমল
সম্মানিত মুসল্লিগণ! আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে যালিমের দাপট অনেক সময় আমাদের কোণঠাসা করে ফেলে। সেই মুহূর্তে আমাদের একমাত্র আশ্রয় মহান আল্লাহ। কুরআন ও হাদিসে জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া হিসেবে বেশ কিছু শক্তিশালী দোয়া বর্ণিত হয়েছে।
১. কুরআনী দোয়া: যখন ফেরাউনের যুলুম থেকে বাঁচার জন্য আসিয়া (আ.) দোয়া করেছিলেন:
রব্বি ইবনি লী ‘ইনদাকা বাইতান ফিল জান্নাহ, ওয়া নাজ্জিনী মিন ফিরআউনা ওয়া আমালিহী, ওয়া নাজ্জিনী মিনাল কওমিয যালিমীন। অর্থ: “হে আমার রব! আমার জন্য আপনার নিকট জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং যালিম সম্প্রদায় থেকে আমায় মুক্তি দিন।” (সূরা তাহরীম: ১১)
২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া: যালিমের ভয় পেলে বা যুলুমের সম্মুখীন হলে এই দোয়াটি পড়ুন:
আল্লাহুম্মা ইন্না নাজআলুকা ফী নুহরিনহিম, ওয়া নাঊযু বিকা মিন শুরুরিহিম। অর্থ: “হে আল্লাহ! আমরা আপনাকে তাদের মুখোমুখি করছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।” (আবু দাউদ)
৩. বিপদের সময়ের দোয়া:
হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল। অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক।” (সূরা আলে ইমরান: ১৭৩)
পরিশেষে, ইসলাম শান্তির ধর্ম। অন্যের ওপর যুলুম করা তো দূরের কথা, কারো সাথে উচ্চস্বরে কথা বলে তাকে আতঙ্কিত করাও ইসলামের দৃষ্টিতে গর্হিত। কিয়ামতের দিন যালিমের জন্য কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। আসুন, আমরা আজ এই জুমার মজলিসে শপথ করি—আমরা কারো ওপর যুলুম করব না এবং মজলুমের পাশে দাঁড়াব।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে যালিম হওয়া থেকে হেফাজত করুন এবং যারা আজ যুলুমের শিকার হচ্ছে, তাদের উদ্ধার করুন। আমাদের উপার্জনকে হালাল করুন এবং পরকালে মুফলিস বা নিঃস্ব হওয়া থেকে বাঁচান।
আমিন। ওয়া আখিরু দা’ওয়ানা আনিল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।



