আমার একটা মাসআলা জানার ছিল। তা হল, আমি
ওয়াইফাই ও ব্রডব্যান্ড এর ব্যবসা করা কি জায়েয?
অর্থাৎ বিভিন্ন গ্রামের গঞ্জে যে ওয়াইফাই এর লাইন দেওয়া হয় অথবা ওয়াইফাই চালানোর যে মেশিন যন্ত্রপাতি সেল করা হয়। এগুলো সেল করা বা ওয়াইফাই লাইন দেওয়া আমার জন্য জায়েজ হবে কিনা? বা এটা কতটুকু শরীয়ত সম্পন্ন?
মোহাম্মদ আজিজ খান, চট্টগ্রাম
উত্তর: ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ । আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবানীতে ভালো আছি। আলহামদুলিল্লাহ। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ আপনি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন করেছেন এবং শরীয়তের আলোকে তার সমাধান জানতে চেয়েছেন।
নিম্নে আপনার প্রশ্নের উত্তর কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত উদ্ধৃত হলো।
আধুনিক জগতে বাস করতে করতে কমবেশি সকলেই ইন্টারনেটের সাথে একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছে। সঙ্গত কারণেই তাই দেখা দিয়েছে এসব মাসআলার হকুম কি হবে তা জানার। এ সংক্রান্ত একটি মাসআলা হলো,
ওয়াইফাই ও ব্রডব্যান্ড এর ব্যবসা করা কি জায়েয?
ব্রডব্যান্ড বা ওয়াইফাই এর বিজনেস একটি ডিজিটাল ব্যবসা । এক্ষেত্রে আমাদের শরীয়তের মূলনীতি ও কোরআন হাদিসের নির্দেশনা মানতে হবে, ফলো করতে হবে।
ব্রডব্যান্ড ওয়াইফাই এর ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, যেসব জিনিস দ্বারা হালাল ও হারাম দুই ধরনেরই কাজ করা যায় । সেসব জিনিস কাউকে প্রদান করা বা তার ব্যবসা করা শরীয়তের মূলনীতির আলোকে সম্পূর্ণ জায়েজ ও বৈধ।
সুতরাং যেহেতু ওয়াইফাই বা ইন্টারনেট দ্বারা ভালো-মন্দ উভয় কাজই করা যায় সেহেতু ওয়াইফাই বা ব্রডব্যান্ডের ব্যবসা করা জায়েজ।
এরপর যদি ইন্টারনেট বা ওয়াইফাই ইউজার ওয়াইফাই বা ইন্টারনেট এর মাধ্যমে কোন গুনাহের কাজ করে, কোন অশ্লীল জিনিস দেখে বা নাজায়েজ কোন জিনিস দেখে তাহলে তার গুনাহের জন্য সে নিজেই দায়ী।
এক্ষেত্রে ওয়াইফাই এর যে ব্যবসা করে তার কোন গুনাহ হবে না।

তবে যদি আপনি কারো ব্যাপারে নিশ্চিত থাকেন যে, সে ওয়াইফাই এর মাধ্যমে শুধুমাত্র গুনাহের কাজ ই দেখবে, গুনাহের জিনিস দেখবে তাহলে তার কাছে ওয়াইফাই বিক্রি করা বা ইন্টারনেট বিক্রি করা জায়েজ হবে না।
আরও পড়ুনঃ শায়েখ আহমাদুল্লাহ কি আহলে হাদিস
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ [٥:٢
সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা। {সূরা মায়িদা-২}
أن كل ما فيه منفعة تحل شرعاً، فإن بيعه يجوز، لأن الأعيان خلقت لمنفعة الإنسان بدليل قوله تعالى: {خلق لكم ما في الأرض جميعاً} [البقرة:29/ 2] (الفقه الاسلامى وادلته، معالم النظام الاقتصادى فى الاسلام، القسم الثالث العقود، المبحث الرابع-البيع الباطل والبيع الفاسد، المطلب الاول-انواع البيع الباطل، بيع النجس والمتنجس-4/217)
প্রত্যেক ঐ বিষয় যেখানে লাভ আছে,বা যেখান লাভ অর্জন করা যায়,সেটা হালাল।
তাহলে সেটার ব্যবসা করা জায়েজ আছে।
وَمَا كَانَ الْغَالِبُ عَلَيْهِ الْحَرَامُ وَلَمْ يَجُزْ بَيْعُهُ وَلَا هِبَتُهُ (الفتاوى الهندية، كتاب البيوع، الْبَابُ التَّاسِعُ فِيمَا يَجُوزُ بَيْعُهُ وَمَا لَا يَجُوزُ وَفِيهِ عَشَرَةُ فُصُولٍ، الْفَصْلُ الْخَامِسُ فِي بَيْعِ الْمُحْرِمِ الصَّيْدَ وَفِي بَيْعِ الْمُحَرَّمَاتِ،-3/116)
যেটার মাধ্যমে অধিকাংশ কাজই হারাম হয়,তার ব্যবসা,তা বিক্রয়, দান করা জায়েজ নয়।
ليس عينها منكرا وإنما المنكر فى استعماله المحظور، (طحطاوى على الدر المختار-4/196)
وإنما المعصية بفعل المستأجر وهو مختار فيه، فقطع نسبته عنه، (طحطاوى على الدر المختار-4/197
★কিন্তু তাকওয়া হলো, এ ক্ষেত্রে যথাসম্ভব নিজেকে বিরত রাখার জন্য চেষ্টা করা। কারণ, আপনি তো সবার সম্পর্কে জানেন না। যদি এ ধরনের বিষয় হয়ে থাকে যে আপনি নিশ্চিত হতে পারছেন না ওয়াইফাই কোনো হারাম বা নিষিদ্ধ কাজে ব্যবহার করা হবে কি না, তাহলে উত্তম হচ্ছে এ ধরনের ব্যবসায় নিজেকে লিপ্ত না করা।
★★সুতরাং ব্রডব্যান্ড/ওয়াইফাইয়ের ব্যবসা সাধারণ বিবেচনায় জায়েজ। কারণ এটি একটি সেবা। কিনে বিক্রি করতে হয়।
তাকওয়ার বিচারে কেউ এটিকে এড়িয়ে চলতেই পারে। সব ব্যবসা মূলত মুবাহ। যদি এতে হারামের স্পষ্ট উপাদান না থাকে। এ হিসাবে ব্রন্ডব্যান্ড/ওয়াইফাই এর ব্যবসা জায়েজ।
তবে যদি নিশ্চিত জানা থাকে যে, লোকটি শুধু গোনাহের কাজই করবে, তাহলে তার কাছে বিক্রয় করা জায়েজ হবে না। (আল্লাহ-ই ভালো জানেন) নিম্নের মাসআলাটিও জেনে নিন।

অনুমতি ছাড়া ওয়াই-ফাই ব্যবহার জায়েজ আছে কি?
প্রথম প্রশ্নের স্পষ্ট ও সহজ উত্তর হলো- বিনা অনুমতিতে অন্যের ওয়াই-ফাই ব্যবহার কোনোভাবেই জায়েজ নেই। তাছাড়া বিনা অনুমতিতে অন্যের ওয়াই-ফাই ব্যবহার করা এক প্রকার প্রতারণা ও হক নষ্ট করার শামিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয়— তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি দয়ালু।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ২৯)
আর পাসওয়ার্ড হ্যাক করে বা অন্য কোনোভাবে বিনা অনুমতিতে অন্যের ওয়াই-ফাই ব্যবহার করাটা এক ধরনের জুলুম। অনুমতিহীন কারও কোনো কিছুতে হস্পক্ষেপের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘সাবধান! কারো ওপর জুলুম করবে না। সাবধান! কারও সম্পদ তার মনোতুষ্টি ছাড়া কারও জন্য হালাল নয়।’ (আহমাদ, হাদিস : ২০৬৯৫; শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৫১০৫; ইরওয়া, হাদিস : ১৪৫৯; সহিহ আল-জামি, হাদিস : ৭৬৬২)
অন্যের ওয়াই-ফাই দিয়ে মন্দ কাজ করলে…
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো- যদি কেউ ওয়াই-ফাইয়ে যুক্ত থাকা অবস্থায় এর অপব্যবহার করে বা এর মাধ্যমে খারাপ ও গুনাহের কোনো কাজ করে; তাহলে ওয়াই-ফাই যদি মালিকের সম্মতিতে ব্যবহার হয়ে থাকে— তাহলে মালিকেরও গুনাহ হবে। অন্যথায় মালিকের গুনাহ হবে না। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ০২)
আল্লাহর রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘ক্ষতি ও ক্ষতি সাধনের কোন অনুমতি নেই।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস : ৩০৭৯)
বিনা অনুমতিতে কারও ওয়াই-ফাই ব্যবহার করাকে আমরা হয়ত হালকা বিষয় ভাবতে পারি। কিন্তু তা মোটেই ছোটখাটো কোনো বিষয় নয়। এমনকি ছোটখাটো বিষয়ের জন্যও আল্লাহর কাছে হিসাব দিতে হবে, শাস্তি পেতে হবে। তাই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।
অতএব, না জানিয়ে অন্যের ওয়াইফাই ব্যবহার করে থাকলে— আপনি এখনই তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নেন কিংবা ওয়াইফাই ব্যবহার বন্ধ করে দিয়ে তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নিন।
উত্তর দিয়েছেনঃ মুফতি রেজাউল করিম
সুফফাহ মাদারাসা , মহেশপুর, ঝিনাইদা



