সন্তান লালন পালনে আমরা খুবই অবহেলা করে থাকি। তাই আজ আলোচোনা করব,
সন্তান লালন পালনের পদ্ধতি
নিয়ে। চলুন তা হলে জেনে নেই সন্তান লালন পালনের ইসলামী পদ্ধতি।
ভুমিকাঃ ঈমান ও আমল অনুযায়ী মর্যাদা ও প্রতিদানের দিক থেকে নারী পুরুষের ভেদাভেদ নেই- উভয়ে আল্লাহর নিকট সমান। নবী (সাঃ) বলেন, “নারীরা তো পুরুষদেরই সহদর।” (আঃ দাউদ)। নারী হকদার হলে তা দাবী করার অধিকার আছে তার অথবা নিপীড়িত হলে তা থেকে মুক্ত হওয়ার অধিকারও আছে। কেননা ইসলাম ধর্মে সম্বোধন সূচক যে সকল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে নারী পুরুষের স্বার্থেই। তবে যে সমস্ত বিষয়ে উভয়ের মাঝে পার্থক্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা অবশ্যই ভিন্ন।
ইসলামের অবশিষ্ট বিধি বিধানের তুলনায় সেই পার্থক্য খুবই সামান্য। তাছাড়া ইসলাম সৃষ্টিগত ও শক্তি-সামর্থ্যগত দিক থেকে নারী-পুরুষের বৈশিষ্ট্যের প্রতি গুরুত্বসহ লক্ষ্য রেখেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “সে কি জানে না কে সৃষ্টি করেছে? আর তিনিই সুক্ষ্মদর্শী সংবাদ-রক্ষক।” (সূরা মুলক-১৪)।
নারীর কিছু কর্ম আছে যা তার জন্যই বিশেষ। পুরুষের কিছু কর্ম আছে যা তার জন্যই বিশেষ। একজনের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অপরের অনুপ্রবেশ সংসার জীবনে ভারসাম্য নষ্ট করে দিবে। নারী নিজ গৃহে অবস্থান করলেও তাকে পুরুষের সমপরিমাণ প্রতিদান দেয়া হবে।

আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত একদা তিনি নবী (সাঃ) এর নিকট আগমন করলেন। তখন নবী কারীম (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে বসে ছিলেন। আসমা বললেন, আপনার জন্যে আমার পিতা-মাতা কোরবান হোক! আমি নারী সমাজের প্রতিনিধী হিসেবে আপনার নিকট আগমন করেছি। আপনাকে জানাচ্ছি যে, আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গ। পূর্ব .থেকে পশ্চিম প্রান্তের নারী মাত্রেই যে কেউ আমার এই আগমনের সংবাদ শুনুক বা নাই শুনুক সে আমার অনুরুপ মত পোষণ করবে। নিঃ সন্দেহে আল্লাহ আপনাকে সত্য দ্বীনসহ নারী-পুরুষ উভয় শ্রেণীর নিকট প্রেরণ করেছেন। তাই আমরা আপনার প্রতি এবং সেই মা’বুদের প্রতি ঈমান এনেছি যিনি আপনাকে প্রেরণ করেছেন। আমরা নারী সমাজ চার দেয়ালের ঘেরার মধ্যে আপনাদের গৃহের মধ্যে বন্দী অবস্থায় দিন যাপন করি, আপনাদের প্রবৃত্তি সিদ্ধি মনোরথ করি। আপনাদের সন্তান গর্ভে ধারণ করি।
আর আপনারা পুরুষ সমাজকে আমাদের ওপর মর্যাদাবান করা হয়েছে। জুম-আ,জামাআত,রুগীর পরিচর্যা, জানাযায় অংশগ্রহণ, হজ্জের পর হজ্জ সম্পাদন এবং সর্বোত্তম কাজ আল্লাহর পথে জিহাদে আপনারাঅংশ নিয়ে থাকেন। আর আমরা আপনাদের গৃহের অন্যান্য কাজ করে থাকি। আপনাদের প্রিয় সন্তানদের লালন পালন করে থাকি।
অতএব, হে আল্লাহর রসূল! আপনারা যে প্রতিদান পেয়ে থাকেন তাতে কি আমরা শরীক হব না? বর্ণনাকারী বলেন, নবী (সাঃ) সাহাবীদের প্রতি পুরাপুরি মুখ ফিরালেন তারপর বললেন, তোমরা কি কখনো শুনেছো ধর্মীয় বিষয়ে এ নারীর প্রশ্নের চেয়ে উত্তম কথা বলতে কোন নারীকে? তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা ভাবতেই পারিনি একজন নারী এত সুন্দর কথা বলতে পারে। এবার নবী (সাঃ) মহিলার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন।
অতএব বললেন, “ওহে নারী তুমি ফিরে যাও এবং তোমার পিছনের সকল নারীকে জানিয়ে দাও যে, তোমাদের কারো নিজ স্বামীর সাথে সদ্ভাবে সংসার করা, স্বামীর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করা এবং তার মতামতের অনুসরণ করা উপরোক্ত সকল ইবাদতের ছওয়াবের বরাবর (সমান)।” (বায়হাকী)
আরও পড়ুনঃ মহিলাদের মসজিদ ও ঈদগাহে গমন
সন্তানের অধিকারঃ
এ পৃথিবীর জীবনে মানুষের প্রিয় বস্তুর মধ্য থেকে অন্যতম প্রিয়তম বস্তু হলো সন্তান-সন্ততি এবং আখিরাতের জীবনেও আনন্দের হবে। কোরআনে একাধিকবার ঘোষণা করেছেন যে, “বেহেশতে মুমিনগণ তাদের সন্তানদের সাহচর্য উপভোগ করবেন এবং যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি যারা ঈমানের বিষয়ে তাদের অনুগামী হয়েছে, তাদের সাথে মিলিত করবো তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মকাল কিছুমাত্র হ্রাস করব না। সন্তানদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে সত্যিকারের আনন্দের উৎস বানাতে হলে আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে, দায়িত্বের অবহেলার কারণে সন্তান আনন্দের পরিবর্তে চিরস্থায়ী জাহান্নামের কারণ হতে পারে। এজন্য কোরআন হাদীসে সন্তানদের পিতা-মাতার কর্তব্য ও দায়িত্ব বিশেষরুপে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম দায়িত্ব হলো, সন্তানের জন্য যোগ্য পিতা-মাতা অর্থাৎ ধার্মিক-ধার্মিকা পাত্র-পাত্রী বাছাই করা। শুধুমাত্র পাত্র-পাত্রীর জাগতিক আনন্দ ও তৃপ্তির দিকে খেয়াল না করে, আগত প্রজন্মের কল্যাণের দিকে খেয়াল রেখে পাত্র-পাত্রীর বিবাহ শাদী দেয়া অত্যন্ত জরুরী এবং হাদী.সে এ বিষয়ে অর্থাৎ ধার্মিকতার দিক দিয়ে অনেক তাগিদ রয়েছে।
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্বগুলির অন্যতম হলো, জন্মের সময় তার কানে আযান দেওয়া, তার সুন্দর নাম রাখা, মুখে মিষ্টি বা খাদ্য ছোয়ানো, আকিকা করা ইত্যাদি। নবজাতকের কানে সর্বপ্রথম আল্লাহর নাম ও তাঁর মহত্ব ও একত্বই সর্বপ্রথম প্রবেশ করে এ জন্য জন্মের পরেই তার কানে আযান দেওয়ার কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু রাফি রা. বলেন,“আমি দেখলাম যে, ফাতেমা (রাঃ) যখন হাসানকে জন্ম দিলেন তখন রসূল (সাঃ) হাসানের কানে নামাযের আযানের মত আযান দিলেন।”
বর্তমানে হাসপাতাল, ক্লিনিক বা মাতৃগৃহে অনেকেই এ মূল্যবান সুন্নত পালনে অবহেলা করছে। অভিভাবকদের এ বিষয়ে খুবই সচেতন হওয়া দরকার। বর্তমানে অনেক ক্লিনিক ও হাসপাতালে নবজাতক শিশু জন্মগ্রহণ করার পর তার আযান দেয়া বন্ধ করা হয়েছে। আমাদের দেশের কথাই বলি, অমুসলমানদের ক্লিনিকগুলিতে বিভিন্ন কৌশলে নিষেধ করা হয়, এ বিষয়ে আমাদের খেয়াল রাখা দরকার। আমাদের দেশে সন্তান একটু বড় হলে তার মুখে প্রথম ভাত দিয়ে “মুখে ভাত” অনুষ্ঠান করা হয়।
এটা ইসলামের আদর্শ নয় বরং হিন্দুয়ানি সাংস্কৃতি পক্ষান্তরে এব্যাপারে ইসলামের শিক্ষা হল তাহনীক করা,যা প্রিয় নবীজির সুন্নত। ‘তাহনীক’বলা হয়, নবজাতক শিশুকে জন্মের কয়েকদিনের মধ্যে কোন নেককার বুযুর্গ আলেমের নিকট নিয়ে মধু,খেজুর বা এজাতিয় কোন মিষ্টিদ্রব্য চিবানো লালা বাচ্চার মুখে দেয়া। সাহাবীগণ এভাবে তাদের নবজাতক শিশুদের তাহনীক করার জন্য রসূল (সাঃ) এর নিকট নিয়ে আসতেন এবং তাহনীক করার সময়ও রসূল (সাঃ) কারো কারো নাম রেখেছেন।

অন্যান্য হাদীসে জন্মের সপ্তম দিনে নাম রাখার কথা বলা হয়েছে। নবজাতক শিশুর নাম রাখতে হবে যে নামের সুন্দর অর্থ, রসূল (সাঃ) শিশুদের নাম রাখতেন সুন্দর বা সঠিক অর্থবহ নাম, আল্লাহর নামের দাসত্ববোধক নাম, নবীগণের নাম ইত্যাদি পছন্দ করতেন। ‘আব্দুল্লাহ’ এবং ‘আব্দুর রহমান’ এ নাম দুটি আল্লাহর নিকট প্রিয় বলে তিনি বলেছেন, যে সব নামের অর্থ খারাপ বা কঠিন এরুপ নাম রাখতে তিনি অপছন্দ করতেন। অনেক সময় তিনি এই ধরনের নাম পরিবর্তন করে দিতেন।
সন্তান জন্মের ৭ম দিনে নবজাতকের শরীরের ময়লা পরিস্কার করা, চুল কাটা, চুলের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য দান করা এবং তার পক্ষ থেকে একটি মেষ বা ছাগল আকীকা হিসাবে জবাই করার নির্দেশ হাদীস শরীফে এসেছে। রসূল (সাঃ) নিজে হাসান ও হুসাইনের জন্য একটি করে ছাগী আকিকা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যদি কারো সন্তান জন্মগ্রহণ করে তাহলে সে চাইলে তার সন্তানের পক্ষ থেকে পশু জবাই করবে। পুত্র শিশুর পক্ষ থেকে দুইটি সমান ছাগল-মেষ এবং কন্যা সন্তানের পক্ষ থেকে একটি।”
আকিকার গোস্ত কোরবাণীর গোস্তের মত পরিবারের সদস্যগণসহ ধনী দরিদ্র সকলেই খেতে পারবে। প্রতি মুসলিম পিতামাতার অন্যতম দায়িত্ব হল যথাসময়ে শিশু ছেলেকে খতনা করানো।
হাদীস শরীফে জন্মের সপ্তম দিনেই খতনা করানো নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ও জন্মের সপ্তম দিনের মধ্যে খতনা করানো উত্তম। তবে পরে খতনা করানো নিষিদ্ধ নয়। খতনার উপলক্ষে অনুষ্ঠানাদি করার কোন নির্দেশ বা অনুমতি কোরআন হাদীসে দেখা যায় না। হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, “রসূল (সাঃ) হাসান ও হুসাইনের জন্য তাঁদের আকীকা করেন এবং তাদের খতনা করান তাদের জন্মের সপ্তম দিনে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে ৭টি বিষয় সুন্নত, তার অন্যতম হলো তার নাম রাখা ও খতনা করানো।” মাতার উপর দায়িত্ব হলো দু’বছর সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো।
পিতার দায়িত্ব মাতার জন্য এরুপ দুগ্ধদানের যথাযোগ্য ব্যবস্থা করা। ৫মাস বয়স থেকেই শিশুকে অন্যান্য খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত করতে হবে, যেন দু’বছরের মধ্যে তাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যায়। অল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর সন্তানবর্তী নারীরা তাদেরসন্তানদের পূর্ণ দু’বছর দুধ খাওয়াবে যদি দুধ খাওয়াবার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়, আর সন্তানের অধিকারী অর্থাৎ পিতার উপর হলো সে সমস্ত নারীর খোরপোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ি।” (বাকারা-২৩৩)
আপনি পড়ছেন
সন্তান লালন পালনের পদ্ধতি।
সামনে চলুন। আরও পড়ি।
স্বামী-স্ত্রী উভয়ই সন্তানের অভিভাবকঃ
‘পুরুষ তার স্ত্রী ও সন্তানদের অভিভাবক।’ স্বামীর ঘরে অধীনস্থ তার স্ত্রী ও সন্তানদের সকল বিষয়ে সে-ই দায়িত্বশীল এবং প্রতিটি পুরুষকেই তার এই অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাকে হাশরের ময়দানে এসব সম্পর্কে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। তাকে অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে, তোমাকে যে পরিবারের কর্তা ও অভিভাবক নির্বাচন করা হয়েছিল, তুমি সে পরিবারের সদস্যদের সাথে কেমন আচরণ করেছিলে? তাদের প্রতি তোমার কি দায়িত্ব ছিল এবং তা তুমি কিভাবে আদায় করেছিলে? তারা যেন দ্বীনের ওপর চলে এ বিষয়ের প্রতি কি তুমি লক্ষ্য রেখেছিলে? তোমার অধীনস্তরা আবার জাহান্নামে যাচ্ছে না তো? এসব দায়িত্ব তুমি পালন করেছ তো? এসব কথা কি তোমার মনে ছিল? এ মর্মে কোরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদেরকে এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।”
অর্থাৎ তুমি নিজে শুধু জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে যাবে, নিজে নামায পড়বে, রোজা রাখবে, ফরয, ওয়াজিব, নফল সব কিছুই আদায় করবে অথচ সন্তানরা অন্যায় পথে পরিচালিত হবে, এদের কোন ভাবনাই নেই- এটা ঠিক নয়। বরং দায়িত্ব আদায় না করার কারণে শাস্তিভোগ করতে হবে।
আর স্ত্রীকে বলা হয়েছে স্বামীর ঘর-সংসারের অভিভাবিকা এবং স্ত্রী তার স্বামী ঘর-সংসার ও তার সন্তানদের অবিভাবক। দুইটি বিষয়ের দেখাশুনার দায়িত্ব স্ত্রীকে দেয়া হয়েছে। এক- স্বামীর ঘর-সংসার, দুই- সন্তানের দেখা-শোনা করার দায়িত্ব স্ত্রীর।
শিশুদের স্তন্যদান মায়ের উপর দায়িত্বঃ
প্রথমতঃ শিশুকে স্তন্যদান মাতার উপর দায়িত্ব। কোন অসুবিধা ব্যতীত ক্রোধের বশবর্তী হয়ে বা অসন্তুষ্টির দরুণ স্তন্যদান বন্ধ করলে পাপ হবে এবং স্তন্যদানের জন্য স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে কোন প্রকার বেতন বা বিনিময় নিতে পারবে না, যতক্ষন পর্যন্ত বিবাহবন্ধন বিদ্যমান থাকে। কেননা, এটা স্ত্রীর দায়িত্ব।
দ্বিতীয়তঃ পূর্বেই স্থির হয়েছে যে, স্তন্যদানের পূর্ণ সময় দু’বছর। যদি কোন যুক্তিসঙ্গত কারণে বন্ধ করার প্রয়োজন না হয়, তবে তা বাচ্চার অধিকার। এতে একথাও বোঝা যাচ্ছে যে, স্তন্যদানের সময়সীমা দু’বছর ঠিক করা হয়েছে, এরপর মাতৃস্তনের দুধ পান করানো চলবে না। তবে কোরআনের কোন কোন আয়াত এবং হাদীসের আলোকে ঈমাম আবু হানীফা (রহ.) শিশুর দুর্বলতার ক্ষেত্রে ত্রিশ মাস বা আড়াই বছর পর্যন্ত এ সময়সীমাকে বর্ধিত করেছেন। আড়াই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর শিশুকে মাতৃস্তনের দুধপান করানো সকলের ঐকমতে হারাম।
সু-শিক্ষার সুফলঃ
আল্লাাহ তায়ালা বলেন, “মমিনগণ তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোর স্বভাবের ফেরেস্তাগণ। আল্লাহ তায়ালা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করেনা এবং যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।” (সূরা আত তাহরীম-৬)
জাহান্নাম থেকে বাচার সু-শিক্ষার বিকল্প নেই। রাসূল (সাঃ) বলেন, “ইলমে দীন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসমমানদের উপর ফরয।” সন্তান-সন্ততির সু-শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। ফিকাহবিদগণ বলেন, সন্তান -সন্তাতিকে ফরয কর্মসমূহ এবং হালাল ও হারামের বিধানাবলী শিক্ষা দেয়া এবং তা পালন করানোর চেষ্টা করা প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরয। কিন্তু ধর্মীয় ও নৈতিক বিষয়ে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে রসূল (সাঃ) কঠোর হতে বলেছেন।
“তোমাদের সন্তানদের বয়স ৭ বছর হলে তাদেরকে নামায আদায়ের জন্য নির্দেশ দিবে এবং দশ বছর বয়সে তাদেরকে নামাযের জন্য মারধর করবে এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দেবে।” (আবু দাউদ শরীফ)
সন্তান কে সৎ ও ধার্মিকরুপে গড়ে তুলতে পারা একদিকে নিজের উপর অর্পিত ফরয দায়িত্ব পালন, অপরদিকে দুনিয়া ও আখেরাতের পরম সাফল্য। রসূল (সা) বলেন, “যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সকল কর্ম বন্ধ হয়ে যায়। শুধুমাত্র তিনটি ছাড়া, সদকায়ে জারিয়া, কল্যাণকর জ্ঞান এবং নেককার সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (মুসলিম শরীফ)। রাসূল (সাঃ) বলেন, “জান্নাতে কোন কোন ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে। তখন সে বলবে; কিভাবে আমার মর্যাদা বৃদ্ধি পেল? তখন তাকে বলা হবে, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনার ফলে।” (ইবনে মাজাহ)।
সন্তানদের আচরণ লক্ষ্য করা এবং তাদেরকে ¯েœহের সাথে সঠিক আচরণ শিক্ষা দেয়া রসূল (সাঃ) এর রীতি। এক হাদীসে ওমর ইবনে আবু সালামাহ (রাঃ) বলেন, “আমি কিশোর বয়সে রসূল (সাঃ) এর গৃহে লালিত পালিত হয়েছি, খাওয়ার সময় আমি হাত বাড়িয়ে পাত্রের বিভিন্ন স্থান থেকে খাদ্য গ্রহণ করতাম। তিনি আমাকে বলেন, ‘হে কিশোর, তুমি আল্লাহর নামে খাও, ডান হাত দিয়ে খাও এবং পাত্রের মধ্যে তোমার নিকটবর্তী স্থান থেকে খাদ্যগ্রহণ কর।’ উমর বলেন, তখন থেকে আমি সর্বদা এভাবেই খাদ্য গ্রহণ করে থাকি।” (বোখারী ও মুসলি)

প্রিয় পাঠক-পাঠিকাবৃন্দ, সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে অন্যতম বিষয় হলো, তাদেরকে “শক্তিশালী” রুপে গড়তে হবে। ঈমানের শক্তি, মনের শক্তি, দেহের শক্তি সকল দিক থেকেই তারা শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠবে।
রসূল (সাঃ) বলেন, “শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মুমিনের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর ও প্রিয়তর।” (মুসলিম শরীফ)। সন্তানদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ ও শক্তি অর্জনের জন্য তাদের শরীর চর্চামূলক খেলাধুলা করতে ইসলামে উৎসাহ দেওয় হয়েছে। বিশেষতঃ তীর নিক্ষেপ, ঘোড়ার পিঠে আরোহণ, সঁতার ইত্যাদি খেলাধুলা বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। তবে ইসলামী নীতিমালা ব্যতিরেকে অমুসলমানদের তৈরী ক্রীড়ার দিকে ঝুকে না পড়ে আমাদের সন্তানরা, সেই .দিকে খেয়াল রাখা দরকার।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা,সন্তানদের অর্থনৈতিক শক্তি ও সচ্ছলতার বিষয়ে রসূল (সাঃ) বলেন, “ তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের কে সচ্ছল রেখে যাবে, সেটাই উত্তম, তাদেরকে মানুষের দয়ার মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে।” (বুখারী)
আজকাল পাশ্চাত্যের বিপথগামী সমাজগুলির মত আমাদের মুসলিম সমাজের পিতা-মাতা সন্তানদের মানসিক বিকাশের দিকে লক্ষ্য দেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, পিতা-মাতা নিজেদের কর্ম, বন্ধুত্ব ও সামাজিকতা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে, সন্তানদেরকে সময় দিতে পারেন না।
অথচ পিতা-মাতার সময় ও বন্ধুত্বের সবচেয়ে বেশি হকদার সন্তানগণ। প্রতিদিন তাদেরকে কিছু সময় দেওয়া, তাদের মনের কথা ও সমস্যাগুলি জানা, তাদের সাথে নিয়মিত কিছু সময় ইসলাম সম্মত চিত্ত-বিনোদন ও খেলাধুলায় সময় কাটানো পিতামাতার দায়িত্ব। কোরআন ও হাদীসে বারংবার দয়া, মমতা, ক্ষমা ইত্যাদির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্য সকলের চেয়ে এগুলির সবচেয়ে বেশি হকদার সন্তান -সন্ততি। এছাড়া সন্তান -সন্ততি ও পরিবারের সদস্যদের জন্য ¯হে মমতা, দয়া ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশ বিশেষভাবে দেওয়া হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর পারষ্পরিক মমতা, বিনম্রতা, ক্ষমা ইত্যাদি সন্তানদেরকে প্রভাবিত করে।
রসূল (সাঃ) আয়েশা (রাঃ)-কে বলেন, “হে আয়েশা, তুমি বিনম্র ও বন্ধুভাবাপন্ন হও। কারণ আল্লাহ যদি কোন পরিবারের কল্যাণ চান, তাহলে তাদেরকে বিনম্রতা, সংযতা ও বন্ধুভাবাপন্নতা দান করেন।
রসূল (সাঃ) নিজে শিশু কিশোরদের অত্যন্ত ভালবাসতেন এবং ¯ স্নেহ করতেন। হুজুর (সাঃ) এর কাছে কোন খেজুর ইত্যাদি হাদীয়া আসলে তিনি দোয়া করতেন এবং তার নিকটে অবস্থানকারীদের মধ্যে সবচেয়ে যে ছোট তাকে প্রথমে তা প্রদান করতেন। হুজুর (সাঃ) এর কাছে শিশু বাচ্চাকে আনা হলে তাকে কোলে নিতেন, -স্নেহ আদর করতেন এবং মাথায় হাত বুলাতেন। তিনি তাঁর নাতিদেরকে নিয়ে খেলতেন এবং তাদেরকে অনেক সময় দিতেন। (বুখারী)। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, “সন্তান – সন্ততি ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি স্নেহ ও মায়ামমতা করার ক্ষেত্রে রসূল (সাঃ) এর চেয়ে বেশি কাউকে আমি দেখিনি।” (মুসলিম)।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, হাদীয়া, উপঢৌকণ,¯স্নেহ মমতা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে সকল সন্তানের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে হবে। কোন সন্তানকে অন্যদের থেকে পৃথকভাবে অতিরিক্ত স্নেহ করা কিম্বা ছেলেদের বেশি এবং মেয়েদের কম -হে করা, এ কাজ করাকে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। একদা নোমান ইবনে বাশীর (রাঃ) বলেন, “তাঁর পিতা, তাকে নিয়ে রসূল (সাঃ) এর নিকট এসে বলেন, আমি আমার এই ছেলেকে একটি খাদেম দান করেছি। তখন রাসূল (সাঃ) বলেন, তোমার সকল সন্তানকেই কি তুমি এরুপ দান করেছ? তিনি প্রতিউত্তরে কিছু বললেন, না। তখন রসূল (সাঃ) বলেন, এটি ফিরিয়ে নাও।” (বুখারী)
রসূল (সাঃ) বলেছেন যে, “তোমাদের সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখবে।” (বুখারী)
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিকভাবে সন্তান প্রতিপালনের তাওফিক দান করুন।
কু-শিক্ষার কু-ফলঃ
সন্তান হত্যা যে অপরাধ ও কঠোর গোনাহ তা বাহ্যিক হত্যা ও মেরে ফেলার অর্থে তো সুস্পষ্টই। কিন্তুচিন্তা করলে বোঝা যায় যে, সন্তানকে শিক্ষা-দীক্ষা না দেয়া এবং তার চরিত্র গঠন না করা, যদ্দরুণ সে আল্লাহর রসূল (সাঃ) ও পরকালের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে ও চরিত্রহীন এবং নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে, এটাও সন্তানহত্যার চাইতে কম অপরাধ নয়।
কোরআনের ভাষায় যে ব্যক্তি মৃত, যে আল্লাহকে চিনে না এবং তাঁর আনুগত্য করে না, যারা সন্তানদের কর্ম ও চরিত্র সংশোধনের প্রতি মনযোগ দেয় না, তাদেরকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়, কিংবা ভ্রান্ত শিক্ষা দেয়, যার ফলে ইসলামী চরিত্র ধ্বংস হয়ে যায়। তারা একদিকে সন্তানহত্যার অপরাধে অপরাধী, বাহ্যিক হত্যার প্রভাবে তো ক্ষণস্থায়ী জীবন বিপর্যস্ত হয়। কিন্তু এ হত্যা মানুষের পারলৌকিক ও চিরস্থায়ী জীবনের মূলও ধ্বংস করে দেয়। তাই আসুন আমরা আমাদের সন্তান লালন পালনের পদ্ধতি জেনে তার উপর আমল করি।



