Responsive Menu with Logo & Banner
Banner

আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব

Picture of মুফতি রেজাউল করিম

মুফতি রেজাউল করিম

প্রফেশনাল ওয়েবসাইট ডিজাইনার

আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব

যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক বিতর্কের বিষয় হলো, আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব। বিষয়টি নিয়ে মানুষ প্রচুর সার্চ করে গুগলে। তাই এ বিষয়টি আমার ওয়েবসাইটে পাবলিশ করলাম। আশা করছি পাঠকরা উপকৃত হবেন। চলুন তাহলে শুরু করি আজকের বিষয়,

আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব

দ্বীন এক কিন্তু মাযহাব চারটি হওয়ার কারণ

স্বীকৃত চার মাযহাবের মধ্যকার বৈধ ও প্রশংসিত ইখতিলাফকে দ্বীন তথা কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী পন্থা হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে ইমাম ও মাযহাব সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে মরিয়া বিশেষ এক গোষ্ঠী। মাযহাবের এ পার্থক্য কি কুরআন-সুন্নাহর মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করা; কিংবা মুসলিম উম্মাহকে দ্বীনের ব্যপারে পরস্পরবিরোধী ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত করা;  না মাযহাবের মধ্যে  প্রকাশিত এ ইখতিলাফ দ্বীনের মূল উৎস থেকেই উৎসারিত ? এ সম্পর্কে তথ্যবহুল বিশদ আলোচনা করা হয়েছে বক্ষমাণ নিবন্ধে। এসে মাযহাবের বিভিন্নতা সম্পর্কে উত্থাপিত পশ্নের সারগর্ভ পর্যোলোচনা করা হয়েছে। -সম্পাদক]

ইসলাম প্রচারের প্রাচীন পদ্ধতি :

বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ও আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামের প্রচার প্রসার তত্ত্বের চেয়ে ব্যবহারিক পর্যায়েই বেশি অগ্রসর হয়েছে। কেননা, পৃথিবীর সকল অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষকে তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত জীবনব্যবস্থার দিকে সফল ও সার্থক দাওয়াত দিতে চাইলে কোনো কঠিন ও জটিল পন্থা অবলম্বন করার সুযোগ নেই। হযরত নবী করীম সাঃ ও সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর সরল ও পুরনো পন্থাই কার্যকরী পন্থা। হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে জীবনের প্রতিটি বিষয় হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। কোনো বই-পুস্তক ধরিয়ে দিয়ে গবেষণা করে বুঝে নিতে বলেই দায়িত্ব শেষ করেননি।পৃথিবীর অপরাপর এলাকায় বসবাসরত সমকালীন মানুষ এবং পরবর্তী সকল যুগের অনাগত বিশ্বমানবমন্ডলীর কাছে নিজের দাওয়াত পৌঁছে দিতেও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা, পান্ডুলিপি ইত্যাদির আশ্রয় নেননি। তিনি তাঁর সাহাবীগণকে দায়িত্ব দিয়েছেন বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া এবং তার আদর্শের একটি বাণী হলেও পূর্ব-পশ্চিমে বসবাসরত প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার। হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলতেন-  صلوا كما رأيتموني أصليঅর্থ :তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখ, সেভাবে নামায পড়।

সাহাবীরাও তেমনি নতুন কোনো মানুষকে অযু শেখানোর সময় তাদের সামনে বসে অযু করতেন এবং বলতেন- هذا وضوء رسول الله صلي الله عليه وسلم

অর্থ :এই ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অযু।

ইসলামের প্রতিটি বিধানই প্রাথমিকভাবে এর ধারক-বাহকদের মাধ্যমে ব্যবহারিক তথা প্রায়োগিকভাবেই বি¯তৃত ও প্রচলিত হয়েছে।

আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব
           আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব

চার মাযহাবের সূচনা :

হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীতে এসে মুসলিম উম্মাহর উলামাগণ জ্ঞানচর্চার বিচারে এবং রুচি ও মননের ভিত্তিতে দু’টি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েন। ‘মুহাদ্দিসীন ফুকাহা’ এবং ‘ফুকাহা মুহাদ্দিসীন’। মুহাদ্দিসীন ফুকাহার প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন ইমাম মালেক রহঃ, (মৃত্যু : ১৭৯ হিজরী) আর ফুকাহা মুহাদ্দিসীনের প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করেন ইমাম আযম আবু হানীফা রহঃ, (মৃত্যু ঃ ১৫০ হিজরী) অতঃপর উম্মাহর মাঝে এই মহান দুই ইমামের অনুসরণের ধারা চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় যখন তাঁদের শিষ্যদের যুগ এল, তখন দেখা গেল ইমাম আযম রহঃ এর শিষ্যদের মধ্যে অনেকে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী আলেম হওয়া সত্ত্বেও স্বীয় উস্তাদ কর্তৃক কুরআন-সুন্নাহ থেকে গৃহীত মূলনীতি থেকে দূরে সরে যাননি। বরং তাঁর গৃহীত ও অনুসৃত মূলনীতিকে আঁকড়ে ধরেই পথ চলেছেন। যেমন ইমাম আবু ইউসুফ (মৃত্যুঃ ১৮২ হিজরী) ও ইমাম মুহাম্মদ রহঃ (মৃত্যু ঃ ১৮৯ হিজরী)

পক্ষান্তরে ইমাম মালেক রহঃ এর শিষ্যদের ক্ষেত্রে ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা। তাঁর বিশিষ্ট শিষ্য ইমাম শাফেয়ী রহঃ (মৃত্যুঃ ২০৪ হিজরী) তাঁর কাছ থেকে ইলম হাসিল করার পর ইরাক চলে যান এবং সেখানে গিয়ে ইমাম আযম আবু হানীফা রহঃ এর শিষ্যদের (যেমন ইমাম মুহাম্মদ রহ) কাছ থেকেও ইলম হাসিল করেন। ইমাম শাফেরী রহঃ দুই চিন্তা ও আলোচিত জ্ঞান সাগরের দুই ধারায় অবগাহনের ফলে কিছু কিছু উসূল তথা নীতিমালার ক্ষেত্রে যেমন ভিন্নমত পোষণ করেছেন, তেমনি শাখাগত মাসায়েলের ক্ষেত্রেও ভিন্নমত পোষণ করেছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই স্বীকৃত মুজতাহিদেরও যথেষ্ট অনুসারী সৃষ্টি হয়।

আরও পড়ুনঃ নারী পুরুষের নামাজের পার্থক্য কি কি

অতঃপর হযরত ইমাম শাফেরী রহঃ এর বিশিষ্ট শিষ্য ইমাম আহমাদ রহঃ (মৃত্যুঃ ২৪১ হিজরী) ঐতিহাসিক খালকে কুরআনের ফিৎনার সময় অসাধারণ ত্যাগ ও কুরবানীর ফলে তার অনুসারীদের আরেকটি জামাআত গড়ে ওঠে। আর এই চার ইমামের জ্ঞানভান্ডার তাঁদের পরবর্তী ছাত্র-শিষ্যগণ গভীর যতœ-সতর্কতা ও নিষ্ঠার সাথে সংরক্ষণ ও সংকলন করে নেন। এই চার ইমাম ব্যতীত সমকালে আরও অনেক স্বীকৃত ও অনুসৃত মুজতাহিদ ছিলেন এবং তাদেরও উল্লেখযোগ্য অনুসারী ছিল। কিন্তু তাদের শিষ্যগণ তাদের আহরিত অসাধারণ জ্ঞানভান্ডারকে সংরক্ষণ করেননি। ফলে আমজনগণের মাঝে তাদের অনুসরণের ধারাও আর অব্যাহত থাকেনি।অতঃপর যখন আদব ও আখলাক, তাকওয়া ও খোদাভীতি, আমল ও আখেরাত চিন্তায় উম্মাহর চরম অধঃপতন ও পদস্খলন ঘটল, তখন উম্মাহর ইজমা হল, এখন থেকে এই চার ইমামের বাইরে আর কোনো ইমামের অনুসরণ ও তাকলীদ করা যাবে না। কেননা, কুরআন-সুন্নহর যে প্রায়োগিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষনের সমষ্টি, তা অন্য কোনো ইমামের শিষ্যগণের মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকেনি। কেননা, ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারণশীল ও জীবনে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান উদঘাটনে সক্ষম কেবল ঐ চারটি মাযহাবের ইমামগণই। সুতরাং ঐ নির্দিৃষ্ট ইমামের বাইরে বিক্ষিপ্তভাবে কারও মতামত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানে হবে প্রবৃত্তির অনুসরণ। যে চারটি মাযহাব কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিজ্ঞ ও যুগের শ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ ও ফকীহগণের মাধ্যমে সংকলিত এবং সুসংহত। চারও মাযহাবের চারও ইমাম মুজতাহিদ ছিলেন। আর তারা স্বঘোষিত নন; বরং সমকালীন ও পরবর্তী অন্যান্য ইমামগণ কর্তৃক স্বীকৃত।

কুরআন-সুন্নাহর আলোকে উদ্ভুত মাসআলার সমাধান উদঘাটনে তারা ছিলেন পারঙ্গম। তাদের প্রতিটি মত কুরআন-সুন্নাহরই ব্যাখ্যা ও গবেষণার ফসল। যদিও তাদের মাঝে মতানৈক্য দেখা যায়। কেননা, যাচাই বাছাই ও অনুসন্ধানের পরে স্পষ্ট হয় যে, ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ ও মতভেদপূর্ণ সিংহভাগ মাসআলা মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ফকীহ সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর যামানা থেকে চলমান। সুতরাং, মাযহারের তমভিন্নতাকে বিভেদ মনে করা যেমন অন্যায় ও অযৌক্তিক, তেমনি তাকে শরীয়ত বিকৃতি বা বিদআতের অনুপ্রবেশের অপবাদ আরোপ করাও চরম অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার বহিঃপ্রকাশ।

কেননা, সাহাবায়ে কেরামের মতবৈচিত্রপূর্ণ কোনো বিষয় কিংবা সাহাবা যুগের পরবর্তীতে উদ্ভূত কোনো নতুন সমস্যার সমাধান নির্বাচন ও র্পযবেক্ষণ ছাড়া নিরূপণ করা সম্ভব ছিল না। ফলে অসংখ্য মত ও মাযহাবের বৈচিত্র ছিল খুবই স্বাভাবিক, যার মধ্যে অপেক্ষাকৃত প্রসিদ্ধ চারটি মাযহাবের সাথে মুসলিম জনসাধারণ সমধিক পরিচিত। এসব মাযহাবের কোনোটিই কুরআন-সুন্নাহর বহির্ভূত নয় এবং কোনটিই এমন নয়, যার অনুসরণ করলে আমরা কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী বলে গণ্য হব না। এ কারণেই এক মাযহাবের ইমাম অন্য মাযহাবের ইমামের এলাকায় বেড়াতে গিয়ে তার ফিকহ অনুসারেই আমল করেছেন; এমন উদাহরণও ইমামদের জীবনে দেখা যায়। যেন আমরা বুঝতে সক্ষম হই যে, মাযহাব শুধু একই গন্তব্যের ভিন্ন ভিন্ন সঠিক পথ।

অতএব, মাযহাব মানা আর কুরআন-সুন্নাহর মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। চার মাযহাবের মধ্যকার মাতানৈক্যকে বাঁকা চোখে দেখার লোকজন শত শত বছর আগে থেকেই ছিল তা বুঝা যায় ইমাম সুয়ূতী রহঃ এর একটি মন্তব্য থেকে। তাতে তিনি মাযহাবের মতানৈক্যকে উম্মাহর বৈশিষ্ট এবং এ ব্যাপারে অভিযোগ উত্থাপনকারীদেরকে মূর্খ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

قال الإمام السيوطي رحمه الله تعالي في أوائل رسالته جزيل المواهب في اختلاف المذاهب فصل.اعلم أن اختلافالمذاهب في هذه الملة نعمة كبيرة .وفضيلة جزيلة عظيمة وله سرلطيف أدركه تاعالمون وعمي عنه الجاهلون .حتي سمعت بعض الجهال يقول النبي صلي الله عليه وسلم جاء بشرع واحد فمن أين مذاهب أربعة

ইমাম সুয়ূতী রহঃ (মৃত্যু ঃ ৯১১ হিজরী) তার লিখিত কিতাব ‘জাযিলুল মাওয়াহিব ফী ইখতিলাফিল মাযাহিব’- এ বলেন, জেনে রাখুন, এই উম্মতের মধ্যে মাযহাবের ভিন্নতা অনেক বড় একটি নেয়ামত এবং মুসলিম মিল্লাতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই মতানৈক্যের সুক্ষ্ম রহস্যও রয়েছে। বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামই শুধু তা বোঝেন। আর মূর্খ লোকেরা সে ব্যাপারে অজ্ঞ ও অন্ধ। এ কারণেই আমি কোনো কোনো মূর্খকে বলতে শুনেছি যে, নবী কারীমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এক শরীয়ত নিয়ে এসেছেন, তাহলে এ চারটি মাযহাবের উদ্ভব কোথা থেকে হল ? (আদাবুল ইখতিলাফ ২৮)

চার মাযহাবের মতানৈক্যের অন্যতম উৎস সুন্নাহর ভিন্নতা ঃ

চার ইমাম ও অন্যান্য ইমামগণ একেক জন একেক ফকীহ সাহাবীদের মত অনুসরণ করেছেন। দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে যে ইমামের নিকট যার মত বেশি শক্তিশালী, সহীহ ও সঠিক বলে মনে হয়েছে, তিনি সে মতটিই গ্রহণ করেছেন।

বলাবাহুল্য, সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের ইজতিহাদের ভিত্তিতে যে আমল করেছেন, তাতে তিনি

নিস্কৃতিলাভকারী এবং সর্বাবস্থায় প্রতিদান লাভকারী। এ ব্যাপারে সর্ব যুগের সমস্ত উলামায়ে কেরাম একমত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরবর্তীদের জন্য তাদের অনুসরণকে হেদায়েত বলে আখ্যা দিয়েছেন। যেমন, নবী কারী সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

مهمااوتيتم من كتاب الله فالعمل به لا عذر لاحدكم في تركه فان لم يكن في كتاب الله فسنة ماضية مني فان لم تكن سنة مني فما قال أصحابي ,ان أصحابي بمنزلة النجوم في السماء فأيها أخذتم به اهتديتم واختلاف أصحابي لكم رحمة.

যখনই তোমাদের কাঙ্খিত বিষয় কিতাবুল্লাহ তথা কুরআনের মধ্যে পাবে, তখন তার উপর আমল করা জরুরি। তা ছেড়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। আর যদি কুরআনের মধ্যে না পাওয়া যায়, তা হলে আমার রেখে যাওয়া সুন্নাহর অনুসরণ করবে। যদি সে বিষয় সম্পর্কে আমার রেখে যাওয়া সুন্নাহয় কোনো সমাধান না থাকে, তা হলে আমার সাহাবাগণ যা বলবে, তার অনুসরণ করবে। কেননা, আমার সাহাবারা আকাশের নক্ষত্রতুল্য। তাদের মধ্যে যে কারও অনুসরণ করবে, হেদায়েত পেয়ে যাবে। আর আমার সাহাবাদের ইখতিলাফ তোমাদের জন্য রহমতস্বরূপ।

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার হাইছামী রহঃ ‘খাইরাতুল হাস্সান’ এর মধ্যে বলেন- (বাইহাকি ফিল মাদখাল ১৬৩)

ففي هذاالحديث اخباره صلي الله عليه وسلم باختلاف المذاهب بعده في الفروع منذ اصحابه الذين هو زمان الهدي والارشاد المشهود من مشرفهم بانه خير القرون في الاطلاق ويلزم من اختلاف من بعدهم.

উপরোল্লিখিত হাদীসে রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে যে, তার পরবর্তীদের মধ্যে শাখাগত বিষয়ের মতানৈক্য সাহাবায়ে কেরামের যামানা থেকেই হবে।যে যামানা ছিল হেদায়েতের নমুনা।

 

যে যামানাকে রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইরুল কুরূন তথা সর্বশ্রেষ্ঠ যামানা বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আর সাহাবায়ে কেরামের মাঝে মতানৈক্য হওয়া তাদের পরবর্তীদের মাঝে মতানৈক্যকে অপরিহার্য করে।সুতরাং, রাসূলের আমলের ভিন্নতা ও বৈচিত্রের কারণে সাহাবাদের মধ্যেও যদি মতভিন্নতা সৃষ্টি হয়, তা হলে সেই মতভিন্নতা নিরসন করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনই তার সুযোগও নেই। কেননা, তা তো রাসূলের আমলের ভিন্নতা থেকেই সৃষ্ট। এ কারণেই তো তাবেয়ীগণের একেক জামাত একেক সাহাবীর মতকে অনুসরণ করে চলতেন।

 

আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব
আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব

আপনারা পড়ছেন,

আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব

সামন চলুন । আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।

 সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সংঘটিত ইখতিলাফ ঃ

সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সংঘটিত ইখতিলাফ ও মতানৈক্যের বিবরণ দিয়ে ‘জাযীলুল মাওয়াহিব ফী ইখতিলাফিল মাযাহিব’ গ্রন্থে ইমাম সুয়ূতী রহঃ (মৃত্যু ঃ ৯১১ হিজরী) বলেন-

وقد وقع الإختلاف في الفروع بين الصحابة رضي الله عنهم خيرالأمة فماخاصم أحد منهم أحدا.ولا عادي أحد أحدا ولا نسب أحد أحدا إلي خطأ ولاقصور.ووردأن إختلاف هذه الأمة رحمة من الله لها. وكان اختلاف الأمم السابقة عذابا وهلاكا.هذاأومعناه.ولا يحضرني الان لفظ الحديث. فعرف بذلك أن اختلاف المذاهب في هذه الملة.خصيصة فاضلة لهذه الأمة.وتوسيعفي هذه الشريعة السمحة السهلة.فكانت الانبياءقبل النبي صلي الله عليه وسلم يبعث أحدهم بشرع واحد .حتي إن من ضيق شريعتهم.لم يكن فيها تخيير في كثير من الفروع التي شرع فيها التخيير.وتحتم الدية في شريعة النصاري.ومن ضيقها أيضا لم يجتمع فيها الناسخ والمنسوخ كما وقع في شريعتنا.ولذا أنكراليهود النسخ.واستعظموانسخ القبلة

শাখাগত মাসআলার ক্ষেত্রে এই উম্মতের সর্বোত্তম মনীষী সাহাবায়ে কেরামের মাঝেও মতানৈক্য হয়েছে। কিন্তু কোনো সাহাবী অন্য কোনো সাহাবীর সঙ্গে বিবাদ-বিতর্কে  লিপ্ত হননি। আর একে অন্যের প্রতি ভুলের অভিযোগ তুলেননি। বর্ণিত হয়েছে, ‘এই উম্মতের মতানৈক্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। পক্ষান্তরে পূর্বেকার উম্মতদের মতানৈক্য ছিল ধ্বংস ও শাস্তির কারণ।

সুতরাং, উপরোল্লিখিত আলোচনার দ্বারা জানা গেল যে, এই উম্মতের মধ্যে অর্থাৎ শরীয়তে মুহাম্মদিয়ার মধ্যে মাযহাবের মতানৈক্য এই উম্মতের মাঝে প্রশস্ততা। আর আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বে সকল নবীগণকে আল্লাহ তা’আলা বলেন :-

আল্লাহ তা’আলা বৈচিত্রহীন এক হুকুম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। এ কারণেই তাদের শরীয়তে সংকীর্ণতার একটি দিক হল, শাখাগত বিষয়ে বৈচিত্র না থাকা। তাদের শরীয়তের সংকীর্ণতার আরেকটি দিক হল, তাতে নাসেখ-মানসূখ ছিল না; যা আমাদের শরীয়তে রয়েছে। এ কারণেই ইহুদীরা ‘নসখ’কে অস্বীকার করেছে এবং কিবলা পরিবর্তনকে অনেক বড় করে দেখেছে। (আদাবুল ইখতিলাফ ২৯)

عن عبدالله بن أبي قبيس هو رجل بصري قال سألت عائشة عن وتر رسول الله صلي الله عليه وسلم كيف كان يوتر من أول الليل أومن أخره ؟ فقالت كل ذلك قد كان يصنع وربما أوتر من أول الليل ربما أوتر من اخرهفقلت الحمدلله الذي جعل في الأمرسعة فقلت كيف كانت قراءته ؟ أكان يسر بالقراءةأم يجهر؟ قالت كل ذلك قد كان يفعل قد كان ربما أسر وربما جهر قال فقلتالحمدلله الذي جعل في الأمرسعة قلت فكيف كان يصنع في الجنابة؟ أكان يغتسل قبل أن ينام أو ينام قبل أن يغتسل ؟ قالت كل ذلك قد كان يفعل فربما اغتسل فنام وربما توضأ فنام قلت الحمدلله الذي جعل في الأمرسعة

আব্দুল্লাহ ইবনে আবু কায়স বলেন, আমি হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাঃ (মৃত্যু ঃ ৫৭ হিজরী) কে জিজ্ঞেস করলাম রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের নামায কখন পড়তেন ? রাতের প্রথম ভাগে নাকি শেষ ভাগে ?

 

হয়রত আয়েশা রাঃ উত্তর দিলেন, দু’সময়েই পড়তেন। কখনও রাতের প্রথম ভাগে বিতরের নামায পড়তেন, আবার কখনও রাতের শেষ ভাগে পড়তেন। হযরত কায়স রাঃ বলেন, আমি বললাম- সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ জন্য, যিনি শরীয়তের হুকুম পালনের ক্ষেত্রে প্রশস্ততা দান করেছেন। অতঃপর আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলের বিতরের কেরাত কেমন ছিল ? তিনি কি উচ্চ আওয়াজে কেরাত পড়তেন নাকি নীচু আওয়াজে? উত্তরে বল্লেন কখনও নিচু আওয়াজে পড়তেন আবার কখনও উচ্চ আওয়াজে পড়তেন। আব্দুল্লাহইবনে কায়স বলেন, আমি বললাম, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার জন্য, যিনি শরীয়তের হুকুম পালনের ক্ষেত্রে প্রশস্ততা দান করেছেন। আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরজ গোসল কখন করতেন ?

 

তিনি কি ঘুমানোর পূর্বে গোসল করতেন, না ঘুম থেকে উঠে গোসল করতেন ? উত্তরে আম্মাজান আয়েশা রাঃ বললেন, তিনি দুটোই করতেন। অনেক সময় আগে গোসল করতেন, তারপর ঘুমাতেন। আবার অনেক সময় শুধু ওযু করে গোসল ব্যতীতই ঘুমিয়ে যেতেন। (অতঃপর ঘুম থেকে উঠে গোসল করতেন) আমি বললাম, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি শরীয়তের হুকুম পালনের ক্ষেত্রে প্রশস্ততা রেখেছেন। ( সহিহ মুসলিম,তিরমিযী,আবু দাঊদ: আদাবুল ইখতিলাফের বরাতে ৩৬)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমলের বৈচিত্রের চমৎকার একটি নমুনা আব্দুল্লাহ ইবনে কায়স রহঃ এর এই হাদীস। আজ যারা শুধুমাত্র সনদের মানদন্ডে নির্দিষ্ট একটি হাদীসের উপর আমল করাকে অপরিহার্য ও একমাত্র সহীহ মনে করেন আর বাদ-বাকি সকল হাদীস ও হাদীসের বর্ণিত পদ্ধতিকে ভুল প্রমাণে মরিয়া, (যদিও তাতে অসংখ্য হাদীসের পাশাপাশি অসংখ্য সাহাবা-তাবেয়ীনের আমলকে ভুল আখ্যা দেওয়া হয়) উপরোক্ত হাদীস থেকে তাদের শিক্ষা নেওয়া উচিৎ।বিতর কখন পড়া উত্তম কিংবা বিতরের কিরাত উঁচু আওয়াজে পড়া উত্তম না নিচু আওয়াজে ইত্যাদি গৌণ মাসআলায় যদি ইখতিলাফ বা মতানৈক্য সৃষ্টি হয়, তা হলে তা যেমন অন্যায় নয়, তেমনি তা প্রত্যাখ্যাতও নয়। চাই তা সাহাবাযুগে সাহাবাদের মধ্যকার ইখতিলাফ হোক অথবা সাহাবা যুগ-পরবর্তী আইম্মায়ে ফুকাহাদের মধ্যকার ইখতিলাফ হোক।

 

কেননা, তা তো রাসূলের আমলেরই ভিন্নতা ও বৈচিত্র। একই কথা ‘আমীন’ জোরে বলা আস্তে বালা কিংবা নাভির উপর হাত বাঁধা এবং নাভির নিচে (বুকে নয়) হাত বাঁধা সম্পর্কে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কখনো নিঃশব্দে বলেছেন, কখনো সশব্দে বলেছেন। রাসূলকে যে সাহাবী যে আমল করতে দেখেছেন, তিনি রাসূলের সেই আমলেরই বর্ণনা দিয়েছেন। আর পরবর্তী ফুকাহায়ে কেরাম এ জাতীয় ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের সমন্বয়ে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তের বহুমাত্রিকতা থেকে একটি অবস্থাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এরই নাম তারজীহ। আর এ প্রাধান্যপ্রাপ্ত সমাধানগুলোই হচ্ছে মাযহাবের বৈচিত্রপূর্ণ অংশ।

আরও পড়ুনঃ নারীর চেহারা সতরের অংশ কি না

 

চার মাযহাবের মতানৈক্যের অপর উৎস ইজতিহাদের অবকাশ ঃ

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যকার কিছু কিছু মতভেদের উপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তুষ্ট ছিলেন, বরং তার উপর প্রশংসা করেছেন। তিনি তাদের এই ইখতিলাফকে উম্মতের জন্য রহমত হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে বনু কুরাইযার ঘটনা। খন্দক যুদ্ধ চলাকালীন ইয়াহুদী গোত্র বনু কুরাইযা মসুলমানদের সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। তাই খন্দক যুদ্ধ শেষে আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে বনু কুরাইযার সাথে জিহাদ করার হুকুম আসে। হুকুম আসামাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে খুব দ্রুত বনু কুরাইযার এলাকায় পৌঁছার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশটি ছিল দ্ব্যর্থবোধক।

لا يصلين احد منكم العصر الا في بني قريظة

তোমাদের কেউ যেন বনু কুরাইযায় পৌঁছার আগে আসরের নামায না পড়ে। ( সহিহ মুসলিম ৩৮৩৯)এই নির্দেশ পেয়ে সাহাবায়ে কেরাম রাঃ বনু কুরাইযা অভিমুখে নিজেদের সাধ্যমতো

 

দ্রুত ছুটলেন। কিন্তু চেষ্টা সত্ত্বেও আসরের ওয়াক্তের মধ্যে বনু কুরাইযায় গিয়ে পৌঁছতে পারলেন না। পথিমধ্যেই আসরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার উপক্রম। তখন রাসূলের বক্তব্যের মর্মোদ্ধারে সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর মাঝে  মতভেদ দেখা দিল। তাঁরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়লেন। একদল নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরাইযায় না পৌঁছে আসরের নামায পড়তে নিষেধ করেছেন, সেহেতু আমরা বনু কুরাইযায় পৌঁছেই আসর পড়ব; মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে গেলেও। অপর দল, যারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথার অন্তর্নিহিত মর্ম বুঝেছিলেন, তারা বললেন, নবীজির ওই কথার উদ্দেশ্য ছিল খুব দ্রুত বনু কুরাইযায় পৌঁছা; আসরের নামায কাযা করা উদ্দেশ্য নয়।

 

এখন আমরা যেহেতু সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করেও আসরের ওয়াক্তে বনু কুরাইযায় পৌঁছতে পারিনি, সেহেতু আমরা আসর কাযা না করে এখনই আসরের নামায আদায় করে নিব। তারপর বনু কুরাইযায় পৌঁছব। উভয় দল নিজেদের মাতানুযায়ী আমল করলেন।

فصلت طائفة ايمانا واحتسابا وتركت ايماناواحتسابا.

অর্থ ঃ একদল ঈমান ও সাওয়াবের আশায় নামায পড়ে নিলেন আরেক দল নামায থেকে বিরত থাকলেন ঈমান ও সাওয়াবের আশায়।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাঃ বলেন, বনু কুরাইযার যুদ্ধ শেষে যখন এই ঘটনা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হল, তখন তিনি কোনো দলকেই তিরস্কার করেননি। হাদীসের ভাষ্য এমন-فما عنف واحدا من الفريقينএখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী ‘তোমাদের কেউ যেন বনু কুরাইযায় পৌঁছার আগে আসরের নামায না পড়ে’ সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এই বাণীর দুই অর্থ বুঝলেন। দুই অর্থ বোঝার সুযোগও ছিল।

 

আবার তারা দুইভাবে আমলও করেছেন। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও এক দলের সিদ্ধান্ত সঠিক এবং অপর দলের সিদ্ধান্ত কে ভুল বলেননি। এর দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইচছাও এমনই ছিল যে, শরীয়তের অপ্রকাশিত কিংবা দ্ব্যর্থবোধক ক্ষেত্রে একাধিক মত তৈরি হোক। কেননা, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইচ্ছা যদি এমনটি না-ই হত, তা হলে তিনি অবশ্যই সাহাবায়ে কেরামের দুই দলের কোনো এক দলকে র্ভৎসনা করতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।

 

এ ঘটনাটি ছিল রায় ও ইজতিহাদের মতপার্থক্য। এখানে প্রত্যেক পক্ষ হাদীস থেকে যা বুঝেছেন, সে অনুযায়ী আমল করেছেন। এখানে তাদের মাঝে কোনো বিবাদ হয়নি। এরপরও তাঁরাসম্ভবত এজন্যই আল্লাহ রাসূলকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, তাঁর আদেশের সঠিক অর্থ জানবেন। কিন্তু হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর রাসূল তা বলেননি। শুধু এটুকু করেছেন যে, কোনো পক্ষকেই তিরস্কার করেননি। এ রকম দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ব্যবহারের নজির কুরআন-সুন্নাহয় অসংখ্য। এ কারণেই কুরআনে তালাকপ্রাপ্ত মহিলার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত قروءও তায়াম্মুমের বিধানের ক্ষেত্রে لامستم শব্দের মর্মোদ্ধারে ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম শাফেরী রহঃ এর মাঝে মতানৈক্য হয়েছে। যা সম্পূর্ণ ইজতিহাদ নির্ভর। এখানে একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি। তা হল, শরীয়তের নুসূস এর দুটি দিক রয়েছে। একটি যাহেরী, অপরটি বাতেনী বা অন্তর্নিহিত ও তাত্ত্বিক দিক। এটি যেভাবে কুরআনী নুসূসের ক্ষেত্রেবিদ্যমান,তেমনি হাদীসী নুসূসের মধ্যেও বিদ্যমান। কুরআনী নুসূস সম্পর্কে হাদীসে আছে-

عن ابنمسعود رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلي الله عليه وسلم أنزل القران علي سبعة أحرف لكل اية منها ظهر وبطن ولكل حد مطلع হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, পবিত্র কুরআনকে সাত ‘হরফে’ নাযিল করা হয়েছে। প্রত্যেক আয়াতের মধ্যে রয়েছে একটি বাহ্যিক দিক এবং একটি অভ্যন্তরীণ দিক। আর প্রত্যেক দিকের জন্য রয়েছে এক একটি উপলদ্ধিস্থল। (মেশকাত শরীফ শরহুস সুন্নাহ) বাহ্যিক দিক মানে আক্ষরিক অর্থ আর অভ্যন্তরীণ দিক মানে গুঢ় তত্ত্ব ও গভীর মর্ম। প্রত্যেক দিকের উপলদ্ধিস্থল ভিন্ন ভিন্ন। বাহ্যিক দিকের উপলদ্ধিস্থল হল উলূমে আরাবিয়া তথা নাহব, সরফ, বালাগত ইত্যাদির পারদর্শিতা। আর অভ্যন্তরীণ দিকের উপলব্ধিস্থল হল ‘কুওয়াতে ফাহমিয়্যা’ ও ইজতিহাদের যর্থার্থ যোগ্যতা।

 

বলাবাহুল্য, ইসলামের উৎসস্থল কুরআন ও সুন্নাহ। পবিত্র কুরআনের ছয় হাজার দুই শত ছত্রিশ আয়াতের মধ্যে মাত্র পাঁচ শত আয়াত শরীয়তের হুকুম সম্পর্কিত। আর হাদীসের সুবিশাল ভান্ডারের মধ্যে মাত্র তিন হাজার হাদীস শরীয়তের হুকুম-আহকাম সম্পর্কিত। অথচ মানুষের ব্যবহারিক জীবনে শরীয়তের উদ্ভুত নিত্য নতুন মাসআলা- মাসায়েলের সংখ্যা আজস্র। তাই সহজেই আনুমান করা যায় যে, কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি সব কিছুর সমাধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। বরং এখানে সামান্য কিছু হুকুম-আহকাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর বাকিগুলো প্রচ্ছন্নভাবে আছে, যেগুলোকে কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে উদ্ঘাটন করা হয়। মুসলিম উম্মাহর বড় বড় আলেমগণ

 

যাদেরকে আমরা ইমাম ও মুজতাহিদ বলে থাকি, তাঁরা কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি সমস্ত সমস্যার সমাধান সবিস্তারে সংকলন করেছেন। যারা সাধারণ মুসলমান অর্থাৎ ইসলামী শরীয়তের উৎসমূল কুরআন-সুন্নাহ পড়তে জানে না, পড়তে জানলেও অর্থ জানে না, অর্থ জানলেও মর্ম বোঝে না, মর্ম বুঝলেও কুরআন-সুন্নাহ থেকে গবেষণা করে মাসআলা-মাসায়েল উদ্ঘাটন করার যোগ্যতা রাখে না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ হচ্ছে, ‘তোমরা না জানলে যারা জানে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করে নাও। (সূরা নাহল ৪৩, সূরা আম্বিয়া ০৭) উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা স্পষ্ট হল যে, শরীয়ত পালনের ক্ষেত্রে গৌণ ও অ-প্রাধান বিষয়ে একাধিক পথ সৃষ্টি হওয়া কোনো দোষণীয় বিষয় নয়।

 

বরং এটা উম্মতের জন্য রহমত এবং উম্মতে মুহাম্মাদীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যে কথা খাইরুল কুরূণের একাধিক ইমামের যবানে উচ্চারিত হয়েছে। অতএব, একাধিক মাযহাব সহীহ হওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা এবং যে এলাকায় যে মাযহাব প্রচলিত আছে, সেই এলাকার লোকদের তাদের অনুসৃত মাযহাবপরিপন্থী কোনো পন্থ’ার দিকে আহবান করা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের আমলের পরিপন্থী। এ ক্ষেত্রে র্সবশেষ বক্তব্য হিসাবে ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহঃ এর চমৎকার একটি উক্তি উল্লেখ করে এ আলোচনার ইতি টানছি Ñ

قال إن جميع صفات العبادات من الأقوالوالأفعال إذا كانت مأثورة أثرا يصح التمسك به :لم يكره شئ من ذلك,بل يشرع ذلك كله ،كما قلنا في أنواع الصلاة الخوف ،وفي نوعي الأذان

:الترجيع وتركه،ونوعي الأقامة:شفعها وإفرادها ،وكما قلنا في أنواع التشهدات،وأنواع الاستفتاحات،ةأنواع الاستعاذات،وأنواع القراءات،وأنواع تكبيرات العيد الزوائد،وأنواع صلاة الجنازة،وسجودالسهو،والقنوت قبل الركوع وبعده،والتحميد- أي ربنا لك الحمد- بإثبات الواو وحذفها،وغيرذلك

 

 

আল্লামা ইবনে তাইমিয়াহ রহঃ বলেন, যে সমস্ত ইবাদতের রূপরেখা হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী বা কর্মের মাধ্যমে কোনো হাদীসে বর্ণিত আছে, তা যদি গ্রহণ করা সহীহ হয়, তবে তা থেকে কোনোটাই গ্রহণ করা দোষণীয় নয়, বরং প্রত্যেকটিই (শরীয়তে মুহাম্মাদিয়ার অংশ হওয়ায়) গ্রহণ করা বৈধ। যেমন, যুদ্ধকালীন নামাযের বিভিন্ন পদ্ধতির কথা আমরা বলে থাকি এবং আযানের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে যে, আযানে তারজী’ হবে কি হবে না। ইকামতের পদ্ধতি সম্পর্কে যে, তা জোড়া জোড়া করে বলা হবে, না আলাদা আলাদা করে। তদ্রপ, তাশাহহুদ, ছানা, তাআওউয, কিরাতের বিভিন্ন পদ্ধতি, দুই ঈদেও অতিরিক্ত তাকবীর, জানাযার নামায ও সেজদায়ে সাহুর বিভিন্ন পদ্ধতি, বিতরের নামাযে রুকূর আগে বা পরে দোয়ায়ে কুনূত পড়া ইত্যাদি সম্পর্কে একই কথা। তদ্রপ তাহমীদ (অর্থাৎربنا لك الحمد এواو  থাকা না-থাকা ইত্যাদি বিষয়ে একই কথা। ( আদাবুল ইখতিলাফ ১২৭)

 

وانما ذلك بمنزلة الطريق إلي مكة،فكل أهل ناحيةيحجون من طريقهم،وليس اختارهم لطريقهم لأنها أفضل،بحيث يكون حجهم أفضل من حج غيرهم،بل لأنه لا بد من الطريق يسلكونها،فسلكواهذه،اما ليسرها عليهم إما لغير ذلك،وإن كان الجميع سواء

ইমামগণের মাঝে মতানৈক্যের বিষয় হল, হজের উদ্দেশ্য হাজী সাহেবদের মক্কায় যাওয়ার বিভিন্ন পথের মতো। অর্থাৎ প্রত্যেক এলাকার লোক নিজ নিজ রাস্তা থেকে হজ করতে আসেন। তাদের এই রাস্তা অবলম্বন করা এ জন্য নয় যে, এটি উত্তম, যার কারণে তাদের হজ অন্যদের তুলনায় উত্তম হবে। বরং তারা রাস্তা এ জন্য অবলম্বন করেছেন যে, হজের উদ্দেশ্যে মক্কা যেতে হলে একটি রাস্তা দরকার, যে রাস্তায় তারা যাবেন। সেই হিসাবে তারা এই রাস্তায় চলেছেন। হয়তো তাদের জন্য এ রাস্তা সহজ অথবা অন্য কোনো কারণে; যদিও সব

রাস্তাই সমান। (আদাবুল ইখতিলাফ ১৩০)

আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব
             আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব

ইখাতলাফের স্বীকৃতি সম্পর্কে কয়েকটি উক্তি ঃ

كان إختلاف اصحاب محمد صلي الله عليه وسلم رحمة للناس

১। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ (মৃত্যুঃ ১৩ হিজরী) বলতেন-

আমলের ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবায়ে কেরামের ইখতিলাফ মানুষের জন্য কল্যাণ এবং রহমত। (এটি বর্ণনা করেছেন ইবনে সা’দ ও বায়হাকি। আল খায়রাতুল হাস্সান ২/২২ এর বরাতে)

 

২। হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহঃ (মৃত্যুঃ ১০১ হিজরী) বলেছেন-

مايسرني ان اصحاب رسول الله صلي الله عليه وسلم لم يختلفوا لأنهم اذا اجتمعوا علي قول فخالفهم رجل كان ضالاواذا اختلفوا فأخذرجل بقول هذا ورجل بقول هذاكان في الامرسعة وكذالك قال غير مالك من الأئمةليس للفقيه ان يحمل الناس علي مذهبه

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ইখতিলাফ না হওয়াটা আমার নিকট পছন্দনীয় নয়। কেননা, তারা যদি এক সিদ্ধান্তের উপর একমত হতেন, (তাঁদের মাঝে ইখতিলাফ না হত তা হলে শরীয়ত মানার পথ একটিই মাত্র হত) তা হলে যে এর বিরোধিতা করত, সে পথভ্রষ্ট হয়ে যেত। অথচ সাহাবায়ে কেরাম যেহেতু প্রত্যেকেই অনুসরণীয়, তাই তাদের মধ্যে ইখতিলাফ হওয়ার ফলে এখন যে কারও যে কোনোও সাহাবীর মত অনুযায়ী আমল করার সুযোগ সুষ্টি হয়েছে। অনুরূপ ইমাম মালেক রহঃ সহ অন্যান্য ইমামগণ বলেছেন যে, কোনো ফকীহের সমীচীন নয় যে, তিনি জগতের সকলকেই তার মাযহাব মানতে বাধ্য করবেন। (আদাবুল ইখতিলাফ ৩৯)

 

৩। একবার হযরত ইমাম মালেক রহঃ কে তখনকার মুসলিম জাহানের খলীফা আবু জাফর মানসূর রহঃ (মৃত্যুঃ ১৫৮ হিজরী) বললেন-

قد اردت ان اجعل هذاالعلم علما واحدافا كتب به الي امراءالجناد والي القضاة فيعملون به فمن خالف ضربت عنقه فقلت له يا امير المؤمنين او غير ذلك قلت ان النبي صلي الله عليه وسلم كان في هذه الأمة وكان يبعث السرايا وكان يخرج فلم يفتح من البلاد كثيراحتي قبضه الله عز وجل ثم قام ابو بكر رضي الله عنه بعده فلم يفتح من البلاد كثيرا ثم قام عمررضي الله عنه بعد هما ففتحت البلادعلي يديه فلم يجد بدا من ان يبعث اصحاب محمد صلي الله عليه وسلم معلمين فلم يزل يؤخذعنهم كابرا عن كابرا الي يومهم هذا فان ذهبت تحولهم مما يعرفون الي ما لا يعرفون رأوا ذلك كفرا ولكن اقراهل كل بلدة علي ما فيها من العلم خذ هذاالعلم لنفسك فقال لي ما ابعدت القول اكتب هذا العلم لمحمد يعني ولده المهدي الخليفة من بعده(ادب الإختلاف:صـ٤۰ تقدمة الجرح والتعديل صـ ۲۹)

আমি চাচ্ছি, আপনার সংকলিত ইলম (মুআত্তা মালেক) কে একমাত্র অনুসরণীয় করব এবং সেনাবাহিনী ও বিচারক সবাইকে এ অনুযায়ী আমল করতে বলব। অতঃপর কেউ এর বিরোধিতা করলে তার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হবে। ই

 

মাম মালেক রহঃ বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন ! একটু ভেবেছেন কি ? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের মাঝে ছিলেন। তিনি সৈন্যদল পাঠাতেন। নিজেও বের হতেন। তখনো খুব বেশি অঞ্চল বিজিত হয়নি। এমন অবস্থায় উম্মতের মধ্য থেকে বিদায় নিলেন, যখন মাত্র কয়েকটি এলাকা ইসলামের অধীনে এসেছে। এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এর সময়ও ইসলাম ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়নি। হযরত উমর ফারূক রাঃ (মুত্যুঃ ২৩ হিজরী) এর সময় ইসলাম পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ল। অনেক এলাকা মুসলামনদের করতলগত হল। তখন তিনি বিজিত এলাকায় মুসলমানদের ইসলমী শিক্ষা-দীক্ষার জন্য সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করলেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত সেসব এলাকায় বাংশানুক্রমে সে সকল সাহাবায়ে কেরামের ইলম চর্চা হয়ে আসছে, যাদেরকে ওই এলাকায় মুআল্লিম হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছিল। এখন আপনি যদি সে সকল লোককে এমন কোনো বিষয় মানতে বাধ্য করেন, যা তাদের নিকট সংরক্ষিত ইলমের পরিপন্থী, তা হলে তারা এটাকে কুফরী মনে করবে। অতএব, আপনি দয়া করে প্রত্যেক শহরবাসীকে তাদের নিকট রক্ষিত ইলম অনুযায়ী আমলের উপর ছেড়ে দিন। আর এই কিতাব আপনি নিজের জন্য নিতে পারেন। এ কথা শুনে খলীফা বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। এই কিতাব আপনি আমার ছেলে মুহাম্মদের জন্য লিখে দিন।)  আদাবুল ইখতিলাফ  ৩৬)

বিরোধপূর্ণ ক্ষেত্রে সঠিক কোনটি ?

একটি প্রশ্ন-الصواب في المختلف فيه واحد أم متعددة ؟

অর্থাৎ বিরোধপূর্ণ মাসআলায় সহীহ ও সঠিক একটি না কয়েকটি ?   مطلوب الله في الحادثة واحد أم متعدد ؟এবং একাধিক মতের মধ্য থেকে আল্লাহর উদ্দেশ্য একটি নাকি কয়েকটি ?

উত্তর ঃ জমহুর উলামায়ে কেরামের মতানুসারে বিরোধপূর্ণ ও মতভেদপূর্ণ মাসআলার মধ্যে সহীহ বা সঠিক একটি আর সেটিই আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্য এবং তার মধ্যেই মানুষের কামিয়াবী ও সফলতা :

قال البزدوي في أصوله (جـ۱: صـ۲٧٨ باب معرفة احوال المجتهدين ومنازلهم في الاجتهاد) فالحاصل أن الحق في موضع الخلاف واحد او متعدد فعندنا الحق واحد.

ইমাম বাযদবী রহঃ তাঁর লিখিত উসূলে বাযদবী তে বলেন, মতভেদপূর্ণ মাসআলায় সহীহ ও সঠিক একটি না একাধিক ? আমাদের মতে (আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের নিকট) সহীহ ও সঠিক একটিই।

رأي الغزالي والقاضي والمزني والمعتزلة أن الحق يصح تعدده بتعدد اختلاف المجتهدين في المسائل التي لا نص فيها ولا اجماع،وهي محلات الإجتهاد،والمختار أن الحق واحد،من أصاب،ومن أخطأ أخطأ، وهومأجور أيضا،وهورأي الأئمة الأربعة:أبي حنيفة،ومالك،والشافعي،وأحمد،وأكثر الفقهاء .انتهي.

ইমাম গাযালী (মৃত্যুঃ ৫০৫ হিজরী) সহ কোনো কোনো মনীষীর মত হল, যে সকল মাসআলার ব্যাপারে সরাসরি কোনো নস নেই, আবার ইজমাও সংগঠিত হয়নি, উপরন্তু তা মুজতাহিদীনে কেরামের ভিন্ন ভিন্ন ইজতিহাদের ক্ষেত্র, ওই মাসআলায় মুজতাহিদীনে কেরামের ভিন্ন ভিন্ন ইজতিহাদ ও মতামত সবগুলোই সহীহ ও সঠিক হতে পারে তবে সহিহ ও বিশুদ্ধ মত হলো সহিহ ও সঠিক একটিই সবক’টি নয়। যে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হল, সে সঠিক করল। পক্ষান্তরে যে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, সে ভূল করলেও পুরস্কৃত হবে। এ ব্যাপারে চার ইমাম অর্থাৎ ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ সকলেই একমত।)  আল ফাত্হুর রব্বানী ঃ ২২৬(

 

সঠিক মাসআলাটি উদ্ঘাটন করা প্রত্যেক আহলে তারজীহ (আহলুত্ তারজীহ বলতে সে সকল মুজতাহিদকে বুঝানো হয়, যারা ইমামদের থেকে বর্ণিত বিভিন্ন রেওয়ায়েত কিংবা অভিমতের উপর গবেষণা করে কোনটি অগ্রাধিকারযোগ্য তা নির্ধারণ করেন। হানাফী মাযহাবের এ শেণীর ইমামদের মধ্যে আছেন ইমাম আবুল হাসান আল কূদুরী রহঃ ও হিদায়া গ্রন্থের প্রণেতা।) এর উপর ওয়াজিব। আর সাধারণ মসুলমানদের জন্য তাদের অনুসরণ করা ওয়াজিব। আহলুত তারজীহদের জন্য তারজীহ দেওয়া ব্যতীত আমল করা আর অন্যান্য সাধারণ মানুষের জন্য আহলুত তারজীহদের অনুসরণ ব্যতীত আমল করা হারাম। কেননা, তা হবে হক থেকে বিমুখ হওয়া ও বাতিলের দিকে ধাবিত হওয়ার নামান্তর।

তবে এখানে একটা প্রশ্ন থেকেইে যায় যে, যখন মতভেদপূর্ণ মাসআলায় সহীহ ও সঠিক সবগুলো নয়, বরং যে কোনো একটিই হয়, তা হলে শুরুতেই যে আলোচনা করা হয়েছে যে, চারও মাযহাবই সহীহ ও সঠিক, তার অর্থ কী ?

 

 

এর উত্তর হল, শুরুতে যে আলোচনা করা হয়েছে যে, সমস্ত মাযহাবই সহীহ ও সঠিক, এর অর্থ বা ব্যাখ্যা হল, চারও মাযহাব আমলযোগ্য এবং চার মাযহাবের যে কোনো একটির উপর থেকে শরীয়তের আমল করা সহীহ ও সঠিক। আল্লাহ তাআলার কাছেও তা গ্রহণযোগ্য। কেননা, মুজতাহিদ যখন ইজতিহাদ করে কোনো সিদ্ধান্তে  উপনীত হন, তখন তিনি যদি সঠিক সিদ্ধান্তেপৌঁছতে সক্ষম হন, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষণা অনুযায়ী তিনি লাভ করবেন একটি আজর।

 

عن عمروبن العاص ،عن النبي صلي الله عليه وسلم قال:إذا حكم الحاكم فاجتهد ثم أصاب:فله أجران،وإذاحكم فاجتهد ثم أخطأ فله أجر.

হযরত আমর ইবনুল আস রাঃ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকে বর্ণনা করেন যে, যখন কোনো বিচারক কোনো বিষয়ে ফায়সালা করেন এবং ইজতিহাদ করে সঠিক বিষয়ে উপনীত হন, তখন তার জন্য দুইটি নেকী। আর যদি কোনো কারণে ইজতিহাদ করতে গিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম নাও হন, তবুও তার জন্য একটি নেকী থাকবে। (সহিহ বুখারী ৭৩৫২)

 

وقال الشيخ ابن تيميةرحمه الله تعالي في رسالته التي اشتهر باسم مقدمة في أصول التفسير،وتبطنها تلميذه الحافظ ابن كثير في مقدمة تفسيره قالا : من حكم بين الناس عن جهل فهو في النار وإن وافق حكمه الصواب في نفس الأمر لكن يكون أخف جرما ممن أخطأ.

আল্লামা ইবনে তাইমিয়াহ রহঃএবং তার ছাত্র হাফেজ আল্লমা ইবনে কাসীর রহঃ বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে এমন কোনো বিষয়ের ফায়সালা করে,যে বিষয়ে তার জ্ঞান নেই,তবে সে জাহান্নামে যাবে,যদিও প্রকৃতপক্ষে তার ফায়সালা সঠিক হয়;যদিও বা যেভুল করল তার চেয়ে তার অপরাধ কম।(আছারুল হাদিসিশ শরীফ ৬৩)

রাসূলুল্লাাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-  إن المجتهد اذا اصاب فله اجران واذا اخطأ فله اجر واحد(সহিহ বুখারী )

 

এ হাদীসে সিন্ধান্ত গ্রহণের জন্য ইজতিহাদ তথা নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টা চালানোর মাহাত্ব তুলে ধরা হয়েছে এবং মুজতাহিদের ভুল হলেও একটি পুণ্য লাভের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। একই বিষয়ে যখন দুই ফকীহ আপন আপন জ্ঞান ও মূলনীতির আলোকে গবেষণায় রত হন, তখন উভয়ের যেমন অভিন্ন সিদ্ধান্তে  উপনীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তেমনি এটাও সম্ভব এবং বাস্তব যে, প্রত্যেকে পৃথক পৃথক সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন এবং প্রত্যেকের কাছে আপন আপন সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মনে হবে, যা থেকে সরে আসা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। দ্বিতীয় অবস্থায় যে মতভেদের সৃষ্টি হয়, সেটা কি তাদের অবৈধ তৎপরতা এবং সেজন্য কি তারা তিরস্কারের উপযুক্ত ? হাদীস বলছে, না।

 

সেটা বৈধ তো বটেই, এমনকি তার সিদ্ধান্ত যদি ভুলও হয়, তবুও তিনি একটি সওয়াবের অধিকারী হবেন। সারকথা এই যে, যখন এমন কোনো বিষয় সামনে আসে, যার সমাধান সরাসরি কুরআন-হাদীসে পাওয়া যায় না, তখন তার সহীহ ও সঠিক সমাধান অন্বেষণ করা মুজতাহিদের উপর ওয়াজিব। যদি সকল মুজতাহিদগণ একই সমাধানের উপর ঐক্যমত হন, তবে তো মঙ্গল তার মধ্যেই এবং সেটিই সহীহ ও সঠিক। আর যদি মুজতাহিদগণ মতানৈক্য করেন, তবুও প্রত্যেক মুজতাহিদের আমল তার ইজতিহাদ অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং তিনি তার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে বিনিময়ও পাবেন। বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে ছোট্ট একটি উদাহরণের মাধ্যমে। রাতের অন্ধকারে অথবা ঝড়-তুফানের সময় যখন সূর্য কোন দিকে তা জানার কোনো উপায় থাকে না- এমন সময় একদল লোক জামাতে নামায আদায় করবে। কিন্তু কিবলার দিক নির্ণয়ের কোনো সুযোগ না থাকায় প্রত্যেকেই কিবলার দিক নির্ণয়ের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করল।চিন্তা করে কিবলা নির্ধারণ করা তাদের উপর শরীয়তের হুকুম।

 

ফলে তাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিল। প্রত্যেকেই নিজ চিন্তা ও সিন্ধান্ত অনুযায়ী একেক দিকে ফিরে জামাতের সাথে নামায আদায় করেছে। এ ক্ষেত্রে সবার নামাযই শুদ্ধ হয়ে যাবে। এবং সবার নামাযই অল্লাাহ তাআলার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং তার বিনিময়ে তার প্রতিদানও পাবে। যদিও কারো সিদ্ধান্ত সঠিক এবং কারোটা ভুল। কেননা, একেকজন একেক দিকে ফিরে নামায আদায় করলে সকলের দিকই তো কিবলার দিক হওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং, উপরোল্লিখিত আলোচনার পর সকল মাযহাবের এবং প্রত্যেক মুজতাহিদ ইমামের সিদ্ধান্তই সঠিক হয় কি করে- এ প্রশ্ন অবান্তর।

আশা করছি, আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব । বিষয়টি পড়ে উপকৃত হয়েছেন। কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।

👁️ পড়া হয়েছে: ১৪ বার

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
Twitter
Print
WhatsApp
LinkedIn
Telegram

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পর্কিত পোস্ট

আরাফার দিনের রোজার ফজিলত

আরাফার দিনের রোজার ফজিলত: মুফতি রেজাউল করিম

সূচিপত্র লুকান আরাফার দিনের রোজার ফজিলত: মুফতি রেজাউল করিম আরাফাহ দিবস কী? আরাফার দিনের রোজার ফজিলত: মুফতি রেজাউল করিম আমরা কেন আরাফাহ দিবসে রোজা রাখি?

আরাফার দিনের রোজার ফজিলত

কোরবানির পশুর জবেহ করার সময়ের দোয়া: মুফতি রেজাউল করিম

সূচিপত্র লুকান কোরবানির পশুর জবেহ করার সময়ের দোয়া: মুফতি রেজাউল করিম মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করার সময় বলা যায়: কোরবানি করার আদবসমূহ কোরবানি করার

কুরবানির গোস্ত বন্টনের নিয়ম

কুরবানির গোস্ত বন্টনের নিয়ম: Mufti Rejaul Karim

সূচিপত্র লুকান কুরবানির গোস্ত বন্টনের নিয়ম কুরবানীর গোস্ত তিন ভাগ করে বন্টন করা কী জরুরী? প্রশ্ন: আমার স্বামী বিদেশে আছেন এবং তাঁর মা আমার সাথেই

শাপলা চত্বরের ইতিহাস ও মুফতি রেজাউল করিম একটি রক্তঝরা অধ্যায়ের প্রত্যক্ষদর্শী

শাপলা চত্বরের ইতিহাস ও মুফতি রেজাউল করিম: একটি রক্তঝরা অধ্যায়ের প্রত্যক্ষদর্শী

সূচিপত্র লুকান বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে ৫ই মে ২০১৩ একটি অবিস্মরণীয় এবং একইসাথে বেদনাবিধুর দিন। শাপলা চত্বরের ইতিহাস বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে

Digital Product Selling Website | Mufti Rejaul Karim

মুফতি রেজাউল করিম – প্রফেশনাল ওয়েব ডিজাইনার এবং ডিজিটাল প্রোডাক্ট সেলার

সূচিপত্র লুকান মুফতি রেজাউল করিম – প্রফেশনাল ওয়েব ডিজাইনার এবং ডিজিটাল প্রোডাক্ট সেলার এবার আসুন মুফতি রেজাউল করিম সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই। মুফতি রেজাউল করিম

Digital Product Selling Website | Mufti Rejaul Karim

পুঁজি ও অভিজ্ঞতা ছাড়া ছোট ব্যবসার আইডিয়া এবং সফল হওয়ার ৩টি মূলমন্ত্র

সূচিপত্র লুকান পুঁজি ও অভিজ্ঞতা ছাড়া ছোট ব্যবসার আইডিয়া এবং সফল হওয়ার ৩টি মূলমন্ত্র কেন আপনি শূন্য থেকে শুরু করবেন? পুঁজি ছাড়া ব্যবসার ৩টি মূলমন্ত্র

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব ভালোবাসা  দিবস নিয়ে ইসলাম কি বলে

আমার সাথে কাজ করতে আগ্রহী? চলুন শুরু করা যাক!

50+ ই-কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি।  ৪ বছরের অভিজ্ঞতা। ক্লায়েন্ট সন্তুষ্টির হার 100% এবং পুনরাবৃত্ত গ্রাহকের হার 70 % । আপনার ব্যবসার জন্য সেরা ওয়েবসাইট  পেতে এখনই যোগাযোগ করুন।