নারীর চেহারা সতরের অংশ কি না?
ইদানীং দেখা যাচ্ছে, এই সুপ্রতিষ্ঠিত মাসআলার ক্ষেত্রেও কেউ কেউ গোটা উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সংশয় সৃষ্টি করার বিফল চেষ্টা করছে। তাই এ বিষয়ে কলম ধরলাম। প্রথমে জেনে নেব,
ইসলামে পর্দার বিধান প্রবর্তন করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ
ইসলামের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো এমন পরিছন্ন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।পরিচ্ছন্ন সমাজ গঠন করতে ইসলামের একটি মাধ্যম হল সর্ব প্রকার উত্তেজনা মূলক আচরণ বন্ধ করে দেয়া। নারীর চেহারা সতরের অংশ কি না? এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ রেখে আপনি সূরা নূরের ৩০ নম্বার আয়াত দেখতে পারেন যে, আল্লাহ তায়ালা মুমিন নর নারিদেরকে দৃষ্টি অবনত ও লজ্জাস্থান হেফাজত করার আদেশ করেছেন এবং আল্লাহ এ আদেশকে তাদের আতœশুদ্ধি আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন :
قل للمؤمنين يغضوا من ابصارهم ويحفظوا فروجهم ، ذلك ازكى لكم وقل للمؤمنات يغضضن من ابصارهم ويحفظن فروجهن . سورة النور. ۳۰
অর্থাৎ হে নবী আপনি মুমিন পুরুষদের বলে দিন তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবণত রাখে,এবং যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষা করে, এবং আপনি মুমিন নারীদেরকে বলে দিন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবণত রাখে এবং লজ্জাস্থান কে হিফাজত করে ।
এই আদেশ শুধু আত্বপরিশোধক তা নয় বরং এ আদেশ সমাজকে অশ্লীলতার নাপাক থেকে পবিত্র করবে এবং আতœাকে গোমরা পথভ্রষ্ট হওয়ার পথ থেকে বিরত রাখবে। প্রিয় পাঠক ! একটু গভীর ভাবে চিন্তা করে দেখুন মহান আল্লাহ কত নিখুঁত ভাবে আয়াতের এ অংশে ذلك ازكى لكم(এটা তোমাদের জন্য পবিত্রতা স্বরুপ (সুক্ষ একটি ফায়দার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, এর দ্বারা মুমিন নর নারীর অন্তর পবিত্র থাকবে এবং মুসলিম সমাজ অশ্লীলতা বেহায়াপনার সয়লাব থেকে পুতঃপবিত্র থাকবে। আপনি এ বিষয়টি সূরা বারাআতের ৩২ ও ৫৩ নম্বর আয়াতে আরো সুস্পষ্ট আকারে দেখতে পাবেন।
واذا سألتموهن متاعا فسئلوهن من وراء حجاب ذلكم اطهر لقلوبكم وقلوبهن. سورة احزاب۵۳
* فلا تخضعن بالقول فيطمع الذى فى قلبه مرض .سورة الاحزاب۳۲
অর্থ ঃ তোমরা তার পতিœগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। (আহযাব ৫৩)
*যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর,তবে পর পুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না,ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে,যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে।
প্রথম আয়াতে এটা দৃঢ়তার সাথে বর্ণিত হয়েছে যে , পর্দার বিধান অন্তরের পবিত্রতার জন্য। দ্বিতীয় আয়াতে নারীদের আওয়াজের কোমলতা অসুস্থ মনাদের কারনে ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার আশংকা থাকে বিধায় নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং বুঝা গেল পর্দার বিধানমানব সমাজের কল্যাণের নিমিত্তে করা হয়েছে। সর্বোপরি পর্দার বিধান নারীদের মর্যাদা , ইজ্জত সম্মান সম্ভ্রমকে রক্ষা করার বিধান ।
আরও পড়ুনঃ আহলে হাদিস কাকে বলে ও আহলে হাদিস কারা
নারীদের পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষা করতে এবং অসৎ দুশ্চরিত্র লোকদের লালসা থেকে হেফাজত করার জন্য ইসলাম নারীদেরকে পুরুষের তুলনায় অতিরিক্ত পর্দা করার হুকুম দিয়েছে । যেমন আল্লাহ বলেন ঃ-يا ايهاالنبي قل لازواجك وبناتك ونساء المؤمنين يدنين عليهن من جلبيبهن
অর্থ ঃ- হে নবী ! আপনি আপনার পতœীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন,তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়।
আল্লামা মুফতি মোঃ শফী (রহঃ) তার কিতাব(تفصيل الخطاب فى تفسير ايات الحجاب)এ কুরআন সুন্নায় শরয়ী হিজাবের নির্দেশনা বর্ণনা করেছেন । তিনি বলেন ঃ-
হিজাবের প্রথম স্তর- নিজ বাড়ির আঙ্গিনার ভেতর কিংবা যে কোন স্থানে নারীরা এমন ভাবে অবস্থান করবে যে তার ব্যক্তি সত্তা পোশাক-আশাকএবং তার বাহ্যিক – গোপন সৌন্দর্যের কোন অংশই এবং তার দেহের কোন অংশ এমন কি তার চেহারা , হাত ইত্যাদি কোন কিছুই অপরিচিত পুরুষের দৃষ্টিগোচর না হয়।
নারীদের হিজাবের ক্ষেত্রে মুখ্য ও মৌলিক স্তর হল এটি। এর স্বপক্ষে দলীল হিসাবে কোরআনের এই আয়াত টি পেশ করা হয়ে থাকে وقرن فى بيوتكن তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে(সূরা আহযাব আয়াত – ৩৩) এ নির্দেশ মহা নবী (সাঃ) এর জীবন সঙ্গীদের ক্ষেত্রেই কেবল মাত্র প্রযোজ্য নয়। কেননা এই আয়াতের পূর্বাপর বুঝা যায় যে, আযওয়াজে মুতাহ্হারাত এর ক্ষেত্রে এ বিধানটি সিমাবদ্ধ নয়। এবিষয়ে উম্মতের ঐক্যমত রয়েছে । এ ক্ষেত্রে কেউ দ্বিমত পোষন করেনি।
অন্যত্রে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেনواذا سألتموهن متاعا فسئلوهن من وراء حجاب
অর্থ ঃ- তেমাদের যদি নবী পতœীদের কাছ থেকে কোন জিনিষ পত্র চাওয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে পর্দার আড়াল থেকে চেয়ে নেবে ।
সরাসরি দেখা না করে পর্দার আড়াল থেকে কোন কিছু চেয়ে নেয়ার আদেশ দেয়ার দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে,ইসলামে পর্দার বিধান দ¦ারা এপ্রকার পর্দাই উদ্দেশ্য।
আমাদের আলোচনার এ পর্যায়ে এসে ইসলামে পর্দার বিধান প্রবর্তন করার লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং কোন প্রকারের পর্দা পালন করা ইসলামে কাম্য তা স্পষ্ট হয়েগেল ।
প্রিয় পাঠক যদি আপনি এ বিষয়টি হ্নদয়াঙ্গম করতে সক্ষম হন তাহলে এ বিষয়টি আপনার পক্ষে অনুধাবন করা অতি সহজ হবে যে,যেউদ্দেশ্যে ইসলাম পর্দা বিধান প্রবর্তণ করেছে পর্দা পালন করার পরও যদি সে উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় তাহলে সে বিধান পালন করে লাভ কি হলো ? উদাহরণ স্বরুপ আপনি চোরের ভয়ে আপনার মূল্যবান সম্পদ সিন্দুকে তালা বদ্ধ করলেন কিন্তু সিন্দুকের একটি নকল চাবি চোরের হাতে তুলে দিলেন , তাহলে আপনার এ সম্পদ সংরক্ষণ আপনার কি উপকারে আসবে ? ঠিক তদ্রপ ইসলাম পর্দার বিধান প্রবর্তন করেছে নারীদের সম্ভ্রম হিফাজত ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য। এখন পর্দা করার পরও যদি মুখ ও হাত খোলা রাখার দ্বারা ইসলামের সেই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত না হয় তাহলে এ ধরণের পর্দা পালন করে লাভ কি ? এটাকি কি চোরের ভয়ে জানালা বন্ধকরে দরজা খোলা রাখার নামান্তর নয় কি ?

কোরআন হাদিসের আলোকে চেহারার উপর পর্দা করা ফরজ হওয়ার প্রমানঃ
১। ولايبدين زينتهنনারীরা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না (সূরা নুর ৩১)
এআয়াতে সৌন্দর্য প্রকাশ করাকে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। সৌন্দর্য হলো দুই প্রকার (১) সৃষ্টিগত সৌন্দর্য (২) কৃত্রিম সৌন্দর্য, আর চেহারা শুধু সৃষ্টিগত সৌন্দর্য নয় বরং তা সৌন্দর্যের মূল এবং ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ । আর অত্র আয়াতটি কৃত্রিম অকৃত্রিম সব ধরণের সৌন্দর্য ব্যপক ভাবে প্রকাশ করতে নিষেধ করেছে। এবং তার উপর অঙ্গের যে কোন অংশএবংতার যে কোন প্রকারের সৌন্দর্য পুরুষদের সম্মুখে প্রকাশ করাকে হারাম সাব্যস্ত করেছে।
২ । ولا يضربن بارجلهن ليعلم ما يخفين من زينتهن নারীরা যেন তাদের পা মাটিতে মেরে না চলে যাতে করে তাদের গোপন সৌন্দর্য সম্পর্কেও অবগত না হয়। (সূরা নুর ৩১)
যখন পায়ের অলংকারের আওয়াজ গায়রে মাহরামের সামনে প্রকাশ হারাম করা হচ্ছে তাহলে চেহারা প্রকাশ করাতো স্বাভাবিক ভাবেই হারাম হবে। কারন পায়ের আওয়াজের তুলনায় চেহারা প্রকাশ করার মাঝে ফেৎনার আশঙ্কা শতভাগ বেশি ।
৩ ।والقواعدمن النساء التى لا يرجون نكاحا فليس عليهن جناح انيضعن ثيابهن غير متبرجات بزينة وأن يستعففن خيرلهن والله سميع عليم سورة النور٦۰
অর্থ ঃ বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখেনা,যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের বস্ত্র খোলে রাখে তাদের জন্য দোষ নেই,তবে এথেকে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা,সর্বজ্ঞ। (সূরা নুর ৬০)
প্রকাশ থাকে যে , এ আয়াতে বয়স্ক নারীদের কাপড়ের যে অংশ খোলার কথা বলা হয়েছে এর দ্বারা শরীর আবৃত কোন কাপড় উদ্দেশ্য নয়। কেননা একেবারে বিবস্ত্র হওয়া বৃদ্ধা নারীদের জন্য জায়েজ নেই। সুতরাং আয়াতে কাপড় উম্মুক্ত করার উদ্দেশ্য হল বোরকা বা চাদর উন্মোক্ত করা। আয়াতের উদ্দেশ্য যে সকল নারী এত বৃদ্ধা হয় যে তাদের প্রতি কোনো আকর্ষণ থাকে না তারা সৌন্দর্যের মূল কেন্দ্র চেহারা উন্মেক্ত করে মাহরামের সামনে আসতে পারবে তবে তার জন্য চেহারা অবমুক্ত না করাই উত্তম আকর্ষণহীন বৃদ্ধা নরীদের ব্যাপারে যদি এ হুকুম হয় তাহলে যুবতীদরে ব্যাপারে আপনার ধারনা কী ?
৪। فلا تخضعن بالقول فيطمع الذى فى قلبه مرض
যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর,তবে পর পুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না,ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে,যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে। (সূরা আহযাব ৩২)
এ আয়াতটি রাসুল (সাঃ) এর সম্মানিতা স্ত্রীদের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে।
প্রিয় পাঠক ! একটু ভেবে দেখুন রাসুলের স্ত্রীদেরকে কোমল আওয়াজে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে যাদের পবিত্রতা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষনা করেছেন।
انما يريد الله ليذهب عنكم الرجس اهل البيت ويطهركم تطهيرا
অর্থ ঃ হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের পরিপূর্ণরুপে পূত পবিত্র রাখতে। (সূরা আহযাব ৩৩)
যারা হলেন মুসলিম জাতির মা এবং রাসূলের স্ত্রী গনকে বিবাহ করা চিরস্থায়ী হারাম আর স্থায়ী হারামের উপর স্বভাব জাত আকর্ষণ না হওয়াই স্বাভাবিক অপর দিকে যাদের সাথে কোমল স্বরে কথা বলতে নিষেধ করা হচ্ছে তারা কারা? তারা হলেন শ্রেষ্ঠ উম্মত সাহাবাকেরাম যাদের পবিত্রতার ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহ নেই।যার মাথায় সামান্য পরিমান মগজ আছে তার কাছে এবিধানটি অত্যন্ত সুষ্পট হবে যে , যখন এত কিছুর পর ও প্রয়োজন মাফিক কথা বার্তার ব্যাপারে সন্দেহের আশঙ্কায় নারীদের স্বভাবজাত কোমল স্বরকে নিষেধ করা হচ্ছে তাহলে সৌন্দর্যের মূল কেন্দ্র চেহারা প্রকাশ ইসলাম কিভাবে অনুমোদন দিতে পারে।
৫। وقرن فى بيوتكن(তোমরা তোমাদের গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে)যদি বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি না থাকে তাহলে গায়রে মাহরামের সামনে চেহারা খোলা কিভাবে জায়েজ হবে। (সূরা আহযাব ৩৩)
৬। واذا سألتموهن متاعا فسئلوهن من وراء حجابতেমাদের যদি নবী পতœীদের কাছ থেকে কোন জিনিষ পত্র চাওয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে পর্দার আড়াল থেকে চেয়ে নেবে।(সূরা আহযাব ৫৩)
আয়াতে স্পষ্ট ভাবে নারীদের প্রতি দৃষ্টিপাত না জায়েজ বলা হয়েছে। নারীদের থেকে যে কোন প্রকারের জিনিষ তলব করার ব্যাপারে পর্দার আড়ালকে আবশ্যক করা হয়েছে সুতরাং যদি চেহারা প্রকাশ করার অনুমতি ইসলামে থাকত তাহলে পর্দার আড়ালে কেন সম্মুখেই কোনো কিছু চাওয়ার অনুমতি থাকত।
৭। عن عائشة رضـ قالت اومت امرأة من وراء الستر بيدها كتاب الى رسول الله صلى الله عليه وسلم
.رواه ابوه داود . رقم الحديث : ٤١٦٦
অর্থ ঃ- আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক নারী পর্দার আড়াল থেকে হাতের ইশারায় একটি পত্র রাসুলের দরবারে প্রেরন করেন। (আবু দাঊদ ৪১৬৬)
এ হাদিস দ্বারা এটা স্পষ্ট হয় যে,নারী সাহাবীরা এমন পর্দা করতেন যে প্রয়োজন ছাড়া চেহারার নেকাব দিয়েও তার সামনে আসতেন না বরং পর্দার আড়ালে থেকে কথা বলতেন। অথচ রাসুল (সাঃ) এর তাকওয়া মহান ছিল এবং তিনি (সাঃ) তো এ উম্মতের পিতার মর্যাদায় রয়েছেন তারপর ও নারী সাহাবীরা তার সম্মুখে নিকাব মুক্ত অবস্থায় আসতেন না।
৮। عن انس رضـ فى قصة تزوج زينب رضـ من الحديث الطويل قال فرجعت فاذا هم قد قاموا فضرب بيني وبينه الستر وانزل اية الحجاب رواه مسلم.رقم الحديث : ١٤٢٨
অর্থ ঃ- হযরত আনাস (রাঃ) থেকে এর বিবাহ সংক্রান্ত একটি দীর্ঘ হাদিছে বর্ণিত রয়েছে যে,হযরত আনাস (রাঃ) বলেন আমি ফিরে আসলাম আমাকে দেখে তারা অভ্যন্তরে চলে
গেলেন এবং আমার ও তার মাঝে পর্দা ঝুলিয়ে দেয়া হল । (মুসলিম শরিফ ১৪২৮)
এ হাদিস দ্বারা প্রমানিত হয় যে, প্রয়োজন ছাড়া হিজাব পরে ও গায়রে মাহরামের সামনে আসা যাবে না অন্যথায় পর্দা ঝুলানোর কী উদ্দেশ্য হতে পারে।
৯। وكان صفوان بن المعطل السلمي ثم الذكوانى من وراء الجيش فاصبح عند منزلى فرئ سواد انسان نائم فعرفنى حين راني وكان رأني قبل الحجاب فاستيقظت باسترجاعه حين عرفني فخمرت وجهي بجلباب ووالله ما تكلمنا بكلمة ولا سمعت منه كلمة غير استرجاعه .رواه البخارى .رقم الحديث : ٢٦٦١
অর্থঃ-হয়রত আয়েশা (রাঃইফকের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল আমাকে দেখেই চিনে ফেল্লেন কেননা তিনি আমাকে পর্দা করার পুর্বে দেখেছিলেন আমি তার আওয়াজ শুনে জাগ্রত হলাম এবং উড়না দিয়ে আমার মুখ ঢেকে নিলাম।(বুখারি ২৬৬১)
লক্ষ করুন আয়শা (রাঃ) এ বিপদঘন অবস্থাতে ও মুখ চাদর দিয়ে ঢেকে নিলেন তাহলে বুঝা গেল চেহারাকে তিনি পর্দার অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন।
১০।قالت إمرأة يا رسول الله احدانا ليس لها جلباب قال تلبسها صاحبتها من جلبابها ،رواه البخارى.
رقم الحديث : ٣٥١
অর্থঃ হযরত হাফছ বিনতে সাবীন (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন হে আল্লাহর রাসুল যদি আমাদের মধ্য থেকে কারো সাথে ওড়না না থাকার কারনে সে যদি ঈদগাহে না যায় এতে কি তার গোনাহ হবে ? জবাবে মহানবী (সাঃ) বললেন তাকে তার বান্ধবী নিজের ওড়না পরিয়ে দেবে। (বুখারি ৩৫১)
১১। عن ام عطيىة رضـ قالت امرنا ان نخرج الحيض يوم العيدين وذوات الخدور، رواه البخارى
رقم الحديث : ٣٥١
অর্থঃ উম্মে আতিয়া বলেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের কে দুই ঈদের দিন ঋতুবর্তী নারী গন্ডদেশ প্রদর্শন কারিনীদের বের করে দিতে বলেছেন। ( বুখারী ৩৫১)
১২। عن قيس بن شماس رضـ قال جائت إمرأة إلى النبي صلى الله عليه وسلم يقال لها أم خلاد وهى متنقبة ،رواه ابوداود .رقم الحديث : ٢٤٨٨
কায়েছ ইবনে শাম্মাছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন এক নারী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দরবারে আসলেন যার নাম ছিল উম্মে খাল্লাদ। তিনি ছিলেন নিকাব পরিহিতা।(আবু দাউদ২৪৮৮)
১৩। عن ابي موسى رضـ قال قال النبي صلى الله عليه وسلم ايما إمرأة استعطرت فمرت علي قوم ليجدوا ريحها فهى زانية وكل عين زانية ، ابن حبان رقم الحديث ١٦٨١ والحاكم رقم الحديث ٣٤٩٧
অর্থঃ আবু মুসা(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন নবী (সাঃ) বলেছেন যে নারী খুশবু ব্যবহার করে কোনো সম্প্রদায়ের লোকদের সামনে দিয়ে অতিক্রম করল যাতে তারা তার ঘ্রান পেয়ে যায় তাহলে সে নারী ব্যাভিচারী সাব্যস্ত হল। (ইবনে হিব্বান ১৬৮১,হাকেম ৩৪৯৭)
আতর দ্বারা সৌন্দর্য প্রকাশের ব্যাপারে যদি এ হুকুম হয় তাহলে চেহারার আকর্ষণ তো আতরের আকর্ষণ থেকে আরো বেশী বিপদজনক।
১৪। عن ام سلمة رضـ قالت لرسول الله صلى الله عليه وسلم حين ذكر الإزار فالمرأة يا رسول الله قال ترخى شبرا فقالت اذا تنكشف اقدامهن قال فيرخين ذراعا ،رواه ابو داود .رقم الحديث ٤١١٧
অর্থঃ রাসুলল্লাহ (সাঃ) যখন লুঙ্গির ব্যাপারে আলোচনা করতে ছিলেন (লুঙ্গি টাখনুর নিচে
ঝুলিয়ে পরার ভয়াবহতা আলোচনা করছিলেন) তখন উম্মে সালমা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাঃ) তাহলে নারীরা কি করবে? তারা ওকি কাপড় টাখনুর উপরে পরবে? রাসুল (সাঃ) বল্লেন তারা এক বিঘত পরিমাণ কাপড় ছেড়ে দেবে তিনি বল্লেন তাহলে তো তাদের পা প্রকাশিত হয়ে যাবে , রাসুল (সাঃ) বল্লেন – তাহলে তারা
এক হাত পারিমাণ ছেড়ে দিবে । ( আবুদাউদ ৪১১৭)
যদি নারীদের পা প্রকাশ করা জায়েজ না হয় তাহলে চেহারা পর্দা করার হুকুম কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এবং চেহারা খোলা রাখা কিভাবে জায়েজ হতে পারে।
১৫। عن عبد الله بن عمر رضـ قال قال النبي صلى الله عليه وسلمولا تنقب المرأة المحرمة ولا تلبس القفازين، رواه البخاري. رقم الحديث ١٨٣٨
অর্থঃ আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর(রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুল (সাঃ) বলেছেন ইহরাম অবস্থায় নারীরা নিকাব পরিধান করবে না এবং হাত মোজা ও পরবে না। (বুখারি ১৮৩৮)
এ হাদিছ দ্বারা প্রমানিত হল যে, হুজুর (সাঃ) এর জামানায় নারীরা সাধারণ অবস্থায় চেহারার উপর নেকাব দিয়ে ঢেকে রাখতেন একারনেই ইহরাম অবস্থায় চেহারা না ঢাকার আদেশ করেছেন। যার কারনে তারা অন্য চাদর দিয়ে গায়রে মাহরামদের থেকে মুখ ঢেকে রাখতেন।

১৬। হযরত কায়েস ইবনে শাম্মাছ (রাঃ) বর্ণনা করেন উম্মে খাল্লাদ নামক এক মহিলা রাসুলে কারীম (সাঃ) এর দরবারে নেকাব দ্বারা আবৃত চেহারা নিয়ে উপস্থিত হন। এসেই তিনি তার নিহত সন্তান সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) এর কাছে প্রশ্ন করতে থাকেন । রাসুল (সাঃ) এর দরবারে উপস্থিত সাহাবীদের থেকে একজন ঐ মহিলার উদ্দেশ্যে বল্লেন তুমি তোমার নিহত সন্তান সম্পর্কে জানতে এসেছ অথচ তুমি তোমার নিজের চেহারা নেকাব দ্বরা আবৃত করে রেখেছ। জবাবে মহিলা বল্লেন যদিও আমার সন্তানের উপর বিপদ নেমে এসেছে তথাপি আমার লজ্জায় তো আর বিপদ নেমে আসেনি। (আবু দাঊদ ২৪৮৮)
১৭। হয়রত উম্মে সালমা (রাঃ) বর্ণনা করেন যখন কুরআনে কারীমের এই আয়াত يدنين عليهن من جلابيبهن الخ (নারীরা ওড়না দ্বারা নিজেদের আবৃত করে নেবে।) আয়াতটি নাযিল হল তখন আনসারী নারীরা নিজেদের ঘর থেকে এমন ভাবে বের হতে থাকলেন যে নড়চড় বিহীন হওয়ার কারনে মনে হত যেন তাদের মাথায় পাখি আশ্রয় নিয়েছে আর তারা মাথায় কালো কাপড় জড়িয়ে বের হতেন। (আবু দাঊদ ৪১০১)
১৮।হয়রত আয়শা (রাঃ) বনর্ণা করেন রাসুলে কারীম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন আল্লাহ তাআলা আনসারী মহিলাদের প্রতি রহম করুন। যখন কুরআনে কারীমে يا ايها النبي قل لأزواجك وبناتك الخ এই আয়াতটি নাযিল হল তখন তারা তাদের চাদর ফেড়ে ওড়না বানিয়ে নেন অত:পর তারা মহানবী (সাঃ) এর পিছনে এমন অবস্থায় নামায আদায় করত যেন তাদের মাথার উপর কাক বসে আছে।(রুহুল মা আনী খঃ২২ পৃঃ৮৯)
১৯ । عن عائشة رضـ قالت كان الركبان يمرون ونحن محرمات مع رسول الله صلى الله عليه وسلم فإذا جاؤونا سدلت احدانا جلبابها على وجهها من رأسها ، فإذا جاوزنا كشفناه رواه ابوداود
رقم الحديث١٨٣٣
অর্থঃ হযরত আয়শা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে আমরা রাসূলে কারীম (সাঃ) এর সঙ্গে ইহরামরত অবস্থায় ছিলাম। এসময় আমাদের পাশ দিয়েই মানুষের আরোহন গুলো চলাচল করছিল। যখন আরোহন গুলো আমাদের কাছাকাছি চলে আসত তখন আমরা আমাদের চাদর গুলো চেহারার উপর টেনে দিতাম । আবার যখন আরোহন গুলো আমাদের থেকে দূরে চলে যেত তখন আমরা আমাদের চেহারা থেকে চাদর সরিয়ে নিতাম। (আবু দাউদ ১৮৩৩)
উল্লেখিত হদীস সমূহের দ্বারা এই বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট হয়ে গেল যে নারী সাহাবীগণ হিজাবের নির্দেশ নাযিল হওয়ার পর চাদর দ্বারা নিজেদের ঢেকে নেয়া অপরিহার্য় মনে করতেন এবং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় চাদর দ্বারা নিজেদের চেহারা ঢেকে বের হতেন। আর সর্বশেষ হাদীসটি তো ওই কথারই ইঙ্গিত বহণ করে যে, হিজাবের প্রতি সদা সজাগ থাকা নারীদের জন্য অপরিহার্য বটে এমনকি ইহরামরত আবস্থায় যখন শরঈভাবে চেহারায় কাপড় স্পর্শ করা নিষিদ্ধ তখনো তারা চেহারার পর্দার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।
পরিশেষে সত্য সন্ধানিদের প্রতি বিশেষ আবেদন থাকবে,
নারীর চেহারা সতরের অংশ কি না?
এ বিষয়ে আসুন আমরা বক্রতা, এক ঘেয়েমির পথ ছেড়ে সরল সঠিক সুন্নাহর পথ অনুসরণ করি এবং ইসলামের পবিত্র ও আদর্শিক চিন্তা ধারা কে সামনে রেখে এবিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করি। আমরা যদি কুরআন সুন্নাহর এতগুলো সুস্পষ্ট দলিল থাকা সত্ত্বে ও সুদৃঢ় কোন দলিল প্রমাণ ছাড়া তার বিরোধিতা করি নিছক নিজ পবৃত্তির বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য; তাহলে তো আমরা পথভ্রষ্টদের অনতর্ভূক্ত হয়ে যাব।
তাই আসুন,আমরা সত্য গ্রহণের জন্য নিজ চিত্তকে উদার করি এবং ইসলামের বিধানাবলিকে উদার চিত্তে গ্রহণ করি। তবেই হিদায়াতের মালিক আমাদের সিরাতে মুস্তাক্বিম প্রদর্শন করবেন।





