বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে ৫ই মে ২০১৩ একটি অবিস্মরণীয় এবং একইসাথে বেদনাবিধুর দিন। শাপলা চত্বরের ইতিহাস বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাখো তৌহিদী জনতার ঈমানী জোয়ার এবং পরবর্তী সেই বিভীষিকাময় রাতের দুঃসহ স্মৃতি। এই ঘটনা কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এদেশের আলেম সমাজ ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত।
সেই ঐতিহাসিক ক্ষণে পোস্তগোলা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত জনসমুদ্রে আমিও ছিলাম একজন সাধারণ অংশগ্রহণকারী। আমি মুফতি রেজাউল করিম, আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব সেই দিনের ধাপে ধাপে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনাপ্রবাহ। যে পথে ছিল ভয়ংকর অনিশ্চয়তা, বারবার পথ হারানো, ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা আর এক অলৌকিক উপায়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার গল্প। শাপলা চত্বরের সেই রক্তভেজা ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।
শাপলা চত্বরের ইতিহাস ও মুফতি রেজাউল করিম: একটি রক্তঝরা অধ্যায়ের প্রত্যক্ষদর্শী
প্রস্তুতির দিনগুলো ও বন্ধুত্বের সকাল
৫ই মে’র সেই ঐতিহাসিক দিনটি আমার জীবনে হঠাৎ করে আসা কোনো মুহূর্ত ছিল না। এর জন্য মানসিক এবং শারীরিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেছিলাম প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই। দীর্ঘ সময় পায়ে হাঁটা, রোদে থাকা এবং ধৈর্য ধরার মতো কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে—এটা জেনেই আমি নিয়মিত শারীরিক কসরত ও মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার ভেতরে তখন এক ধরণের শান্ত অথচ দৃঢ় সংকল্প কাজ করছিল।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি এলো। ৫ই মে, ফজরের নামাজ শেষ করেই আমি পোস্তগোলা ব্রিজের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমাদের মূল অবস্থান বা স্পট ছিল এই ব্রিজটিই। সকালের নির্মল বাতাসে যখন পোস্তগোলা ব্রিজে পৌঁছালাম, তখন চারদিকের পরিবেশ ছিল বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ কিন্তু ইতিবাচক।
সেখানে দুপুর পর্যন্ত অবস্থানকালে আমি এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম। সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সাধারণ মানুষের এক ধরণের দূরত্ব থাকে, কিন্তু সেদিন সেখানে ডিউটিরত সেনাবাহিনী এবং পুলিশের সদস্যদের সাথে আমাদের আচরণ ছিল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ। আমরা একে অপরের সাথে খুব সুন্দরভাবে কথা বলছিলাম, যেন কোনো বৈরিতা নেই। তাদের আচরণে এক ধরণের পেশাদারিত্বের পাশাপাশি মমতাও ছিল। আমরা একে অপরের সাথে হাসিমুখে কথা বলছিলাম, যা পরিবেশকে অনেকটা বন্ধুসুলভ করে তুলেছিল। দুপুরের তপ্ত রোদ মাথার ওপর ওঠার আগ পর্যন্ত পোস্তগোলা ব্রিজের সেই সময়টুকু ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর শৃঙ্খলার এক অনন্য উদাহরণ।
অচেনা পথ আর শাপলা চত্বরের অভিমুখে যাত্রা
দুপুর গড়াতেই চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। খবর এল—আমাদের এখন শাপলা চত্বরের দিকে এগোতে হবে। কিন্তু আমার জন্য পরিস্থিতি ছিল কিছুটা জটিল। আমি তখন ঢাকায় একদম নতুন; এই শহরের অলিগলি, রাস্তাঘাট কিছুই আমার চেনা ছিল না। বিশাল এই জনসমুদ্রে পথ হারানো ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
নিজের নিরাপত্তা আর পথের দিশা পেতে আমি আমার সাথে থাকা দুইজন সহপাঠীর হাত শক্ত করে ধরলাম। আমি তাদের স্পষ্ট করে বলেছিলাম, “ভাই, আমি এই শহর চিনি না, দয়া করে আমাকে আপনাদের সাথে রাখবেন, আমাকে হারিয়ে যেতে দেবেন না।” তারা আমাকে আশ্বস্ত করল এবং আমরা একসাথে শাপলা চত্বরের দিকে যাত্রা শুরু করলাম।
পোস্তগোলা থেকে মতিঝিল অভিমুখে সেই যাত্রা ছিল প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জিং। চারদিকে মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার, আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করা শ্লোগান আর তার মাঝে আমার অচেনা এই শহর। ভিড়ের চাপে আর উত্তেজনায় যাত্রাপথে আমি অন্তত তিন-চারবার আমার সহপাঠীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। এক মুহূর্তের অসতর্কতায় যখন দেখছিলাম পরিচিত মুখগুলো আশেপাশে নেই, তখন বুকের ভেতরটা অজানা এক আতঙ্কে কেঁপে উঠছিল।
ঢাকায় নতুন হওয়ার কারণে প্রতিটি মোড়ই আমার কাছে একই রকম মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্রতিবারই আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ভিড় ঠেলে, অনেক খোঁজাখুঁজির পর আবার তাদের দেখা পাচ্ছিলাম। এভাবেই ভয় আর অনিশ্চয়তা সঙ্গী করে, বারবার হারিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত আমরা শাপলা চত্বরের সেই মূল সীমানার দিকে এগিয়ে চলছিলাম।
গুজবের দাবানল আর শাপলা চত্বরে প্রবেশ
আমরা যখন শাপলা চত্বরের দিকে এগোচ্ছিলাম, তখন চারদিকের বাতাস ভারি হয়ে উঠছিল একের পর এক দুঃসংবাদে। সবার হাতে থাকা মোবাইল ফোন আর লোকমুখে খবর আসছিল যে, ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাইতুল মোকাররম, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুরসহ বেশ কিছু স্পটে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ চড়াও হয়েছে—এমন খবর আমাদের কানে আসছিল বারবার। কোথাও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, কোথাওবা টিয়ারশেল নিক্ষেপের খবর আমাদের মনে শঙ্কা জাগিয়ে দিচ্ছিল।
ঢাকার অচেনা অলিগলি আর জনসমুদ্র পেরিয়ে আমাদের যাত্রা থামেনি। মনের ভেতর ভয় থাকলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর জেদ ছিল প্রবল। বারবার পথ হারানো আর সঙ্গীদের খুঁজে পাওয়ার সেই লড়াই শেষে অবশেষে আমরা মতিঝিলের মূল কেন্দ্রে পৌঁছাতে সক্ষম হলাম।
ঠিক আসরের নামাজের পূর্ব মুহূর্তে আমরা শাপলা চত্বরের সেই ঐতিহাসিক চত্বরে পা রাখলাম। তখন চারদিকে শুধু মাথা আর মাথা। বিকেলের ম্লান আলোয় মতিঝিলের গগনচুম্বী ভবনগুলোর ছায়ায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এক বিশাল জনসমুদ্রে এসে মিশেছি। উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা শহরটির হৃদপিণ্ডে তখন আমরা হাজার হাজার মানুষ একসাথে শ্বাস নিচ্ছিলাম, অথচ জানতাম না সামনের রাতটি আমাদের জন্য কী ভয়াবহ বার্তা বয়ে আনছে।
জনসমুদ্রে একাকীত্ব এবং ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা
শাপলা চত্বরের সেই বিশাল জনসমুদ্রে পা রাখার পরপরই আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। যে দুই সহপাঠীর হাত ধরে এতদূর এলাম, ভিড়ের প্রচণ্ড চাপে কখন যে তারা আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ডানে-বামে, সামনে-পেছনে যেখানেই তাকাচ্ছি—সবাই অপরিচিত। হাজার হাজার মানুষের মাঝে আমি তখন সম্পূর্ণ একা। ঢাকার এই অচেনা গণ্ডিতে আমি এখন কার কাছে যাব, কোথায় দাঁড়াব, তা ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না।
একদিকে একাকীত্বের ভয়, অন্যদিকে পেটে ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা আমাকে বিপর্যস্ত করে তুলছিল। সকাল থেকে পেটে দানা-পানি পড়েনি বললেই চলে। ক্ষুধার তাড়নায় শরীর যেন ভেঙে আসছিল। অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটি কলা কিনলাম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সেই সময় একটি কলার দাম নিয়েছিল ১৬ টাকা। কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়ছিল না—কলাটি ছিল একদম কাঁচা। তবুও ক্ষুধার কাছে হার মেনে সেই কাঁচা কলাটিই চিবিয়ে খেয়ে পেটের আগুন শান্ত করার চেষ্টা করলাম।
বিপদে যেন একা আসে না। আমার সাথে থাকা মোবাইল ফোনটিও তখন মৃত; চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় কারোর সাথে যোগাযোগ করার কোনো উপায় রইল না। আমার পুরো অস্তিত্ব তখন নিছক একটি কাষ্ঠখণ্ডের ওপর ভর করে ছিল—একটি লাঠি। এটি পোস্তগোলায় থাকাকালীন এক ভাইয়ের কাছ থেকে স্মৃতি হিসেবে বা আত্মরক্ষার তাগিদে চেয়ে নিয়েছিলাম। সেই লাঠিটি হাতে শক্ত করে ধরে আমি শাপলা চত্বরের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারদিকে মানুষের গর্জন, অনিশ্চয়তা আর আমার বুকভরা একাকীত্ব—এভাবেই শুরু হলো আমার জীবনের সেই বিভীষিকাময় সন্ধ্যার অপেক্ষা।
ফিরে যাওয়ার আকুতি এবং অবরুদ্ধ শাপলা চত্বর
মাগরিবের আজান তখনো হয়নি, বিকেলের ম্লান আলোয় চারপাশটা যখন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছিল, আমার মনের ভেতর তখন প্রচণ্ড এক অস্থিরতা কাজ করছিল। ক্ষুধার যন্ত্রণা আর একাকীত্বের মাঝে বারবার মনে হচ্ছিল—সব ছেড়ে যদি এখন আমার মাদ্রাসায় (প্রতিষ্ঠানে) ফিরে যেতে পারতাম! চেনা পরিবেশ আর পরিচিত মুখগুলোর জন্য মনটা ছটফট করে উঠল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
খবর পাচ্ছিলাম সবদিক থেকে ঢাকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়ে মোড়ে হামলা আর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়ে গেছে। মতিঝিল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রতিটি পথ যেন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। আমি এক অচেনা মানুষ, ঢাকার কোনো অলিগলি আমার চেনা নেই; এই রণক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে একা একা মাদ্রাসায় পৌঁছানো ছিল স্রেফ অসম্ভব।
অসহায়ের মতো ভিড়ের মধ্যে পরিচিত মুখ খুঁজতে থাকলাম। যদি মাদ্রাসার কোনো বড় ভাই বা সহপাঠীর দেখা পাই, তবে অন্তত তাদের সাথে ফেরার সাহসটা পেতাম। কিন্তু হাজার হাজার অচেনা মানুষের ভিড়ে আমার সেই কাঙ্ক্ষিত সঙ্গীকে আর খুঁজে পেলাম না। এক সময় বুঝতে পারলাম, ফেরার সব পথ আমার জন্য বন্ধ।
মাদ্রাসায় পৌঁছানোর মতো না ছিল সাহস, না ছিল কোনো নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। নিজের অজান্তেই যেন এক অবরুদ্ধ পরিস্থিতির জালে আটকা পড়লাম। অনিচ্ছা সত্ত্বেও, কেবল পরিস্থিতির শিকার হয়েই আমাকে শাপলা চত্বরের সেই অনিশ্চিত জনসমুদ্রে থেকে যেতে হলো। নিয়তি যেন আমাকে সেই বিভীষিকাময় রাতের মুখোমুখি হওয়ার জন্য সেখানেই দাঁড় করিয়ে রাখল।
অস্থির মন, শেষ ফোনকল এবং সামান্য খাবারের খোঁজ
মাগরিবের নামাজের সময় হলো। অগণিত মানুষের সাথে কাতারবন্দি হয়ে নামাজ আদায় করলাম। মোনাজাত শেষ করার পর এক অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রণায় আমি বিদ্ধ হচ্ছিলাম। যে লাঠিটি পোস্তগোলা থেকে পরম ভরসায় হাতে রেখেছিলাম, সেটি হঠাৎ করেই আমার কাছে ভারী এবং অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে লাগল। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল, মানুষ আমার দিকে ভিন্ন চোখে তাকাচ্ছে। একাকীত্ব আর আতঙ্ক আমার স্নায়ুর ওপর এমন চাপ তৈরি করেছিল যে, আশেপাশের প্রতিটি মানুষকে আমার শত্রু বলে ভ্রম হচ্ছিল। এক ধরণের মানসিক অস্থিরতা থেকে আমি হাতের লাঠিটি দূরে ফেলে দিলাম।
আমার ফোনের চার্জ তখন একদম শেষ পর্যায়ে। জানতাম না আর কতক্ষণ এটি সচল থাকবে। শেষবারের মতো বাড়িতে ফোন করলাম। খুব সংক্ষিপ্ত করে জানালাম—আমার ফোনটি যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাই হয়তো আর যোগাযোগ করা সম্ভব হবে না। ওপাশ থেকে প্রিয়জনদের উৎকণ্ঠা টের পাচ্ছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতির কাছে আমি তখন নিরুপায়।
এদিকে ক্ষুধার জ্বালা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সেই ভোরে মাদ্রাসা থেকে বের হওয়ার সময় কিছু খেয়েছিলাম, তারপর সারাদিন পেটে তেমন কিছুই পড়েনি। মাগরিবের পর আমি কিছুটা ক্লান্ত পায়ে হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম যদি কোনো খাবারের ব্যবস্থা পাওয়া যায়। হঠাৎ খবর পেলাম, মতিঝিলের বায়তুল আমান জামে মসজিদে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি আর দেরি না করে সেখানে ছুটে গেলাম। সেখানে গিয়ে কিছু চিড়া আর সামান্য চিনি পেলাম। সেই সামান্য খাবারটুকুই আমার কাছে তখন অমৃতের মতো মনে হলো। এই সামান্যতম আহারটুকু করেই আমি সেই দীর্ঘ রাতের প্রস্তুতি নিলাম, যার ভয়াবহতা সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না।
বিচ্ছিন্ন হৃদয়ের হাহাকার আর উদ্ভ্রান্তের মতো পথচলা
নিঃসঙ্গতার সেই চরম মুহূর্তে আমার অন্য দুই সহপাঠীর কথা বারবার মনে পড়ছিল। ভাগ্যক্রমে তাদের মোবাইল নম্বর দুটো আমার কাছে ছিল। অনেক চেষ্টার পর তাদের ফোনে পেলাম। রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলাম, “তোরা কোথায় আছিস?” ওপাশ থেকে হাপাটে গলায় তারা জানাল, তারা বায়তুল মোকাররম এলাকায় প্রচণ্ড সংঘর্ষের মাঝখানে আটকে পড়েছে। চারদিকে তখন রণক্ষেত্র।
আমি তাদের অনেকটা আর্তনাদের সুরেই বললাম, “তোমরা যখনই শাপলা চত্বরে আসবে, সবার আগে আমার সাথে দেখা করবে। আমি এখানে একদম একা হয়ে গেছি। খবরদার, আমাকে ভুলে যেও না!” তারা আমাকে বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করত, তাই ভালোবেসে ‘দাদা’ বলে ডাকত। ওপাশ থেকে একজন কাঁপা গলায় বলল, “দাদা, আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি, জানি না কপালে কী আছে। তবে যদি শাপলা চত্বরে পৌঁছাতে পারি, ইনশাআল্লাহ সবার আগে আপনার সাথেই দেখা করব।”
তাদের এই ‘ইনশাআল্লাহ’ বলাটুকু আমার মনে কিছুটা আশার আলো জ্বালালেও উৎকণ্ঠা কমেনি। মোবাইলটি বন্ধ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পাওয়া সেই আশ্বাসটুকু সম্বল করেই আমি শুরু করলাম এক অন্তহীন অপেক্ষা। আমি তখন পুরোপুরি দিশেহারা। একবার শাপলা চত্বরের মূল জনসমুদ্রে ফিরে যাই, আবার সেখান থেকে অস্থির হয়ে বায়তুল আমান মসজিদের দিকে আসি, কখনোবা উদ্দেশ্যহীনভাবে মতিঝিলের পিচঢালা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করি।
আমার অবস্থা তখন এক উদ্ভ্রান্তের মতো। চারদিকে হাজার হাজার মানুষ থাকলেও আমি যেন এক জনশূন্য মরুভূমিতে একা দাঁড়িয়ে। কোথায় গেলে একটু নিরাপত্তা পাব, কোথায় গেলে পরিচিত মুখ দেখব—এই দোলাচলে আমি এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। রাত বাড়ার সাথে সাথে মতিঝিলের আকাশ যেমন গুমোট হয়ে আসছিল, আমার মনের অবস্থাও ঠিক তেমনই অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান এবং ট্রাকের ওপর সেই ক্লান্ত ঘুম
সময় যেন আর কাটছিল না। এশার নামাজের ঠিক আগমুহূর্তের কথা। হঠাত করেই সেই বিশাল জনসমুদ্রে আমার সেই দুই সহপাঠীকে দেখতে পেলাম। ওই মুহূর্তে তাদের দেখে আমি কতটা আনন্দিত হয়েছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। মনে হচ্ছিল, মাঝ সমুদ্রে ডুবতে থাকা কোনো মানুষ যেন হঠাৎ তীরের দেখা পেয়েছে। আমি বারবার আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছিলাম—এই বিপদের রাতে তিনি আমাকে আবার পরিচিত মানুষের সান্নিধ্যে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
তাদের চেহারার দিকে তাকিয়ে আমার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। বায়তুল মোকাররমের সেই ভয়াবহ সংঘর্ষের ছাপ তাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট। ধুলোবালি আর ক্লান্তিতে তাদের চেনা যাচ্ছিল না, শ্রান্তিতে শরীর যেন ভেঙে আসছিল। শুধু তারাই নয়, আমিও তখন শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত। আমাদের তিনজনেরই আর দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি ছিল না।
আমরা আশ্রয় খুঁজছিলাম একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য। বায়তুল আমান মসজিদের পাশের রাস্তায় একটি বড় ট্রাক দাঁড় করানো ছিল। কোনো কিছু না ভেবেই, আমরা তিনজন সেই ট্রাকের ওপর উঠে পড়লাম। পিচঢালা তপ্ত রাস্তা আর মানুষের শোরগোল থেকে কিছুটা উঁচুতে, সেই ট্রাকের পাটাতনের ওপর আমরা আমাদের ক্লান্ত শরীরগুলো এলিয়ে দিলাম।
আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছি, আর চারদিকের গুঞ্জন শুনছি। সেই ট্রাকের ওপর শুয়ে থাকা অবস্থায় শরীর এতটাই নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল যে, আশেপাশে কী ঘটছে তা নিয়ে ভাবার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমরা তিনজন একে অপরের পাশে নিশ্চুপ শুয়ে রইলাম, অথচ জানতাম না সময়ের কাঁটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই নিস্তব্ধতা আর ক্লান্তির চাদরে মোড়ানো অবস্থায় আমাদের সময় ঘনিয়ে আসছিল।
গোলকধাঁধায় বারবার প্রিয়জন হারানো এবং শেষ আশ্রয়
ট্রাকের ওপর শুয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়ার পর অস্থিরতা যেন আমাকে আবার পেয়ে বসল। আমরা তিন বন্ধু ট্রাক থেকে নেমে পড়লাম। কৌতূহলী মন নিয়ে কখনো শাপলা চত্বরের মূল স্টেজের একদম সামনে চলে যাই—দেখি সেখানে কী হচ্ছে, কারা বক্তব্য দিচ্ছেন। আবার কখনো অবাক বিস্ময়ে পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি মানুষের সেই অন্তহীন সমুদ্র, যার শেষ সীমানা খুঁজে পাওয়া ভার। এভাবেই কখনো অলিগলি, কখনো মূল রাস্তায় আমরা উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।
কিন্তু মতিঝিলের সেই উত্তাল জনসমুদ্রে মুহূর্তের অসতর্কতা মানেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। এই হাঁটাচলার ভিড়ের মাঝে আমি আবারো আমার সেই দুই সহপাঠীকে হারিয়ে ফেললাম। এক নিমেষে তারা যেন ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। আমি পাগলের মতো তাদের খুঁজতে থাকলাম, কিন্তু কোথাও তাদের দেখা পেলাম না। ঢাকার এই অচেনা গণ্ডিতে আমি আবার সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ।
তীব্র আতঙ্ক আর দিশেহারা অবস্থায় আমি আবারো সেই বায়তুল আমান জামে মসজিদের দিকে ছুটে আসলাম। কারণ, সেই মুহূর্তে ওই মসজিদটিই ছিল আমার শেষ সম্বল, আমার একমাত্র চেনা ‘ল্যান্ডমার্ক’। এটি ছাড়া ঢাকার আর কোনো রাস্তা বা অলিগলি আমার চেনা ছিল না। মনে হচ্ছিল, এই মসজিদটিই আমার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।
মসজিদ প্রাঙ্গণে পৌঁছে আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে আমার একজন সিনিয়র বড় ভাইয়ের দেখা পেয়ে গেলাম। তাকে দেখতে পেয়ে আমার মনে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে এলো। আমি তাকে একপ্রকার জাপটে ধরে বললাম, “ভাই, আপনি অন্তত আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না!” তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন। এরপর থেকে আমি ছায়ার মতো তার সাথে লেগে রইলাম। তার হাত ধরে আমি আবারো এদিক-সেদিক আসা-যাওয়া করতে লাগলাম। এক অজানা ভয়ের মাঝেও তখন মনে একটু স্বস্তি ছিল যে, অন্তত একজন অভিভাবকতুল্য মানুষ আমার পাশে আছেন। কিন্তু আমরা কেউই জানতাম না, রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে কখন শুরু হবে সেই প্রলয়।
অভিযানের সংকেত এবং রণক্ষেত্রে রূপান্তর
রাত তখন গভীর, ঘড়ির কাঁটা দুইটা ছাড়িয়ে গেছে। চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন এক অশুভ সংকেত দিচ্ছিল। আমার সাথে থাকা সেই সিনিয়র বড় ভাই হঠাৎ আমাকে বললেন, “চলেন, আমরা স্টেজের দিকে যাই, দেখি সেখানে এখন কী অবস্থা।” যদিও শরীর আর চলছিল না, তবুও তার ওপর ভরসা করে আমি রাজি হলাম। আমরা ভিড় ঠেলে শাপলা চত্বরের মূল স্টেজের দিকে এগোতে শুরু করলাম।
কিন্তু কিছুদূর এগোতেই চারপাশের পরিস্থিতি বদলে যেতে লাগল। মাইকে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছিল—বিভিন্ন দিক থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রতিপক্ষ হামলা করার জন্য একদম প্রস্তুত। ঘোষণা আসছিল, “আপনারা যার যা আছে তা নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করুন, যেকোনো সময় হামলা হতে পারে।” সেই ঘোষণাগুলো রাতের অন্ধকারে এক বীভৎস আতঙ্কের সৃষ্টি করছিল।
আমি মনে মনে প্রচণ্ড কেঁপে উঠলাম। এক অজানা আশঙ্কায় আমার পা আর সামনে সরছিল না। আমি সেই বড় ভাইকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “ভাই, আমার আর সামনে যাওয়ার সাহস নেই। আপনি চাইলে সামনে যান, কিন্তু আমি আর পারছি না। আমি বরং পেছনে ফিরে সেই পরিচিত মসজিদেই আশ্রয় নেই।”
আমার কথা শেষ হতে না হতেই যেন নরকের দুয়ার খুলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো মতিঝিল এলাকা বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠল। শুরু হলো চারদিক থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলি আর টিয়ারশেলের বৃষ্টি। কান ফাটানো শব্দ আর আলোর ঝলকানিতে আকাশটা লাল হয়ে উঠল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক শান্ত পরিবেশ চোখের পলকে এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। আমি তখন দিকভ্রান্ত, চারদিকে শুধু মানুষের আর্তনাদ আর বারুদের গন্ধ।
মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফেরা এবং মসজিদের ভেতরে অবরুদ্ধ রাত
চারদিক থেকে যখন মুহুর্মুহু গোলাগুলি আর টিয়ারশেল শুরু হলো, আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে পেছনের দিকে দৌড়াতে লাগলাম। আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল সেই বায়তুল আমান মসজিদ। আমার সামনে-পেছনে তখন হাজার হাজার মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটছে। পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তখন ধাওয়া করছে, আর চারদিকে শুধু আর্তনাদ। মানুষের ভিড় ঠেলে, জীবন বাজি রেখে আমি মসজিদের গেটের দিকে এগোতে থাকলাম।
সেদিন আল্লাহর বিশেষ রহমত ছিল আমার ওপর। আমি যখন মসজিদের গেটে পৌঁছালাম, গেটটি তখনও খোলা ছিল। কিন্তু আমি ভেতরে প্রবেশ করার ঠিক তিন থেকে চার সেকেন্ডের মাথায় বিকট শব্দে গেটটি বন্ধ করে দেওয়া হলো। আজও ভাবলে শিউরে উঠি—যদি আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড দেরি হতো, তবে হয়তো আমার নিথর দেহটা মসজিদের সামনের ওই পিচঢালা রাস্তাতেই পড়ে থাকত।
ভেতরে ঢুকে দেখি তিল ধারণের জায়গা নেই; পুরো মসজিদ মানুষে মানুষে ঠাসা। আমি কোনোমতে ভিড় ঠেলে তিনতলায় একটু জায়গা করে নিলাম। কিন্তু মসজিদের ভেতরে ঢুকেও নিস্তার ছিল না। বাইরে থেকে পুলিশ ও যৌথ বাহিনী অনবরত মসজিদের ভেতরে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করছিল। কাঁচ ভাঙার শব্দ, ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধে নিশ্বাস নেওয়া দায় হয়ে পড়েছিল।
মসজিদের দেয়ালের বাইরে তখন অগণিত গুলির শব্দ—’ঠা ঠা’ করে শব্দে যেন কানে তালা লেগে যাচ্ছিল। ওপর তলা থেকে সেই শব্দগুলো এতই ভয়াবহ শোনাল যে মনে হচ্ছিল আমরা কোনো এক ভয়ঙ্কর রণক্ষেত্রের মাঝখানে আটকা পড়েছি। ভেতর থেকে আমরা শুধু একে অপরের কান্নার আওয়াজ আর আল্লাহু আকবার ধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, আজই হয়তো জীবনের শেষ রাত। মসজিদের সেই পবিত্র পরিবেশ মুহূর্তেই এক বিভীষিকাময় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।
অনিশ্চিত ভোর এবং মসজিদের বিদায় ঘণ্টা
গুলির প্রচণ্ড শব্দ আর হাজার হাজার মানুষের সমবেত তাকবির ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে হতে এক সময় বিভীষিকাময় সেই রাত শেষ হলো। ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করেছে, তখন আমাদের মনে এক চিলতে বাঁচার আশা উঁকি দিচ্ছিল। ফজরের নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই মসজিদের ইমাম সাহেব এক ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘোষণা করলেন, “আপনারা যার যার মতো এখন মসজিদ থেকে বেরিয়ে যান। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, এখন নিজেদের বাঁচান আর আমাদেরও বাঁচতে দিন।”
ইমাম সাহেবের সেই ঘোষণাটি আমাদের কাছে বজ্রপাতের মতো মনে হলো। মসজিদের বাইরে তখন অসংখ্য পুলিশ আর সেনাবাহিনীর সদস্য দাঁড়িয়ে। চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে থাকা সেই রণক্ষেত্রে পা রাখা মানেই ছিল নিশ্চিত মৃত্যু অথবা গ্রেপ্তার। মনে হচ্ছিল, পবিত্র এই আশ্রয়স্থল থেকে আমাদের যেন সরাসরি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ভেতরে অবরুদ্ধ মানুষের মাঝে তখন চাপা কান্না আর হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল।
অবশেষে যৌথ বাহিনীর সাথে মসজিদের প্রতিনিধিদের দীর্ঘ আলোচনা হলো। সিদ্ধান্ত হলো—ভেতরে যারা আছে, তাদের সবাইকে যার যার হাতের লাঠি-সোটা বা আত্মরক্ষার সব সরঞ্জাম মসজিদের ভেতরেই ফেলে দিতে হবে। এরপর সারিবদ্ধভাবে মসজিদের পেছনের গেট দিয়ে বের হয়ে যেতে হবে।
আমরা বাধ্য হয়ে আমাদের শেষ সম্বলটুকুও ফেলে দিলাম। পেছনের গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় আমাদের বুক দুরুদুরু করছিল। জানি না গেটের ওপাশে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে—কারও লাঠির আঘাত নাকি ঠান্ডা কোনো জেলখানা। জীবনের মায়া ত্যাগ করে, এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আমরা মসজিদের সেই নিরাপদ দেয়াল ছেড়ে একে একে বাইরের অনিশ্চিত পথে পা রাখলাম।
রক্তভেজা রাজপথ আর মৃত্যুর সাথে লুকোচুরি
মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল কোনোমতে ছোট চাচার বাসায় পৌঁছানো। তিনি মোহাম্মদপুর আদাবর এলাকায় থাকতেন। আমি ঢাকার নতুন মানুষ, তাই শাপলা চত্বরের দিক দিয়েই কোনো পথ খুঁজে পাওয়ার আশায় সেদিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই আমার হাড় হিম হয়ে গেল। ভোরের আলোয় দেখলাম, রাস্তার পিচ যেন জমাট বাঁধা রক্তে ঢাকা। চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত—সে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
এমন সময় একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর অফিসারের সাথে আমার দেখা হলো। তিনি আমার গন্তব্যের কথা শুনে আঁতকে উঠলেন। বললেন, “মোহাম্মদপুরের দিকে যাওয়ার চিন্তা এখন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। ওদিকে এখনো প্রচণ্ড হামলা আর সংঘর্ষ চলছে। এর চেয়ে ভালো হয় যদি আপনি আপনার মাদ্রাসার দিকে ফিরে যেতে পারেন।”
তার সাথে কথা বলছিলাম, ঠিক সেই মুহূর্তে দেখলাম র্যাবের একটি দল আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে আবার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। আমি প্রাণভয়ে আবারও সেই বায়তুল আমান মসজিদের দিকে দৌড়াতে শুরু করলাম। কিন্তু তীব্র আতঙ্ক আর দিশেহারা অবস্থায় আমি ভুল করে অন্য একটি সরু গলিতে ঢুকে পড়লাম। গলিটি ছিল অচেনা, আর সামনে যাওয়ার কোনো পথ ছিল না।
পিছনে র্যাবের বুটের শব্দ আর হুংকার। আমি বুঝতে পারলাম ভুল পথে চলে এসেছি। নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে আবার উল্টো দৌড় দিলাম। মৃত্যুর ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে আমি র্যাবের নজর এড়িয়ে আবারও সেই মসজিদের গেটে এসে পৌঁছালাম। অল্পের জন্য সেদিন গ্রেপ্তার হওয়া বা অন্য কোনো বড় বিপদ থেকে বেঁচে গেলাম। দ্বিতীয়বারের মতো সেই মসজিদটিই আমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অলৌকিক ঢাল হয়ে দাঁড়াল। আমি হাপাতে হাপাতে আবারও সেই পরিচিত চত্বরে আশ্রয় নিলাম।
অবিশ্বাস আর একাকীত্বের পথে যাত্রা
দ্বিতীয়বার মসজিদ থেকে বের হয়ে আমি বুঝতে পারলাম, এখানে বেশিক্ষণ থাকা আর নিরাপদ নয়। এবার গন্তব্য চাচার বাসা নয়, বরং নিজের মাদ্রাসার পরিচিত পরিবেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্প করলাম। পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে আমি যখন মূল রাস্তায় পা রাখলাম, তখনো চারদিকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। অনেক দূরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছিল আর মাঝেমধ্যেই ভেসে আসছিল ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার শব্দ।
কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মানসিক অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, আমি নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। রাস্তায় দুই-একটি ভ্যান বা রিকশা চললেও সেগুলোর দিকে তাকাতে আমার ভয় হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এই রিকশাচালক বা ভ্যানচালক হয়তো ছদ্মবেশে আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘ রাতের বিভীষিকা আমার স্নায়ুর ওপর এতটাই চাপ সৃষ্টি করেছিল যে, রাস্তার প্রতিটি মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষকেও আমার ‘শত্রু’ বলে ভ্রম হচ্ছিল।
আমি একা, সম্পূর্ণ নিরুপায়। পেটে ক্ষুধা, শরীরে অসম্ভব ক্লান্তি আর মনে এক পাহাড় সমান ভয় নিয়ে আমি হাঁটতে শুরু করলাম। কাউকে কোনো ঠিকানা জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছিলাম না, পাছে কেউ আমাকে ধরিয়ে দেয় বা আক্রমণ করে। প্রতিটি রিকশার বেল বা ইঞ্জিনের শব্দে আমি আঁতকে উঠছিলাম। এক অদ্ভুত আস্থাহীনতা আমাকে গ্রাস করে ফেলেছিল। এই অচেনা শহরে, অগণিত মানুষের ভিড়েও আমি তখন এক চরম একাকীত্বের লড়াই লড়ছি—যেখানে পৃথিবীর সব মানুষকেই আমার বিপক্ষ শক্তি মনে হচ্ছিল। এভাবেই অবিশ্বাসের পাহাড় ডিঙিয়ে আমি আমার গন্তব্যের দিকে পা বাড়ালাম।
অনিশ্চিত রিকশা যাত্রা এবং হায়েনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি
অবিশ্বাসের সেই পাহাড় মাথায় নিয়ে যখন আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছিলাম, ঠিক তখন হঠাত এক রিকশাওয়ালা আমাকে ডাক দিলেন। তিনি সম্ভবত আমার বিধ্বস্ত চেহারা আর আতঙ্কিত চোখ দেখে পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বললেন, “ভাই, আমার রিকশায় ওঠেন, আমি আপনাকে পৌঁছায় দেব।” তবে তারও সীমাবদ্ধতা ছিল; তিনি জানালেন যে আমার মাদ্রাসার একদম গেট পর্যন্ত যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়, আমাকে প্রায় দুই কিলোমিটার আগেই নেমে যেতে হবে। সেই মুহূর্তে আমার আর বাছবিচার করার মতো অবস্থা ছিল না। কোনো কিছু চিন্তা না করেই আমি তার রিকশায় উঠে পড়লাম।
রিকশা চলতে শুরু করল। দুই পাশে ধ্বংসস্তূপ আর রক্তের দাগ মাখা রাস্তা। আমি রিকশার সিটে বসে আড়ষ্ট হয়ে রইলাম। ডানে-বামে তাকাতেই আমার বুক শুকিয়ে আসছিল। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেনাবাহিনী আর পুলিশের সদস্যরা আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল, যেন আমি খুব বড় কোনো অপরাধী। তাদের সেই ‘ভয়ংকর দৃষ্টি’ আমার সারা শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে রিকশা থামিয়ে তারা আমাকে নামিয়ে নেবে। প্রতিটি সেকেন্ড কাটছিল এক একটি ঘণ্টার মতো। রিকশাওয়ালার প্যাডেলের শব্দের চেয়েও আমার নিজের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি বেশি জোরে শুনতে পাচ্ছিলাম আমি। সেই দুই কিলোমিটার দূরত্বের পথটুকু ছিল আমার জীবনের দীর্ঘতম পথ। একদিকে মুক্তির আশা, অন্যদিকে হায়েনার মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সেই পাহারা—এই দুইয়ের মাঝখানে আমি তখন স্রেফ আল্লাহর ওপর ভরসা করে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছিলাম।
গালিগালাজ, হায়েনার নজর আর লুকোচুরির পথচলা
রিকশাওয়ালা যখন আমাকে রাস্তার পাশে নামিয়ে দিল, তখন গন্তব্য অর্থাৎ আমার মাদ্রাসা আর মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। কিন্তু সেই দুই কিলোমিটার পথ আমার কাছে তখন দুইশ মাইলের সমান মনে হচ্ছিল। গত রাতের সেই বিভীষিকা, চোখের সামনে মানুষের লুটিয়ে পড়া আর বারুদের গন্ধ তখনো আমার মগজে জেঁকে বসে আছে। শরীর অবশ হয়ে আসছিল, কিন্তু বাঁচার তাগিদে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আমি হাঁটতে শুরু করলাম।
রাস্তাঘাট তখনো থমথমে। হঠাৎ রাস্তার পাশ থেকে দুইজন লোক আমাকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কদর্য ও বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করল। তাদের মুখ দিয়ে এমন সব ভাষা বের হচ্ছিল যা সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে উচ্চারণ করাও অসম্ভব। আমি মাথা নিচু করে শুধু নীরবে হজম করে যাচ্ছিলাম, কারণ প্রতিবাদ করার মতো শক্তি বা পরিস্থিতি কোনোটিই আমার ছিল না। আমার কলিজা তখন ভয়ে শুকিয়ে আসছিল।
একটু সামনে এগোতেই বিপদের মাত্রা আরও বাড়ল। দেখলাম দূরে রাস্তা আটকে প্রায় ১০-১২ জন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে এক ধরণের হিংস্রতা এবং আমার দিকে তাদের দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। মনে হচ্ছিল, তারা যেন শিকার ধরার অপেক্ষায় ওত পেতে আছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম তাদের সামনে পড়লে আমার রক্ষা নেই।
প্রাণ বাঁচাতে আমি চট করে রাস্তার পাশের একটি সরু গলির ভেতরে ঢুকে আত্মগোপন করলাম। দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে বুক দুরুদুরু অবস্থায় প্রার্থনা করছিলাম যেন তারা আমাকে না দেখে। অনেকক্ষণ পর যখন বুঝলাম তারা রাস্তা থেকে সরে গেছে, তখন আমি আবার গলি থেকে বেরিয়ে চোরের মতো সন্তর্পণে হাঁটতে শুরু করলাম। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অনিশ্চয়তার, প্রতিটি মোড় ছিল এক একটি মরণফাঁদ। এভাবেই ভয়কে সঙ্গী করে আমি আমার শেষ আশ্রয়ের দিকে এগোতে থাকলাম।
চেনা মানুষের অচেনা রূপ এবং গন্তব্যের দুয়ারে
হাঁটতে হাঁটতে এক সময় আমার সেই অতি পরিচিত মাদ্রাসার সীমানায় পৌঁছে গেলাম। এই রাস্তাটি আমার পায়ের ছাপে চেনা, এখানকার প্রতিটি দোকানদার আর পথচারী আমার চেনা মুখ। প্রতিদিন আমরা এই পথ দিয়েই আসা-যাওয়া করি, কিন্তু আজ দৃশ্যপট সম্পূর্ণ আলাদা। চারপাশের পরিবেশ একই থাকলেও মানুষগুলো যেন রাতারাতি বদলে গেছে। যারা আমাকে প্রতিদিন দেখে হাসিমুখে কথা বলত, আজ তারাই আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন আমি কোনোিন তাদের পরিচিত ছিলাম না। তাদের সেই রুক্ষ আর ‘ভয়ংকর দৃষ্টি’ আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে, গত এক রাতের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলে গেছে।
রাস্তার পাশে কিছু লোক জড়ো হয়ে খবরের কাগজ পড়ছিল। আমি তাদের ভালো করেই চিনতাম, আমাদের প্রতিবেশী বা পরিচিত মুখ তারা। কিন্তু আজ তাদের মুখ দিয়ে যে বিষোদ্গার বের হচ্ছিল, তা শুনে আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছিল। তারা আমাদের শ্রদ্ধেয় আল্লামা শফী সাহেবকে নিয়ে এমন সব জঘন্য ও কদর্য ভাষায় গালিগালাজ করছিল, যা কানে নেওয়াও ছিল কষ্টের। আমি জানতাম ওই লোকগুলো কারা, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার শরীর কিংবা মন—কোনোটিই প্রতিবাদের অবস্থায় ছিল না। এক বুক হাহাকার আর ঘৃণা চেপে আমি শুধু মাথা নিচু করে তাদের পাশ কাটিয়ে গেলাম।
অবশেষে, দীর্ঘ এক বিভীষিকাময় যাত্রা শেষে আমি আমার মাদ্রাসার প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়ালাম। এই সেই গেট, যেখান থেকে গত ভোরে আমি অনেক স্বপ্ন আর আবেগ নিয়ে বের হয়েছিলাম। আজ যখন ফিরে এলাম, তখন আমি এক বিধ্বস্ত মানুষ—জীর্ণ শরীর, আতঙ্কিত চোখ আর একরাশ রক্তমাখা স্মৃতি নিয়ে। মাদ্রাসার গেটটি স্পর্শ করতেই মনে হলো, আমি মৃত্যুর রাজ্য থেকে অবশেষে জীবনের ছায়ায় এসে পৌঁছাতে পেরেছি।
শেষ আশ্রয় এবং বিশ্বাসের পরীক্ষা
মাদ্রাসার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার পর এক অন্যরকম দৃশ্য আমার চোখে পড়ল। বাইরের সেই রণক্ষেত্র আর মানুষের হিংস্রতার ঠিক বিপরীতে মাদ্রাসার ভেতরটা ছিল এক অদ্ভুত শান্ত অথচ বিষাদময়। আমি দেখলাম মাদ্রাসার আন্ডারগ্রাউন্ড বা নিচতলায় এক অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাতে যারা আহত হয়ে ফিরে আসতে পেরেছেন, তাদের অনেকেরই শরীর রক্তাক্ত, কেউবা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। সেখানে সাধ্যমতো তাদের সেবা ও চিকিৎসা চলছে। সেই দৃশ্য দেখে নিজের শরীরের ক্লান্তি আর যন্ত্রণার কথা মুহূর্তেই ভুলে গেলাম। আরো পড়ুন: আলেম সমাজের ব্যবসায় পদার্পণ: একটি ইতিবাচক বিপ্লব ও আগামীর সম্ভাবনা
আমি যখন নিজের রুমে পৌঁছালাম, দেখলাম আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ওস্তাদজিরা প্রতিটি রুমে রুমে যাচ্ছেন। তারা আতঙ্কিত ছাত্রদের পাশে বসছেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তাদের কণ্ঠে কোনো আক্ষেপ বা উত্তজনা ছিল না, বরং ছিল গভীর এক প্রশান্তি। তারা সবাইকে বোঝাচ্ছিলেন—জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে। তারা বলছিলেন, “বাবা, ধৈর্য ধরো। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা। মুমিনের জীবনে পরীক্ষা আসবেই, আর এই পরীক্ষায় ধৈর্যের সাথেই আমাদের উত্তীর্ণ হতে হবে।”
ওস্তাদদের সেই অমৃত সমান উপদেশগুলো আমাদের তপ্ত হৃদয়ে শীতল পরশের মতো কাজ করছিল। গত ২৪ ঘণ্টার সেই বিভীষিকা, গোলাগুলি, রক্ত আর অপমানের যে বোঝা আমি বয়ে এনেছিলাম, ওস্তাদদের সান্নিধ্যে এসে তা যেন অনেকটাই হালকা হয়ে গেল।
৫ই মে ২০১৩-এর সেই ভোর থেকে শুরু করে পরের দিন সকাল ৯টা পর্যন্ত—এই কয়েক ঘণ্টা আমার জীবনের দীর্ঘতম সময়। একটি দিন আর একটি রাতের ব্যবধানে আমি মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখেছি যে, আজ যখন সেই স্মৃতির পাতা উল্টাই, তখনো গা শিউরে ওঠে। শাপলা চত্বরের সেই রক্তমাখা রাজপথ আর বায়তুল আমান মসজিদের সেই অবরুদ্ধ রাত আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ইতিহাস হয়ে থাকবে। পরিশেষে, আল্লাহর অশেষ শোকর আদায় করে আমি আমার সেই ভয়াবহ স্মৃতিযাত্রার ইতি টানলাম।




