রমজানের কিছু দিন পূর্ব থেকেই সবার মাথায় যে প্রশ্নগুলো আসে। তা হলো, তারাবির নামাজ কত রাকাত? তারাবির নামাজ কত রাকাত সহীহ হাদিস? তারাবির নামাজ কত রাকাত পড়া উত্তম? তারাবির নামাজ কত রাকাত পড়া যায়? কাবা শরীফের তারাবির নামাজ কত রাকাত? ইত্যাদি।
আজ এ টপিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। পূর্ণ প্রবন্ধটি পড়লে তারাবিহ সংক্রান্ত মনের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।
সহীহ হাদিসের আলোকে তারাবির নামায কত রাকাত
তারাবীহ হলো একটি ইবাদত। ইবাদতে কোন যুক্তি চলে না। ইবাদতের ব্যাপারে মুলত দেখতে হবে যে কোরআন-সুন্নাহ কী বলে? তো তারাবীহের ব্যাপারে কোরআনে তেমন কিছুই নেই। যেহুতু তারাবীহের ব্যাপারে কোরআনে কিছুই নেই সেহুতু আমাদের দেখতে হবে হাদীসে কী আছে? আমরা হাদীসের বিভিন্ন কিতাবাদী রিসার্চ করার পর ২ ধরণের হাদীস পেলাম।
এক. ২০ রাকাতের হাদীস, যেগুলো-ই মুলত তারাবীহের হাদীস।
দুই. ৮ রাকাতের হাদীস, যেগুলো মুলত তাহাজ্জুদের হাদীস, তারাবীহের হাদীস নয়। কিন্তু আহলে হাদীস ভাইয়েরা তাহাজ্জুদের এই হাদীসগুলোকে-ই তারাবীহের হাদীস বলে তারাবীহের নামাজ ৮ রাকাত সাব্যস্ত করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা করেন।
প্রথমে আমি তারাবীহের ২০ রাকাতের হাদীসগুলো উল্লেখ করবো এবং প্রত্যেকটি মাজহাবের (৪ ইমামের) মতামতও উল্লেখ করে দিব ইনশাআল্লাহ। তারপর ৮ রাকাতের যেই হাদীসটি আছে সেটি যে মুলত তারাবীহের হাদীস নয় বরং তাহাজ্জুদের হাদীস সেই বিষয়টি-ই আমি ঐ হাদীসের প্রত্যেকটি শব্দ দিয়ে বুঝিয়ে দিব ইনশাআল্লাহ।
(তাই শেষ পর্যন্ত পড়ার অনুরোধ রইলো, বিশেষকরে ৮ রাকাতের হাদীসের উত্তরগুলো পড়ার জন্য আমার দীর্ঘ দিনের মেহনতের বিনিময়ে আপনাদের থেকে মাত্র কয়েকটি মিনিট সময় চাই)
তারাবীহের নামাজ ২০ রাকাতের প্রমাণ
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীনের তারাবীহ ২০ রাকাত ছিল৷
২. হয়রত উমর রা. থেকে বাকী ৩ খলীফার আদেশ ২০ রাকাত পড়ার জন্য।
৩. সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমত ২০ রাকাতের উপর।
৪. উম্মতের ঐক্যমত ২০ রাকাতের উপর।
৫. ইমামদের ঐক্যমত ২০ রাকাতের উপর।
৬. মক্কা এবং মদীনা শরীফে শুরু লগ্ন থেকে আজ অবদি পর্যন্ত ২০ রাকাত হয়ে আসছে।
৭. এমনকি ইমাম জুহরী রহিমাহুল্লাহ তিনি নিজেও ২০ রাকাত পড়তেন।
এই দলীলগুলো সামনে রাখলে আমরা দেখি তারাবীহ আসলেই ২০ রাকাত, ৮ রাকাত নয়।
তারাবির নামাজ কত রাকাত সহীহ হাদিস
👉 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তারাবীহ।
১. হাদীস শরীফে বর্নিত আছেঃ
عن ابن عباس ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يصلى فى رمضان عشرين ركعة والوتر.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিঃ থেকে বর্ণিত। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবীহ এবং ৩-রাকাত বিতির পড়তেন। হাদীসের সনদ সহীহ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৭৬৯২, সুনানে কুবরা বায়হাকী ৪৩৯১, আল মুজামুল কাবীর ১২১০২, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১৭২)
২. হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) বলেছেন যে, একদা রমজান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববীতে তাশরীফ আনলেন এবং লোকদের নিয়ে সাতাইশ রাকাত নামায আদায় করলেন৷ তথা ৪-রাকাত ফরয, ২০ রাকাত তারাবীহ এবং ৩ রাকাত বিতির। (তারীখে জুরজান ১৪৬, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৭৬৯২, মুসনাদে আবদ বিন হুমাইদ ২১৮)
৩. অপর হাদীসে বর্নিত হয়েছে,
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَخْبَرَنِي عُرْوَةُ، أَنَّ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ أَخْبَرَتْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ لَيْلَةً مِنْ جَوْفِ اللَّيْلِ، فَصَلَّى فِي الْمَسْجِدِ، وَصَلَّى رِجَالٌ بِصَلاَتِهِ، فَأَصْبَحَ النَّاسُ فَتَحَدَّثُوا، فَاجْتَمَعَ أَكْثَرُ مِنْهُمْ، فَصَلَّوْا مَعَهُ، فَأَصْبَحَ النَّاسُ فَتَحَدَّثُوا، فَكَثُرَ أَهْلُ الْمَسْجِدِ مِنَ اللَّيْلَةِ الثَّالِثَةِ، فَخَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَصَلَّى، فَصَلَّوْا بِصَلاَتِهِ، فَلَمَّا كَانَتِ اللَّيْلَةُ الرَّابِعَةُ عَجَزَ الْمَسْجِدُ عَنْ أَهْلِهِ، حَتَّى خَرَجَ لِصَلاَةِ الصُّبْحِ، فَلَمَّا قَضَى الْفَجْرَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاسِ، فَتَشَهَّدَ ثُمَّ قَالَ “ أَمَّا بَعْدُ، فَإِنَّهُ لَمْ يَخْفَ عَلَىَّ مَكَانُكُمْ، وَلَكِنِّي خَشِيتُ أَنْ تُفْتَرَضَ عَلَيْكُمْ فَتَعْجِزُوا عَنْهَا ”. فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَالأَمْرُ عَلَى ذَلِكَ
আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গভীর রাতে বের হয়ে মসজিদে নামাজ আদায় করেন, কিছু সংখ্যক পুরুষ তাঁর পিছনে নামাজ আদায় করেন। সকালে লোকেরা এ সম্পর্কে আলোচনা করেন, ফলে পরদিন লোকেরা অধিক সংখ্যায় সমবেত হন। অতঃপর তিনি নামাজ আদায় করেন এবং লোকেরাও তাঁর সঙ্গে নামাজ আদায় করেন।
সকালে আবার তাঁরা এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেন। যার ফলে তৃতীয় রাতে মসজিদে মুসল্লীর সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। এরপর হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হয়ে নামাজ আদায় করেন ও লোকেরাও তাঁর সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। অতপর চতুর্থ রাতে মসজিদে মুসল্লীর সংকুলান হল না, কিন্তু সে রাতে তিনি আর বের হলেননা৷ বরং ফযরের নামাজ পড়ার জন্য বের হয়ে আসলেন এবং নামাজ শেষে লোকদের দিকে ফিরে প্রথমে তাওহীদ ও রিসালতের সাক্ষ্য দেয়ার পর বললেন, ‘শোন! তোমাদের (গতরাতের) অবস্থা আমার অজানা ছিল না, কিন্তু আমি এই নামাজ তোমাদের উপর ফরয হয়ে যাওয়ার আশংকা করছি। কেননা তা আদায় করতে তোমরা অপারগ হয়ে পড়বে। অতপর বিষয়টি এভাবেই থেকে যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যু পর্যন্ত৷
হাদীসের সনদ সহীহ (সহীহুল বুখারী ২০১২, সহীহু মুসলিম ৭৬১, সুনানে আবু দাউদ ১৩৭৩, মুয়াত্তা মালিক ২৪০)
৪. আল মুসান্নাফের লেখক ইবনে আবী শাইবা তিনি ইমাম বুখারী (রহঃ) এর উস্তাদ, এই কিতাবে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে তারাবীহ ২০ রাকাত পড়েছেন এবং বিতর পড়েছেন। খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২২৫, হাদীস নং ৭৭৭।
৫. ইমাম তাবরানী (রহঃ) (অনেক বড় একজন ইমাম) এর সংকলিত হাদীসের একাধিক কিতাবে আছে, যেমন তাঁর সংকলিত কিতাব “المعجم الكبير الطبرانى” তে আছে,
“حدثنا محمد بن جعفر الرازى قال علي بن جعد قال حدثنا أبو شيبة ابراهيم بن عثمان عن الحكم عن مقسم عن ابن عباس رضى الله تعالى عنهما و عنهم قال كان النبي صلى الله عليه وسلم يصلى في رمضان عشرين ركعة والوتر “
অর্থাৎ হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবীহ পড়তেন এবং বিতর পড়তেন। খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৩৩, হাদীস নং ১১৯৩৪)
উক্ত হাদীসগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তারাবীহের নামাজ ২০ রাকাত-ই পড়েছেন এবং জামাতও কায়েম করেছেন।
আরও পড়ুন: নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদিস: নামাযে হাত কোথায় বাঁধবে
খোলাফায়ে রাশেদীনদের তারাবিহ
খোলাফায়ে রাশেদীনদের তারাবিহ ২০ রাকাত-ই ছিল।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযিঃ) ২০ রাকাত তারাবীহ পড়তেন৷ হযরত ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেছেন যে, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মৃত্যু পর্যন্ত এমনকি হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাযিঃ) এর খিলাফতকালে ও হযরত উমর (রাযিঃ) এর খিলাফতের প্রথমভাগে তারাবীহের ব্যাপারটি এভাবেই চালু ছিল যে, হযরত সাহাবায়ে কিরাম (রাযিঃ) একাকীভাবে কিংবা কয়েকজন মিলে জামায়াতে ২০ রাকাত তারাবীহ পড়তেন৷
(সহীহুল বুখারী ২০০৯, সহীহু মুসলিম ৭৫৯, মুয়াত্তা মালিক ২৪১)
হযরত উমর (রাযিঃ) এর তারাবীহ।
১. হাদীস শরীফে বর্নিত আছে যে,
عن يزيد بن رومان ، أنه قال : « كان الناس يقومون في زمان عمر بن الخطاب في رمضان بثلاث وعشرين ركعة»
হযরত ইয়াজিদ বিন রূমান (রহঃ) বলেছেন যে, হযরত ওমর রাযিঃ এর শাসনামলে লোকেরা রমযান মাসে ২০ রাকাত তারাবীহ এবং ৩-রাকাত বিতির আদায় করতেন।
হাদীসের সনদ সহীহ (মুয়াত্তা মালিক ৩৮০, মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার ১৪৪৩, সুনানে কাবীর বায়হাকী ৪৩৯৪)
২. অপর হাদীসে বর্নিত আছে যে,
وَعَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَبْدٍ الْقَارِيِّ، أَنَّهُ قَالَ خَرَجْتُ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ ـ رضى الله عنه ـ لَيْلَةً فِي رَمَضَانَ، إِلَى الْمَسْجِدِ، فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُونَ يُصَلِّي الرَّجُلُ لِنَفْسِهِ، وَيُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّي بِصَلاَتِهِ الرَّهْطُ فَقَالَ عُمَرُ إِنِّي أَرَى لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلاَءِ عَلَى قَارِئٍ وَاحِدٍ لَكَانَ أَمْثَلَ. ثُمَّ عَزَمَ فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ، ثُمَّ خَرَجْتُ مَعَهُ لَيْلَةً أُخْرَى، وَالنَّاسُ يُصَلُّونَ بِصَلاَةِ قَارِئِهِمْ، قَالَ عُمَرُ نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ، وَالَّتِي يَنَامُونَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنَ الَّتِي يَقُومُونَ. يُرِيدُ آخِرَ اللَّيْلِ، وَكَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ أَوَّلَهُ.
হযরত আবদুর রাহমান ইবনে আবদ আল-ক্বারী (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, ‘আমি রমযানের এক রাতে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) এর সাথে মসজিদে নববীতে গিয়ে দেখি যে, লোকেরা এলোমেলোভাবে জামায়াতে বিভক্ত হয়ে তারাবীহের নামাজ আদায় করছে৷ কেউ বা একাকীভাবে নামাজ আদায় করছে৷ তা দেখে হযরত উমর (রাযিঃ) বললেন যে, আমি মনে করি এই লোকদেরকে যদি একজন ইমামের পিছনে জমা করে দেই, তবে তা উত্তম হবে।
এরপর তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ক্বারী হযরত উবাই ইবনে কায়া’ব (রাযিঃ) এর পিছনে সকলকে জমা করে দিলেন। অতঃপর আবার কোন এক রাতে আমি হযরত উমর (রাযিঃ) এর সাথে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হই। তখন লোকেরা হযরত উবাই ইবনে কায়া’ব (রাযিঃ) এর ইমামতিতে নামাজ আদায় করছিল।
তখন হযরত উমর (রাযিঃ) বললেন, কতই না সুন্দর ও উত্তম এই নতুন ব্যবস্থা! অতপর তিনি বললেন, তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাক তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম যে অংশে তোমরা নামাজ আদায় কর৷ এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন৷ কেননা তখন রাতের প্রথমভাগে লোকেরা নামাজ আদায় করত। হাদীসের সনদ সহীহ (সহীহুল বুখারী ২০১০, মুয়াত্তা মালিক ২৪২)
৩. সুনানে আবু দাউদ খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২০২, হাদিস নম্বর ১৪২৯ এ উল্লেখ আছে যে,
“ان عمر بن الخطاب رضي الله عنه جمع الناس على ابي بن كعب فكان يصلي لهم عشرين ركعة”
হযরত ওমর (রাযিঃ) সমস্ত মুসলমানদেরকে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাযিঃ) এর পিছনে তারাবীহের নামাজের ব্যাপারে একত্রিত করেছেন আর তিনি তাদেরকে বিশ রাকাত নামায পড়াতেন । আবু দাউদ শরীফের এই হাদিসটি শুধু দেওবন্দী সংস্করণে উল্লেখ রয়েছে বলে লা-মাজহাবী কিছু শায়েখরা যা বলেন, তা একটি মারাত্মক মিথ্যাচার ।
হযরত ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ লিখিত “সিয়ারু আ’লামিন নুবালা” কিতাবটির তৃতীয় খন্ডে ২৪২ পৃষ্ঠায় তিনি হুবহু এভাবেই হাদীস শরীফটি উল্লেখ করেছেন । ইমাম যাহাবীর জন্ম ৬৭৩ হিজরী ও তাঁর মৃত্যু ৭৪৮ হিজরীতে। ইমাম যাহাবী ওই ব্যক্তি যার কিতাব অধ্যায়ণ না করলে এই যুগে হাদীসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হত না।
আবু দাউদ শরীফের দেওবন্দী সংস্করণ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তার বর্ণনাটি প্রমাণ করে হযরত ইমাম যাহাবী (রহঃ) এর সামনে আবু দাউদ শরীফের যে সংস্করণটি বিদ্যমান ছিল সেখানেও ২০ রাকাত তারাবীহের কথা-ই উল্লেখ আছে।
৪. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৬১ তে উল্লেখ আছে যে, হযরত ওমর (রাযিঃ) এর যমানায় সকল মুসলমানগন তেইশ রাকাত নামাজ পড়তেন ।
৫. মুআত্তা ইমাম মালেকের ৪০ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, হযরত ওমর (রাযিঃ) এর যমানায় সকল সাহাবী ও তাবেয়ীগণ রমজানে ২৩ রাকাত (তারাবীহ ও বিতর) নামায পড়তেন ।
৬. আল মুগনী ১/১৬৭ তে উল্লেখ আছে যে,
“انه ما فعله عمر و اجمع عليه الصحابه رضي الله عنهم في عصر هم احق واولي بالاتباع”
বিশ রাকাতের আমলটি হযরত ওমর (রাযিঃ) করেছেন এবং ওই যুগে সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম তার উপরে ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন । কাজেই এটিই সঠিক ও অনুসরণ করার জন্য বেশি উপযুক্ত ।
৭. এরশাদুস সারী ৩/৪২৬ তে উল্লেখ আছে যে,
وقد عدوا ماوقع في زمن عمر رضى الله تعالى عنه كالاجماع
হযরত ওমর (রাযিঃ) এর যুগের অবস্থা ইজমা অর্থাৎ সর্বসম্মত ঐক্যমত্য পর্যায়ে গণ্য।
হযরত উসমান (রাযিঃ) এর তারাবীহ ২০ রাকাত ছিল
হযরত উসমান (রাযিঃ) ২০ রাকাত তারাবীহ পড়তেন৷ হযরত সায়েব বিন ইয়াজিদ (রহঃ) বলেছেন যে, হযরত ওমর (রাযিঃ) এর শাসনামলে লোকেরা বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন। অনুরুপ হযরত উসমান (রাযিঃ) এর শাসনামলেও৷ শুধু তাই নয়! ইমামের লম্বা কেরাতের কারণে লোকেরা লাঠির উপর ভর দিয়ে তারাবীহ পড়তেন৷
হাদীসের সনদ সহীহ (সুনানে কুবরা বায়হাকী ৪/২৯৬)
হযরত আলী (রাযিঃ) এর তারাবীহ ২০ রাকাত ছিল
হযরত আলী (রাযিঃ) ২০ রাকাত তারাবীহ পড়তেন। যেমন হাদীস শরীফে বর্নিত আছে যে,
عن ابى عبد الرحمن السلمى عن على قال دعى القراء فى رمضان فامر منهم رجلا يصلى بالناس عشرين ركعة قال وكان على يوتر بهم
হযরত আবু আব্দুর রহমান সুলামী (রহঃ) বলেছেন যে, হযরত আলী (রাযিঃ) রমজান মাসে ক্বারীদের ডাকতেন। তারপর তাদের মাঝে একজনকে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়ানোর হুকুম দিতেন। আর হযরত আলী (রাযিঃ) নিজেই বিতরের নামাজ পড়াতেন৷ হাদীসের সনদ সহীহ (সুনানে কুবরা বায়হাকী ৪৮০৫, ৪৩৯৭, কানযুল উম্মাল)
সাহাবীদের তারাবীহ ২০ রাকাত-ই ছিল
সকল সাহাবায়ে কিরাম (রাযিঃ) ২০ রাকাত তারাবীহ পড়তেন৷ যেমন তারীখুল খুলাফা তথা খুলাফায়ে রাশেদীনের ইতিহাস অনুযায়ী হযরত ওমর (রাযিঃ) ১৫ তম হিজরীতে জামায়া’তের সাথে ২০ রাকাত তারাবীহের প্রচলন শুরু করেন।
আর উম্মুল মুমিনীন হযরত সাইয়্যেদা আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) ৫৭ তম হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন। পুরো ৪২ বছর আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) এর হুজরার নিকটবর্তী মসজিদে নববীতে সাহাবায়ে কিরাম (রাযিঃ) ২০ রাকাত তারাবীহ পড়েছেন৷ দীর্ঘ এই ৪২ বছরের ভিতর আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) কোনদিন ২০ রাকাত তারাবীহ বা তারাবীর জামায়া’তের ব্যপারে কোন আপত্তি করেননি এবং কোন সাহাবীও কোনদিন কোন আপত্তি করেননি৷
অতএব সহজেই বুঝা যায় যে, ২০ রাকাত তারাবীর ব্যাপারে সকল সাহাবীদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৷ যা শরীয়তের একটি শক্তিশালী দলিলও বটে৷ বরং শরীয়ত নিজেই ইজমাকে দলীল হিসেবে সাব্যস্ত করেছে এবং যাদের মাধ্যমে ইজমা সম্পন্ন হয় তাদের ব্যাপারে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে যে, এরা কখনোই গোমরাহীর ব্যাপারে একমত পোষণ করবেনা৷ কুরআনুল কারীমে তো সুস্পষ্টভাবে মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের অনুসরণ করার আদেশও করা হয়েছে৷ হাদীস শরীফে হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, মনে রেখো! আমার পরে তোমরা যারা জীবিত থাকবে তারা বহু মতানৈক্য দেখতে পাবে৷ তখন তোমরা কেবল আমার সুন্নত ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতকে অনুসরণ করবে এবং সকল প্রকার বিদয়া’ত থেকে দুরে থাকবে৷ হাদীসের সনদ সহীহ (সুনানে আবু দাউদ শরীফ ৪৬০৭, ৪৬০৬)
যেহেতু খোলাফায়ে রাশেদীনের ব্যাপারে ওহীর মাধ্যমে হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা জেনেছেন যে, তাদের জারীকৃত সুন্নতসমূহ নববী শিক্ষার ভিত্তিতেই হবে, তাদের সুন্নত নবীর সুন্নতের অনুগামী ও আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি মোতাবেক-ই হবে৷
তাই হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে ব্যাপকভাবে ঘোষণা দিয়ে যান যে, তোমরা খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতকে মজবুতভাবে আকড়ে রাখবে৷ সুতরাং যখন কোন বিষয়ে প্রমাণ হবে যে, এটি চার খলিফার কোন এক জনের সুন্নত,
তখন তার অনুসরণের জন্য হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরোক্ত নির্দেশনা-ই যথেষ্ট৷ (আহকামুস সিয়াম ২৬ পৃষ্ঠা)

২০ রাকাত তারাবীহের নামাজের ব্যাপারে সমস্ত সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমত পোষণ করার ব্যাপারে কিছু প্রমাণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো,
১. মোল্লা আলী কারী (রহঃ) মিরকাত ৩/৪২৬ এ উল্লেখ করেন,
اجمع الصحابة على ان التراويح عشرون ركعة.
তারাবীহের নামায বিশ রাকআত , এর উপর সকল সাহাবায়ে কেরামের ইজমা অর্থাৎ ঐক্যমত্য সংঘটিত হয়েছে।
২. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন,
“فراي كثير من العلماء ان ذلك (عشرين ركعة) هو السنه لانه اقامه بين المهاجرين والانصار ولم ينكر أحد”
অসংখ্য আলেম এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে এটিই সুন্নত। কেননা ইবনে কা’ব (রাযিঃ) মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের মধ্যে বিশ রাকাত পড়িয়েছেন, আর কোনো একজনও তাতে আপত্তি করেননি ।
(মাজমুআতুল ফাতাওয়া , ইবনে তাইমিয়া ২৩/১১২-১১৩)
৩. হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি:) থেকে মারফু হাদীস,
“عن ابن عباس رضي الله تعالى عنهما ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يصلي في رمضان عشرين ركعة و الوتر”
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবীহ ও বিতর পড়তেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ৫/ ২২৫ হাদীস নম্বর ৭৭৭৪)
৪. সাহাবায়ে কেরামের ২০ রাকাতের উপর ঐক্যমত পোষণ করার পর থেকে মক্কা ও মদিনায় ধারাবাহিকভাবেই ২০ রাকাত তারাবীহের নামাযের জামাত চলে আসছে। ১২৪৬ হিজরীতে লা-মাযহাবীরা সৃষ্টি হওয়ার আগে এই ইজমার বিরুদ্ধে কখনো কেহই কোনো মন্তব্য করেননি । করা সম্ভবও নয় ।
কারণ, ইজমা অমান্যকারীদের শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
ومن يشاقق الرسول من بعد ماتبين له الهدى ويتبع غير سبيل المؤمنين نوله ما تولى ونصله جهنم وساءت مصيرا.
আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস!
(সূরা নিসা , আয়াত ১১৫)
সাহাবায়ে কেরামের ইজমার চেয়ে বেশি গুরুত্ববহ ও শক্তিশালী উম্মতের আর কোন ইজমা হতে পারে ? অবশ্যই না।
আরও পড়ুন: আযানের জবাব দেওয়া কি? ওয়াজিব না কি মুস্তাহাব
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়া’তের তারাবীহ ২০ রাকাত-ই ছিল।
হযরত উমর (রাযিঃ) এর আমল হতে দীর্ঘ ১২ শত বছর পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীজুড়ে ২০ রাকাত তারাবীহের প্রচলন ছিল৷ দীর্ঘ এ সময়ের মধ্যে ২০ রাকাত তারাবীহের ব্যাপারে কেউ কোন প্রকার দ্বিমত পোষণ করেননি৷ সুতরাং প্রমানিত হলো যে, দীর্ঘ ১২ শত বছর পর্যন্ত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়া’তের সকলেই ২০ রাকাত তারাবীহ পড়েছেন৷
বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দীস হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দীসে দেহলবী (রহঃ) বলেছেন যে, বর্তমানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়া’ত চার মাযহাবে সীমাবদ্ধ। চার মাযহাবের বাহিরে কেউ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়া’ত নয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়া’তের পরিচিতিঃ
১৷ হানাফী মাযহাব৷
২৷ মালেকী মাযহাব৷
৩৷ শাফেয়ী মাযহাব৷
৪৷ হাম্বলী মাযহাব৷
(ফাতাওয়া কাজীখান ১/১১২, শরহে মিশকাত- মিরকাত ৩/১৯৪, ইতহাফু সাদাতিল মুত্তাকীন ৩/৪২২)
চার মাযহাবের তারাবীহ ২০ রাকাত
হানাফী মাযহাবের তারাবীহ ২০ রাকাত।
হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে তারাবীহের নামায ২০ রাকাত৷ (ফাতাওয়া কাজীখান ১/১১২)
মালেকী মাযহাবের তারাবীহ ২০ রাকাত।
মালেকী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক (রহঃ) মতে তারাবীহের নামায ২০ রাকাত৷ (হেদায়াতুল মুজতাহিদ ১/১৬৭)
শাফেয়ী মযহাবের তারাবীহ ২০ রাকাত।
শাফেয়ী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এর মতে তারাবীহের নামায ২০ রাকাত৷ (আল-মুগনী ২/১৬৭)
হাম্বলী মাযহাবের তারাবীহ ২০ রাকাত।
হাম্বলী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) এর মতে তারাবীহ নামায ২০ রাকাত৷ (আল-মুগনী ২/১৬৭)
৮ রাকাত তারাবীহের সর্ব প্রথম বিদয়া’তের সূচনা
প্রচলিত আহলে হাদীস নামক বাতিল ফিরকার আবিস্কার মতে তারাবীহের নামায ৮ রাকাত৷ সর্বপ্রথম ১২৮৪ হিজরীতে ভারতের আকবরাবাদ থেকে এক আহলে হাদীস (লা-মাযহাবী মৌলভী সাহেব) ৮ রাকাত তারাবীহের ফতোয়া প্রদান করেন।
এরপর ১২৮৫ হিজরীতে পাঞ্জাব সীমান্তে প্রসিদ্ধ গায়রে মুকাল্লিদ ভন্ড ও প্রতারক শায়েখ মুহাম্মাদ হুসাইন বিটালভী ফতোয়া দিল যে, ৮ রাকাত তারাবীহ পড়া সুন্নত৷ আর ২০ রাকাত তারাবীহ পড়া বিদয়া’ত৷ সে সুন্নতকে বিদয়া’ত আর বিদয়া’তকে সুন্নাত বলে ফতোয়া দিল৷
কিন্তু তৎকালীন প্রাজ্ঞ হক্কানী উলামায়ে কেরামগণ তার এ ফতোয়াকে ভুল হিসেবে প্রমাণিত করেন এবং ৮ রাকাত তারাবীহ নামক বিদয়া’তকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ২০ রাকাত তারাবীহের সুন্নত আমলকে অব্যহত রাখেন।
অতপর ১৩৭৭ হিজরীতে আরবে প্রসিদ্ধ দুই লা-মাযহাবী ও প্রতারক শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী ও শায়েখ নসীব রেফায়ী ৮ রাকাত তারাবীহের মত প্রকাশ করেন। তখন শায়েখ আতিয়্যা সালিমসহ আরবের জমহুর উলামায়ে কেরামগণ তাদের উক্ত রায়কে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সাহাবায়ে কেরাম (রাযিঃ) এর যুগ থেকে চলে আসা ২০ রাকাত তারাবীহের আমলকে অব্যহত রাখেন।
যা আজো অব্যাহত রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ!! (আহকামুস সিয়াম ২৫ পৃষ্ঠা)
আহলে হাদীস নামক বাতিল ফিরকাদের ৮ রাকাত তারাবীহ সাব্যস্ত করার ব্যাপারে ব্যর্থ দলীল।
মুলত তারাবীহের নামায ৮ রাকাত সাব্যস্ত করার ব্যাপারে এটাই ওনাদের মূল দলীল।
প্রথমে আমি তাদের হাদীসটি উল্লেখ করবো তারপর হাদীসের প্রত্যেকটি শব্দ দিয়ে বুঝিয়ে দিব যে এটি মুলত তারাবীহের হাদীস নয় বরং তাহাজ্জুদের হাদীস, আর এই তাহাজ্জুদের হাদীস দিয়ে-ই তারা মুলত তারাবীহের নামায ৮ রাকাত সাব্যস্ত করার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তাদের দলীল হলোঃ-
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَنَّهُ سَأَلَ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ كَيْفَ كَانَتْ صَلاَةُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي رَمَضَانَ فَقَالَتْ مَا كَانَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ، وَلاَ فِي غَيْرِهَ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يصلى أربعا فلا تسأل عن حسنهن وطولهن ثم يصلى أربعا فلا تسأل عن حسنهن وطولهن ثم يصلى ثلاثا فقلت يا رسول الله أتنام قبل أن توتر قال يا عائشة إن عيني تنامان ولا ينام قلبى
হযরত আবূ সালামা ইবনে আবদুর রহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) কে জিজ্ঞেস করেন যে, রমযানে হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামায কেমন হত?
(কত রাকাত হত তা জিজ্ঞেস করেননি বরং কেমন হত তা জিজ্ঞেস করেছেন, অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাজের ধরন কেমন হত তা জানতে চেয়েছেন) উত্তরে আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযান ও অন্য মাসে (বাকী ১১ মাস) ১১ রাকাতের বেশী নামায আদায় করতেন না৷
(কীভাবে পড়তেন আগে তার বর্ণনা দিচ্ছেন যে) প্রথমে ৪ রাকাত পড়তেন, অতএব (এরপরে) তুমি আর জিজ্ঞেস করবে না যে এই নামাজটি কত সুন্দর হত এবং কত লম্বা হত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপরে আবারো ৪ রাকাত পড়তেন। অতএব (এরপরে) তুমি আর জিজ্ঞেস করবে না যে এই নামাজটি কত সুন্দর হত এবং কত লম্বা হত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপরে ৩ রাকাত পড়তেন। হযরতে আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) বলেন, ‘আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম যে, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিতরের নামাজ পড়ার পূর্বেই ঘুমিয়ে পড়ছেন(!!!)?’ তখন উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা! ‘আমার চক্ষুদ্বয় ঘুমায় কিন্তু আমার চক্ষুদ্বয় ঘুমায় না।

এই হাদীসটি হলো মুলত তাহাজ্জুদের হাদীস, তারাবীহের হাদিস নয়। কিন্তু আহলে হাদীস ভাইয়েরা এই হাদীসটি দিয়ে ৮ রাকাত তারাবীহ সাব্যস্ত করার জন্য এক ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। আর এই হাদীসের প্রত্যেকটি শব্দ দিয়ে বুঝিয়ে দিব যে এই হাদীসটি হলো মুলত তাহাজ্জুদের হাদীস, তারাবীহের হাদীস নয়।
১. এই হাদীসটি বড় বড় মুহাদ্দিসীনে কেরাম তাদের সংকলিত হাদীসের কিতাবের তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে উল্লেখ করেন, তারাবীহতে নয়। তাহলে বুঝা গেল মুহাদ্দিসীনে কেরামের দৃষ্টিতেও হাদীসটি তাহাজ্জুদের, তারাবীহের নয়।
২. হাদীসের মধ্যে, “في رمضان ولا في غيره” এই বাক্যটি উল্লেখ আছে, অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান এবং রমজানের বাহিরে বাকী ১১ মাস এই ১১ এগার রাকাত নামাজ আদায় করেছেন। তো এই হাদীসটি যদি তারাবীহের হাদীস হয় তাহলে নিশ্চয়ই তারাবীহ নামাজ পুরো বারো মাস পড়তে হবে।
(আহলে হাদীস ভাইদের ভাষ্যমতে) তাহলে এখন আহলে হাদীস ভাইদের কাছে আমার প্রশ্ন হলো, যেই হাদীস দিয়ে আপনারা তারাবীহের নামাজ ৮ রাকাত সাব্যস্ত করার এক ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন সেই হাদীসে-ই তো ১২ মাসের কথা উল্লেখ আছে। তাহলে আপনারা কেন শুধুমাত্র রমজান মাসেই তারাবীহ পড়েন? বাকী ১১ মাস তারাবীহ কেন পড়েন না? তাহলে আপনারা তো হাদীসের উপরও আমল করেন না।
৩. হযরত আবু সালামা (রাযিঃ) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) এর কাছে জিজ্ঞেস করেছেন যে হুজুরের নামাজ কেমন হত? তো হাদীসের এই বাক্য দ্বারাও বুঝে আসে যে হযরত আবু সালামা (রাযিঃ) প্রশ্নটি করেছেন তাহাজ্জুদের নামাজ সম্পর্কে, তারাবীহের নামাজ সম্পর্কে নয়,
কারণ প্রশ্নটি যদি তারাবীহের নামাজের ব্যাপারে হত তাহলে হযরত আবু সালামা (রাযিঃ) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) এর কাছে জিজ্ঞেস করতেন না বরং সাহাবাদের কাছে জিজ্ঞেস করতেন, কারণ তারাবীহ তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদেই পড়েছেন এবং সাহাবীদের সামনেই পড়েছেন।
আরও পড়ুন: ওরাল সেক্স কি? ওরাল সেক্স কি হারাম
আর হযরত আবু সালামা (রাযিঃ) জিজ্ঞেস করেছেন ঘরে এক মহিলা অর্থাৎ হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) এর কাছে। তাহলে বুঝা গেল প্রশ্নটি তারাবীহের নামাজ সম্পর্কে নয় বরং ঘরে যেই নামাজ পড়া হয় সেটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন।
আর ঘরে তো তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া হয়। অতএব বুঝা গেল হাদীসটি তাহাজ্জুদের হাদীস, তারাবীহের হাদীস নয়।
৪. এই হাদীসের মধ্যে আছে, “ثم يصلى ثلاثا” অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৩ রাকাত পড়তেন। অর্থাৎ ৩ রাকাত বিতর পড়তেন। এখানে আহলে হাদীস ভাইদের কাছে আমার প্রশ্ন হলো, যেই হাদীস দিয়ে আপনারা তারাবীহের নামাজ ৮ রাকাত সাব্যস্ত করার এক ব্যর্থ চেষ্টা করছেন সেই হাদীসেই তো আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের নামাজ ৩ রাকাত পড়তেন। তাহলে আপনারা কেন বিতরের নামাজ ১ রাকাত পড়েন? ৩ রাকাত কেন পড়েন না? তো আপনারা তো হাদীসের উপরও আমল করেন না।
৫. হাদীসের আরেকটি বাক্য হলো,
“فقلت يا رسول الله أتنام قبل أن توتر”
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) বলেন, আমি বল্লাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিতরের পূর্বেই ঘুমিয়ে পড়ছেন? এই বাক্যের দ্বারাও বুঝে আসে হাদীসটি তাহাজ্জুদের হাদীস, তারাবীহের হাদীস নয়। কারণ যদি এটা তারাবীহের হাদীস-ই হত, আর তারাবীহ তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদেই পড়েছেন এবং পুরুষ অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামদের সামনেই পড়েছেন, তাহলে এটা কি কখনো সম্ভব যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবীহের নামাজ আদায় করে মসজিদে ঘুমিয়ে যাবেন আর সাহাবায়ে কেরামদেরকে বিতরের জন্য বসিয়ে রাখবেন?
আর পর্দার বিধান ভঙ্গ করে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) পুরুষ অর্থাৎ সাহাবীদের সামনে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বলবেন যে “أتنام قبل أن توتر” এই কথাটা কি তাদের ব্যাপারে মানায়? অবশ্যই না, তাহলে বুঝা গেল এটা তাহাজ্জুদের হাদীস, তারাবীহের হাদীস নয়,
কারণ এটা যদি তারাবীহের হাদীস হত তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে “أتنام قبل أن توتر” এই কথাটি বলার জন্য হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) ঘরে থেকে মসজিদে এসে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন ছিল না, বরং হযরতে সাহাবায়ে কেরামগণ-ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করতেন।
তাছাড়া তারাবীহ আদায় করে বিতরের জন্য সাহাবায়ে কেরামদেরকে অপেক্ষায় রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমিয়ে যাবেন এটা কখনোই হতে পারে না এবং এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানেরও বিপরীত। তারপরও কি আহলে হাদীস ভাইরা বলবেন যে এটি তারাবীহের হাদীস, তাহাজ্জুদের হাদীস নয়?
৬. আহলে হাদীস ভাইদের কাছে আমার আরেকটি প্রশ্ন হলো, আপনাদের এই হাদীসের মধ্যে আছে, “يصلى أربعا” অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একসাথে ৪ রাকাত করে আদায় করতেন। তাহলে আপনারা কেন ২ রাকাত ২ রাকাত করে আদায় করেন? একসাথে ৪ রাকাত করে কেন আদায় করেন না? তাহলে বুঝা গেল আপনারা তো হাদীসের উপরও আমল করেন না
৭. আহলে হাদীস ভাইদের কাছে আমার আরেকটি প্রশ্ন হলো, আপনারা আরবের উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, আরবরা ৮ রাকাত তারাবীহ পড়ে তাই আপনারাও ৮ রাকাত তারাবীহ পড়বেন, কিন্তু আমরা দেখছি মক্কা এবং মদীনা শরীফে শুরু লগ্ন থেকে আজ অবদি পর্যন্ত ২০ রাকাতই তারাবীহ পড়া হচ্ছে। তো আপনাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন হলো,
আপনাদের নজর কেন শুধুমাত্র আরবের অন্যান্য কান্ট্রির দিকেই যায়? মক্কা এবং মদীনা শরীফের দিকে আপনাদের নজর যায় না কেন? এর আসল রহস্যটা কী?
প্রিয় ভাইয়েরা! আপনারা আমার এই আলোচনা থেকে অবশ্যই বুঝতে পেরেছেন যে, আহলে হাদীস ভাইদের কাছে হাদীস কোন বিষয় নয়, বরং ওনারা হাদীসের অপব্যাখ্যা করে নিজেদেরর মনগড়া মতামতকে হাদীসের নামে চালিয়ে দিচ্ছে, কারণ আপনারা অবশ্যই লক্ষ করেছেন যে, যেই হাদীস দিয়ে ওনারা তারাবীহের নামাজ ৮ রাকাত সাব্যস্ত করার এক ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন।
আমি আপনাদের সামনে ঠিক তাদের ঐ হাদীসের প্রত্যেকটি শব্দ দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছি যে, তারা নিজেরাই ঐ হাদীসের কোন শদের উপরও আমল করে না। তাহলে এবার বলুন! আসলেই কি তারা হাদীসের উপর আমল করে? এর উত্তর এখন আর আমার দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং এর উত্তর এখন আপনারাই দিতে পারবেন ইনশা-আল্লাহ। কারণ আপনারা জেনেই গিয়েছেন যে, ওনারা হাদীসের উপর আমল তো দূরের কথা বরং হাদীসের “হ” শব্দটিও বলতে পারবে না। তাহলে বুঝে থাকলে বলুন! মাজহাব মানা জরুরী কি জরুরী না? উত্তরে অবশ্যই জরুরী বলবেন। কারণ মাজহাব না মানলে তো আহলে হাদীস ভাইদের মত হাদীসের অপব্যাখ্যা করতে হবে।
অতএব ৮ রাকাত তারাবীহ পড়ার মতকে গ্রহণ করার অর্থ হলো সাহাবী ও তাবেয়ীগণের অনুসৃত আমলকে প্রত্যাখ্যান করে নব্যসৃষ্ট বিদআতী দলের অনুসরণ করা। অথচ এরুপ নব-আবিষ্কৃত বিদয়া’ত সম্পর্কে হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায় ১৫ শত বছর পুর্বেই উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন যে,
তোমরা (নব-আবিষ্কৃত) বিদয়া’ত থেকে খুব সতর্কতার সঙ্গে বেঁচে থাকবে৷ কেননা প্রতিটি নব আবিষ্কৃতই
বিদয়া’ত৷ আর প্রতিটি বিদয়া’ত হলো গোমরাহী৷ আর প্রতিটি গোমরাহী জাহান্নামে যাবে৷ (আবু দাউদ শরীফ ৪৬০৭, ৪৬০৬)
প্রিয় পাঠক,
সহীহ হাদিসের আলোকে তারাবির নামায কত রাকাত
প্রবন্ধটি পড়ার পর আশা করছি আপনার মনের যাবতীয় সন্দেহ দূর হয়েছে যে, তারাবিহ কত রাকাত? লেখাটি ভাল লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন।



