সুফফাহ মাদ্রাসার পরিচিতি
সকল প্রশংসা জগৎ সমুহের প্রতি পালক মহান আল্লাহ তায়ালার, যিনি আখেরী নবী দোজাহানের সরদার নবীকুল শিরোমনি হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সাঃ) এর উম্মত হিসাবে কবুল করে তাওহীদ ও দ্বীনের সহীহ বুঝ দান করে সর্বাধিক সৌভাগ্যবান করেছেন, অগনিত দরুদ ও সালাম সেই মহান রাসুল (সাঃ)এর উপর তার পরিবার বর্গ ও সকল সাহাবায়ে কেরামের উপর। প্রিয় নবীজী আগমন করেছেন বিশ্ববাসির জন্য শিক্ষক হিসাবে, যেমন রাসুল (সাঃ) বলেন আমি শিক্ষক হিসাবে প্রেরিত হয়েছি, কোরআনুল কারীমের প্রথম যে আয়াত টি রাসুল (সাঃ) এর উপর অবতির্ণ হয়েছে তা ছিল “পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন”।

প্রিয় নবীজী মক্কায় তের বৎসর দ্বীন প্রচারের পর আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মদীনায় হিজরত করেন।সৃষ্টির উদ্দেশ্যপুরনার্থেতথা আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের জন্য মদীনায় রাসূল(সাঃ)মসজিদ নির্মান করেন। যা মসজিদে নববী নামে পরিচিত।এই মসজিদে নববী হতে পরিচালিত হতো ইসলামেরসকল র্কাযক্রম।মদিনায় আগমনের পর দলে দলে মানুষনববী আর্দশে অনুপ্রানিত হয়ে ইসলামের সুশীতল শান্তিময় ছায়াতলে আশ্রয় নিতে লাগলো।
রাসুল(সাঃ) এই নবীন মুসলমানদের কে সর্ব প্রথম দ্বীন শিক্ষা দিতেন। সাহাবায়ে কেরাম থেকে বেশ কিছু সাহাবী (রাঃ)রাসুল(সাঃ)এর মুখ নিঃসৃত বাণী শ্রবন তথা ইলমে ওহীর জ্ঞান অর্জনের জন্য এতটাই পাগলপারা ছিলেন যে,তারা সর্বদাই মসজিদে নববীতে নবীজির সাথে থাকতেন তাদেরকেই ইসলামী পরিভাষায় “আহলে সুফফাহ”বলা হত।
এই আহলে সুফফাহর সদস্য সংখ্যা কখনো ষাট বা তার চেয়ে ও অধীক হত। আহলে সুফফাহ নাম টি শুনলেই মনে পড়ে দ্বীনের জন্য নিবেদিত প্রান সাহাবায়ে কেরামের একটি জামাতের কথা যারা ছিলেন দুনিয়া ত্যাগি এমন কি খাওয়া দাওয়া ও অন্যান্য দুনিয়াবী আসবাবের প্রতিও তারা ছিলেন একে বারেই বে-পরওয়া।তারা সর্বদা মসজিদে নববীতেই থাকতেন তাদের খাবারের দায়িত্ব ও নিয়ে ছিলেন নবীজী (সাঃ)। মোট কথা এলেম অর্জন ও দ্বীনের খেদমত ছাড়া ভিন্ন কোন চিন্তা তাদের ছিলো না ।তারা ছিলেন বহুবিধ বৈশিষ্টের অধীকারী।স্বল্প পরিসরে যার আলোচনা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুনঃ আহলে হাদিস বনাম হানাফী মাযহাব
যখনই কোথাও দ্বীনী তালিমের জন্য শিক্ষকের প্রয়োজন হতো তখন রাসুল(সাঃ) আহলে সুফ্ফাহ থেকে শিক্ষক নির্বাচন করে সেখানে পাঠাতেন। সেই আত্বত্যাগি দ্বীনের জন্য নিবেদিত প্রান রাসুল (সাঃ) প্রেমিক মহান আদর্শের অধীকারী আহলে সুফ্ফার জামাত এখন নেই তবে তাদের আদর্শে অনুপ্রানিত তাদের পদাঙ্ক অনুসরনকারী মুত্তাকী ওলামায়ে কেরাম এখনো আছে কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা তাদের কে টিকিয়ে রাখবেন ইনশাআল্লাহ।
এই মহান আহলে সুফ্ফার নমুনায় ইলমে ওহীর প্রচার প্রসার ও দ্বীনের হিফাজতের লক্ষ্যে প্রায় ১৫০বৎসর পূর্বে ভারত উপমহাদেশের আহলে সুফফার উত্তরসুরীরা গড়ে তুলে ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দ।আমাদের দেশের প্রচলিত কওমী মাদরাসা সমুহ সেই দেওবন্দের-ই শাখা প্রশাখা।সুফ্ফাহ মাদরাসা সে শাখা সমুহেরই অন্যতম একটি অংশ বিশেষ।
একনজরে সুফফাহ মাদ্রাসাঃ পরিচিতি ও অবস্থান
ঝিনাইদহ জেলার অর্ন্তগত বাংলাদেশের ১ম স্তরের পৌরসভা (১৮৬৯খৃঃ)মহেশপুরস্থ জলিলপুরে প্রায় এক একর জায়গার উপর অবস্থিত। ২০০৯ ইং এর সেপ্টেম্বর থেকে অস্থায়ী ভাবে ভাড়ার উপর আরম্ভ করে আলহাজ্ব ডাঃ আঃ রহীম সাহেব কর্তৃক দান কৃত জায়গার উপরে ২০১৩ইং সাল থেকে এলাকাবাসী ও মুহিব্বিন গণের সহযোগিতায় মুফতী ফয়জুল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে পুর্নোদ্যমে নির্মাণ কার্য শুরু হয়।এবং ২০১৪ ইং সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ৬তারিখ রবিবার নিজস্ব জমিতে স্থানান্তরিত হয়।
আদর্শঃ সুফফাহ মাদরাসা বিশ্ববিখ্যাত মাদারে ইলমী দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাসভুক্ত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শ ভিত্তিক বৃহত্তর একটি দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
লক্ষ-উদ্দেশ্য
১. ইলমে দ্বীনের হেফাজত ও ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে আহকামে খোদাওয়ান্দী ও সুন্নাতে নববী প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিয়ম তান্ত্রিক তালিম ও তারবিয়াতের মাধ্যমে হক্কানী আলেম তৈরি করতঃ বিশেষ প্রশিক্ষনের মাধ্যমে দেশ ও জাতির খেদমতের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা।
২. আক্বায়েদে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও ফিক্বহে হানাফির সংরক্ষন এবং দেওবন্দি সিলসিলায় তালিম তারবিয়াতের যথাযথ বাস্তবায়ন করা।
৩. ইসলাম বিদ্বেষী খোদাদ্রোহিদের নিয়মতান্ত্রিক মোকাবেলা পুর্বক সমাজ থেকে নাস্তিক্যবাদ ও র্শিক বিদআতের মুলোৎপাটনের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা ও সর্বস্তরে ইসলামী শিক্ষা পৌঁছে দিয়ে ইসলামী সমাজ ব্যাবস্থার প্রবর্তন করা।
জামিয়ার শিক্ষাধারাঃ
সুফ্ফাহ মাদ্রাসা গতানুগতিক কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে জামিয়া সাজিয়েছেতার পাঠদান পদ্ধতি। শিশু শ্রেণী থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দাওরায়ে হাদীস, ইসলামের ইতিহাস, আরবী ও বাংলা সাহিত্য সহ নানা মুখি পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন করে চতুর্মূখি যোগ্যতা সম্পন্ন বিচক্ষণ আলেমে দ্বীন জাতিকে উপহার দেয়ার লক্ষে ব্যাপক কর্ম সূচী গ্রহন করেছে।
সুবিন্যস্ত সিলেবাসের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে মৌলিক ভাবে কোরআন, হাদীস, ফিক্বহ, তাফসির ,উসুল ,আক্বাইদ, বৈষ্যয়িক পর্যায়ে আরবী সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, ব্যাকরন,নাহু ,সরফ, বালাগাত সহ বাংলা, ইংরেজী, গণিত, ইতিহাস, বিজ্ঞান,ভুগোল, দর্শন ইত্যাদি সমুদয় বিষয় প্রয়োজন পরিমান শিক্ষা দেওয়া হয়।শিক্ষার পাশাপাশি জনসমাজে ইসলামি শিক্ষার সুফল পৌঁছে দেয়ার মহান লক্ষ্যে জামিয়া বিভিন্ন সময় নানামুখি কর্মসুচী গ্রহন করে থাকে।সব মিলিয়ে সুফফাহ মাদরাসা বহু বিভাগ সমন্বিত একটি মহা প্রকল্প।

জামিয়ার শিক্ষা প্রকল্পঃ
১. নূরানী বিভাগঃ মাত্র তিন বছরের কোর্সে সহীহ শুদ্ধভাবে সম্পুর্ন কুরআন শরীফ তিলাওয়াত ৬০টি হাদীস অর্থসহ মুখস্থ, ওজু গোসল ও নামাজের মাসায়েল (ঈদ জুমআ ও জানাজা)সমুহ মুখস্থের পাশাপাশি প্রাথমিক বাংলা,অংক,ইংরেজী শিক্ষা দেয়া হয়।
২. কিতাব বিভাগঃ এটি জামিয়ার শিক্ষা ব্যাবস্থাপনায় সর্বাধীক সমৃদ্ধ বৃহত্তর ও প্রধান বিভাগ এবিভাগেই তৈরি হয় জাতির কান্ডারি আধ্যাত্বিক রাহবার দ্বীনী শিক্ষারক্রমমুল্যায়নের ভিত্তিতে কিতাব বিভাগটি মৌলিক পর্যায়ে ৫টি স্তরে বিভক্ত।
ইবতেদাইয়্যাহ(প্রাথমিক)মুতাওয়াসসিতাহ(মাধ্যমিক)সানুবিয়্যাহউলয়া(উচ্চমাধ্যমিক) ফজিলত (ডিগ্রি) ও তাকমীল (মাষ্টার্স) এ৫টি স্তরে মোট ১২বৎসর সময়ে পুর্ন দ্বীনী শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কে যোগ্য আলেম/আলেমারূপে গড়ে তোলা হয়ও সনদ প্রদান করা হয়।
বিশেষ বিভাগঃ সর্ব স্তরের ব্যক্তিদের জন্য কোরআন শিক্ষার ব্যাবস্থা তথা বয়স্ক ও বয়স্কাদের জন্য ৫ম ৮ম ও ১০ম পরিক্ষার পর ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য কোরআন শিক্ষা কোর্স স্কুল/কলেজ থেকে আগত ছাত্র ও ছাত্রীদের কে বিশেষ ক্লাসের মাধ্যমে কিতাব বিভাগে মিজান জামাতে ভর্তির উপযোগি হিসাবে গড়েতোলা হয়।
আরও পড়ুনঃ নারীর চেহারা সতরের অংশ কি না
জামিয়ার ছাত্র/ছাত্রীদের প্রশিক্ষন কর্মসূচীঃ
দ্বীন ও সমাজের সকল পরিসরে জামিয়ার সন্তানরা যাতে ভুমিকা রাখতে পারে সেজন্য রয়েছে নানামুখি আয়োজন। এসব আয়োজন কে বাস্তবে রুপদানের জন্য মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীদের নিয়ে গঠিত হয় ছাত্র ছাত্রী সংসদযা সুফফাহ ছাত্র কাফেলা/ছাত্রী কাফেলা নামে পরিচিত।তাদের দক্ষ পরিচালনায় সম্পন্ন হয় এ সকল আয়োজন।
ক. ছাত্র/ছাত্রী পাঠাগারঃ জামিয়ার সিলেবাস ভুক্ত পাঠ্য পুস্তকেরপাশাপাশি ছাত্র/ছাত্রীদেরজ্ঞানেরপরিসীমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছানোর লক্ষে সমকালিন অবস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগতির জন্য তথ্য বহুল বই পুস্তক সমৃদ্ধ একটি মানসম্মত পাঠাগার ও রয়েছে এই কাফেলার অধীনে।
খ. বক্তব্য প্রশিক্ষনঃ ইল্ম অর্জনের পর তা সুন্দর সাবলিল ভাবে সাধারন মানুষের দোর গোড়ায় পৌছে দেয়ার লক্ষে ছাত্র/ছাত্রী কাফেলা আয়োজন করে প্রতিযোগিতা মূলক সাপ্তাহিক বক্তৃতা প্রশিক্ষন জলসা
গ. দেয়ালিকাঃ পাশ্চাত্য মুখি বিকৃত রুচির কলম ব্যাবসায়ীদের বিরূদ্ধে ইসলামী সাহিত্যের নির্মল জ্যোতি বিকিরনের মহান লক্ষ নিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের কলম সৈনিক রুপে গড়ে তোলার জন্য বছরে দুইবার নিয়মিত দেয়ালিকা প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

জামিয়ার সেবা প্রকল্পঃ
১. ফতওয়া বিভাগঃ ব্যক্তিগত পারিবারিক সামাজিক ধর্মীয় ওবিভিন্ন ধরনের জটিল সমস্যার সমাধান দক্ষ মুফতী সাহেবগন এই বিভাগ থেকেই দিয়ে থাকে।
২. ফারায়েজ বিভাগঃ মৃত ব্যাক্তির পরিত্যাক্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিসদের মধ্যে শরিয়তের বিধান মুতাবেক সুষ্ঠু বন্টনের রুপ রেখা প্রদান করা হয় এই বিভাগের মাধ্যমে।
সুফ্ফার সফলতাঃ অত্র মাদরাসা টি ব্যাপক ভাবে দ¦ীনের চতুর্মুখি খিদমাত ও কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এর অধীনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় পরীক্ষা সমুহে মেধা তালিকায় সম্মান জনক স্থান লাভ করার মাধ্যমে অত্র অঞ্চলে ব্যাপক ভাবে পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করেছে। আল্লাহ তায়ালা যেন এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। আমীন।
শেষ কথাঃ
মনোরম পরিবেশে বিজ্ঞবিচক্ষন উলামাগনের সার্বিক তত্বাবধানে অভিজ্ঞ শিক্ষক শিক্ষিকা মন্ডলির আন্তরিক প্রচেষ্টায় পরিচালিত এপ্রতিষ্ঠান সাবলিল গতিতে এগিয়ে চলছে তার অভিষ্ট লক্ষ্যপানে।দেশ,জাতি ও দ্বীনের কল্যানে সুফ্ফাহ মাদ্রাসার কর্মকান্ড হোক গতিময় ও সাফল্য মন্ডিত । আমীন।



