এ সপ্তাহের জুমার বয়ান: Mufti Rejaul karim
মুমিনের আত্মশুদ্ধি ও মহান আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার উপায়
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আজকের জুমার এই বরকতময় মজলিসে উপস্থিত দ্বীনি ভাইগণ! মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি যে, তিনি আমাদের সুস্থ শরীরে তাঁর ঘরে আসার তৌফিক দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের সতর্ক করে ইরশাদ করেছেন:
“আর আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, কারণ উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে।” (সূরা আদ-দারিয়াত: ৫৫)
আজকের খুতবায় আমরা এমন কিছু স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা করব যা আমাদের চিরচেনা সমাজ ও দৈনন্দিন অভ্যাসের সাথে জড়িত। অনেক সময় আমরা মনে করি আমাদের আমলগুলো হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু কিছু মারাত্মক ভুলের কারণে আমাদের ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল নাও হতে পারে। আজ আমরা সেই তিনটি ভয়াবহ পাপ নিয়ে কথা বলব, যেগুলোর ব্যাপারে নবীজি (সা.) আমাদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
১. পোশাকের অহংকার: টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান (ইসবাল)
সম্মানিত মুসল্লিগণ! আমাদের অনেক ভাইকেই দেখা যায় শখের বসে বা স্টাইল করার জন্য প্যান্ট বা লুঙ্গি টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরেন। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
“তিন শ্রেণির মানুষের সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে দয়ার দৃষ্টিতে তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।”
এই তিনজনের প্রথম জন হলেন— ‘আল-মুসবিল’ বা যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পড়ে।
হয়তো আপনি ভাবছেন, “আমি তো অহংকার করে পরছি না।” কিন্তু প্রিয় ভাই! নবীজি (সা.)-এর সুন্নতের বরখেলাপ করে কাপড় ঝুলিয়ে পরাটাই হলো অহংকারের উৎস। আমাদের পূর্বসূরীরা এই সুন্নতের প্রতি কতটা আপসহীন ছিলেন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো হযরত উমর (রা.)-এর অন্তিম মুহূর্তের উপদেশ।
মৃত্যুর তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও যখন এক যুবককে উমর (রা.) বিদায় দিচ্ছিলেন, তখন দেখলেন যুবকের কাপড় টাখনুর নিচে। উমর (রা.) তাকে ডেকে বললেন, “ভাতিজা! তোমার কাপড় উপরে তোলো। এতে তোমার কাপড় পরিষ্কার থাকবে আর তোমার রবের কাছে অধিক তাকওয়া প্রকাশ পাবে।” সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর যন্ত্রণার মধ্যেও উমর (রা.) এই সুন্নতের কথা ভুলে যাননি। অথচ আজ আমরা সুস্থ অবস্থায়ও অবহেলা করছি। মনে রাখবেন, টাখনুর নিচের অংশ জাহান্নামের আগুন দ্বারা পুড়বে। আরো পড়ুন: জানাজা নামাজের নিয়ম ও সূরা ফাতিহা পড়া
২. দানে খোঁটা দেওয়া: আমল বিনাশী এক মরণব্যাধি
মুসল্লি ভাইগণ! দান করা একটি মহান ইবাদত। কিন্তু দান করার পর যদি আমরা আমাদের ব্যবহার দিয়ে গ্রহীতাকে ছোট করি, তবে সেই দান আল্লাহর কাছে কোনো মর্যাদা পায় না। হাদিসে বর্ণিত দ্বিতীয় সেই হতভাগ্য ব্যক্তি হলো— ‘আল-মান্নান’ বা যে ব্যক্তি দান করে খোঁটা দেয়।
আল্লাহ সূরা বাকারার ২৬৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন, খোঁটা দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে বাতিল বা ধ্বংস করো না।
ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.)-এর সেই ১০০ পরিবারের ঘটনা: ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) মদিনার ১০০টি অভাবী পরিবারকে রাতের অন্ধকারে খাবার পৌঁছে দিতেন। পরিবারের লোক জানত না দাতা কে। তিনি যখন ইন্তেকাল করলেন, তখন সেই খাবার আসা বন্ধ হয়ে গেল। মানুষ তখন বুঝতে পারল কাজটা কে করত। তাঁর লাশ যখন গোসল দেওয়া হচ্ছিল, দেখা গেল তাঁর পিঠে চটের বস্তা টানার কালো দাগ।
তিনি চেয়েছিলেন তাঁর দান থাকুক একমাত্র আল্লাহর জন্য। আর আমরা সামান্য সাহায্য করে মানুষের সম্মান নিয়ে টানাটানি করি। প্রিয় ভাই! এই এক কথায় আপনার সারাজীবনের দান ছাই হয়ে যেতে পারে। সাবধান হোন!
এ সপ্তাহের জুমার বয়ান: Mufti Rejaul Karim
ফকীহ ইবনে লায়লা ও একজন সাহায্যপ্রার্থীর ঘটনা
বিখ্যাত আলেম ও ফকীহ ইবনে লায়লার কাছে একবার এক ব্যক্তি এসে কিছু সাহায্য চাইল। তিনি তাকে সাহায্য করার পর কেঁদে ফেললেন। তাঁর ছাত্ররা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি আপনার সম্পদের জন্য কাঁদছেন?”
তিনি উত্তর দিলেন:
“না, আমি কাঁদছি এই ভেবে যে—আমি কি দান করার সময় এমন কোনো আচরণ করেছি যাতে এই ব্যক্তি লজ্জিত হয়েছে? আমার দেওয়া সম্পদটি তো একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আমার কোনো আচরণের কারণে সে যদি মনে কষ্ট পায়, তবে আল্লাহর দরবারে আমার এই দানের কোনো মূল্য থাকবে না।”
৩. ব্যবসায় মিথ্যা শপথ ও প্রতারণা: হারামের বিষবাষ্প
আজকের আলোচনার তৃতীয় বিষয় হলো আমাদের ব্যবসা ও লেনদেন। হাদিসে বর্ণিত তৃতীয় ব্যক্তি হলো— ‘আল-মুনাফফেকু সিলআতাহু বিল হালিল কাযিব’ বা যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি করে।
বিক্রেতা ভাইদের বলছি, সামান্য ৫-১০ টাকা বেশি লাভের জন্য “আল্লাহর কসম” খেয়ে মিথ্যা বলবেন না। রাসুল (সা.) বলেছেন, মিথ্যা শপথ পণ্য বিক্রি করিয়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু ব্যবসার বরকতকে চিরতরে মুছে দেয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সেই ৩০ হাজার দিরহামের নজির: ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) একজন বড় কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। একবার তাঁর দোকানের একটি কাপড়ে সামান্য ত্রুটি ছিল। তাঁর কর্মচারী ভুলবশত ক্রেতাকে সেই ত্রুটি না জানিয়েই কাপড়টি বিক্রি করে দেন। ইমাম সাহেব বিষয়টি জানতে পেরে ক্রেতাকে না পেয়ে সেই চালানের পুরো ৩০ হাজার দিরহাম (যা বর্তমান হিসেবে কয়েক কোটি টাকা) আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, “আমি চাই না আমার উপার্জনে সামান্যতম সন্দেহের ছোঁয়া থাকুক।”
আজ আমরা সামান্য মুনাফার জন্য কতই না মিথ্যা বলি। প্রিয় মুসল্লিগণ! কবরে আপনার এই মিথ্যা মুনাফা কোনো কাজে আসবে না। বরকত আসে সত্যের মাঝে, ধোঁকাবাজিতে নয়।
বর্ণিত ৩০ হাজার দিরহাম বর্তমান সময়ে বাংলাদেশি টাকায় কত হবে, তা সঠিকভাবে রূপান্তর করা কিছুটা জটিল। কারণ সেই সময়ের মুদ্রার মান আর বর্তমানের কাগজের মুদ্রার মান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে দুটি প্রধান পদ্ধতিতে আমরা এর ধারণা নিতে পারি:
১. রুপার ওজনের ভিত্তিতে (সবচেয়ে নির্ভুল পদ্ধতি)
হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রের হিসাব অনুযায়ী, ১ দিরহাম হয় আনুমানিক ২.৯৭৫ গ্রাম রুপা।
-
সেই হিসাবে ৩০,০০০ দিরহাম = $30,000 \times 2.975 = 89,250$ গ্রাম বা ৮৯.২৫ কেজি রুপা।
-
বর্তমানে (২০২৬ সালের বাজার দর অনুযায়ী) প্রতি কেজি রুপার দাম যদি গড়ে ১,২০,০০০ টাকা হয়:
ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে
প্রাচীনকালে ১ দিরহাম দিয়ে অন্তত একটি বা দুটি ছাগল কেনা যেত (সময়ের ব্যবধানে এটি ভিন্ন হতো)। যদি একটি সাধারণ ছাগলের দাম বর্তমানে ১০,০০০ টাকাও ধরা হয়, তবে ৩০,০০০ দিরহামের ক্রয়ক্ষমতা বর্তমানের প্রায় ৩০ কোটি টাকার সমান।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) যে পরিমাণ দান করেছিলেন, তা সেই যুগে একটি বিশাল ব্যবসায়িক পুঁজি ছিল।
ইমাম ইউনুস ইবনে উবাইদ (রহ.) ও রেশমি কাপড়
বিখ্যাত তাবেয়ী এবং ব্যবসায়ী ইউনুস ইবনে উবাইদ-এর একটি ঘটনা কিতাবগুলোতে বর্ণিত আছে:
তাঁর দোকানে বিভিন্ন দামের কাপড় ছিল। একদিন তিনি নামাজের জন্য বাইরে গিয়েছিলেন, দোকানে ছিল তাঁর ভাতিজা। এক বেদুইন ক্রেতা এসে ৪০০ দিরহাম মূল্যের একটি কাপড় দেখতে চাইলেন। ভাতিজা তাকে ২০০ দিরহাম মূল্যের একটি কাপড় ৪০০ দিরহামে বুঝিয়ে দিয়ে বিক্রি করে দিল।
ইউনুস ইবনে উবাইদ ফিরে আসার পথে ঐ বেদুইনকে দেখলেন এবং কাপড়টি চিনতে পারলেন। তিনি তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এটি কত দিয়ে কিনেছেন?” লোকটি বলল, “৪০০ দিরহামে।” ইউনুস (রহ.) বললেন, “কিন্তু এর দাম তো মাত্র ২০০ দিরহাম! আপনি আমার দোকানে চলুন।”
মিথ্যা বলে পণ্য বিক্রির পরিণাম (হাদিসের সতর্কবাণী)
হাদিস শরিফে এই ধরণের কাজের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে বলা হয়েছে:
-
বরকত চলে যাওয়া: রাসুল (সা.) বলেছেন, “ক্রেতা-বিক্রেতা যতক্ষণ বিচ্ছিন্ন না হয়, ততক্ষণ তাদের ইখতিয়ার থাকে (চুক্তি বাতিলের)। যদি তারা সত্য বলে এবং পণ্যের দোষ বর্ণনা করে, তবে তাদের ব্যবসায় বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং দোষ গোপন করে, তবে তাদের ব্যবসার বরকত মুছে ফেলা হয়।” (সহিহ বুখারি)
-
কিয়ামতের দিন হাশর: “মিথ্যা শপথ করে পণ্য চালানো ব্যক্তিদের দিকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।” (সহিহ মুসলিম)

৪. নবীজি (সা.)-এর হিলম বা সহনশীলতা থেকে শিক্ষা
আমাদের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত তার সর্বোত্তম আদর্শ হলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনা আমাদের ধৈর্য শেখায়। একবার এক বেদুঈন এসে নবীজির গলার চাদর ধরে সজোরে টান দিয়েছিল। কিন্তু নবীজি (সা.) ক্রুদ্ধ না হয়ে মুচকি হাসলেন এবং সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন তাকে সাহায্য করার জন্য। ব্যবসায়ী হোন বা সাধারণ মানুষ—আমাদের স্বভাবে এই কোমলতা থাকা জরুরি।
সম্মানিত মুসল্লিগণ! আজকের এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদের পোশাক, আমাদের দান এবং আমাদের উপার্জনকে পবিত্র করা। এই তিনটি পাপে যারা লিপ্ত থাকবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। আমরা কি চাই আল্লাহ আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন? নিশ্চয়ই না।
আসুন, আজ থেকেই আমরা অঙ্গীকার করি—আমরা আমাদের কাপড় টাখনুর উপরে রাখব, দান করে কাউকে ছোট করব না এবং ব্যবসায় কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেব না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের কবুল করুন। আমিন।


