আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত ও সংকীর্ণ মানসিকতা শিকড় গেড়েছে। কোনো আলেম যদি সুন্দর একটি গাড়ি নিয়ে চলেন, উন্নতমানের পোশাক পরেন কিংবা আধুনিক জীবনযাপন করেন, তখন একদল মানুষ বাঁকা চোখে তাকাতে শুরু করেন। সমাজের চোখে ‘আলেম’ মানেই যেন হবে জীর্ণশীর্ণ চেহারা, তালি দেওয়া পোশাক আর অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরশীল এক অবহেলিত সত্তা। যেন ভাঙা সাইকেলে চড়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরাই তাদের ভাগ্যের লিখন!
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দর্শন কি আমরা ইসলাম থেকে পেয়েছি? নাকি এটি আমাদের তৈরি করা এক বৈরাগ্যবাদী অপসংস্কৃতি?
ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কী বলে?
ইসলাম কখনোই দারিদ্র্যকে মহিমান্বিত করেনি, বরং অলসতা ও অন্যের ওপর নির্ভরশীলতাকে নিরুৎসাহিত করেছে। ইসলামের সোনালী যুগের দিকে তাকালে আমরা এমন সব মহামানবদের দেখি, যারা একদিকে ছিলেন ইলমের সাগর, অন্যদিকে ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের সফলতম ব্যবসায়ী।
-
হযরত আবু বকর (রা.): ইসলামের প্রথম খলিফা হওয়ার আগে তিনি ছিলেন কুরাইশদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যবসায়ী। হযরত বেলাল (রা.)-সহ অনেক মজলুম সাহাবীকে যখন তিনি কাফেরদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন, সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ তিনি কোত্থেকে পেয়েছিলেন? তা কি আকাশ থেকে পড়েছিল? না, তা ছিল তাঁর হালাল ব্যবসার উপার্জিত সম্পদ।
-
মা খাদিজা (রা.): রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন নবুওয়াতের কঠিন সময় পার করছিলেন, তখন মা খাদিজা (রা.) তাঁর বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের সমস্ত সম্পদ ইসলামের তরে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। এই অর্থনৈতিক ভিত্তিই দাওয়াতের কাজকে শক্তিশালী করেছিল।
-
হযরত ওসমান (রা.): যার উপাধি ছিল ‘গনি’ বা সম্পদশালী। মদিনার দুর্ভিক্ষে যখন মানুষ পানির জন্য হাহাকার করছিল, তখন তিনি নিজের সম্পদ দিয়ে ইয়াহুদির কাছ থেকে ‘বি’রে রুমা’ কূপ কিনে ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন।
এই ইতিহাস প্রমাণ করে যে, সম্পদ যদি সঠিক হাতে থাকে, তবে তা দ্বীনের জন্য নেয়ামত। তাঁরা বাজার শাসন করেছেন বলেই ইসলামের বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছে।
কেন আজ আলেমদের ময়দানে নামা জরুরি?
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা আজ আলেম সমাজকে শুধু মাদরাসার চার দেয়াল আর মসজিদের কোণায় সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। আমরা মার্কেটপ্লেস, আধুনিক ব্যবসা, এবং টেকনোলজির জগতকে অন্যদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি। ফলাফল কী হয়েছে?
পুরো বিশ্বের অর্থনীতি আজ তাদের দখলে, যাদের কাছে হালাল-হারামের কোনো তোয়াক্কা নেই। আমরা মিম্বর থেকে “সুদ হারাম”, “ঘুষ হারাম” বলে চিৎকার করছি ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন বিকল্প কোনো ‘হালাল ইকোসিস্টেম’ খুঁজছে, তখন তারা তা পাচ্ছে না। আমরা শুধু ওয়াজ করছি, কিন্তু বাস্তব অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করছি না।
আমরা যদি নিজেরা মাঠে না নামি, টেকনোলজি এবং ই-কমার্স সেক্টরে আধিপত্য বিস্তার না করি, তবে সমাজকে একটি পূর্ণাঙ্গ হালাল অর্থব্যবস্থা উপহার দেওয়া কখনোই সম্ভব হবে না। আরো পড়ুন: আলেম সমাজের ব্যবসায় পদার্পণ: একটি ইতিবাচক বিপ্লব ও আগামীর সম্ভাবনা
কওমি অঙ্গনের ভাইদের মেধা ও সম্ভাবনা
কওমি মাদরাসার সিলেবাসে কাফিয়া, শরহে জামি কিংবা ফিকহের অত্যন্ত জটিল সব কিতাব বছরের পর বছর গভীর মনোনিবেশ দিয়ে পড়া হয়। যে মেধা দিয়ে আপনারা ফিকহের সূক্ষ্ম মাসআলাগুলো আয়ত্ত করতে পারেন, সেই মেধা দিয়ে আধুনিক বিশ্বের ডিজিটাল স্কিল (Digital Skills) বা ব্যবসার স্ট্র্যাটেজি শেখা আপনাদের জন্য সামান্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ফ্রিল্যান্সিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, কিংবা ই-কমার্স—এই সেক্টরগুলো আজ অবারিত। আপনারা যদি এই স্কিলগুলো অর্জন করেন, তবে একদিকে যেমন নিজেদের আর্থিক সচ্ছলতা আসবে, অন্যদিকে আপনারা ইসলামের দাওয়াতকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেন প্রয়োজন?
মনে রাখবেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া দ্বীনের কাজ পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনভাবে করা যায় না। যখন একজন আলেমকে তার জীবিকার জন্য অন্যের পকেটের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, তখন অনেক সময় সত্য কথা বলতে গিয়েও তার হাত-পা বাঁধা থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই ওপরের হাত (দাতার হাত) নিচের হাতের (গ্রহীতার হাত) চেয়ে উত্তম।” (সহীহ বুখারী)
অন্যের অনুগ্রহের অপেক্ষায় না থেকে নিজের স্কিল দিয়ে দুনিয়া জয় করুন। আপনার হাতের উপার্জিত সম্পদ দিয়ে দ্বীনের কাজে সহায়তা করুন, এতিমের দায়িত্ব নিন, নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করুন।
আলেমদের প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান
আসুন, আমাদের মাইন্ডসেট বা মানসিকতা পরিবর্তন করি। দুনিয়া কামানো আলেমদের জন্য হারাম নয়, বরং হালাল পথে সম্পদ উপার্জন করে তা দ্বীনের কল্যাণে ব্যয় করা ইবাদত।
১. ডিজিটাল স্কিল অর্জন করুন: গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং বা কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের মতো বিষয়গুলো আয়ত্ত করুন।
২. উদ্যোক্তা হোন: ছোট থেকে শুরু করুন, কিন্তু লক্ষ্য রাখুন অনেক বড়। হালাল ব্যবসার একটি চেইন তৈরি করার চেষ্টা করুন।
৩. টেকনোলজিকে আপন করে নিন: এটি বর্তমান যুগের তলোয়ার। যার হাতে এই তলোয়ার থাকবে, সেই বিশ্ব শাসন করবে।
আমাদের স্লোগান হোক— “ইলম থাকুক বুকে, আর স্কিল থাকুক হাতে।” আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে চাই, যারা দিনের বেলা আইটি ফার্ম বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে আর রাতে তাহাজ্জুদের জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে কাঁদবে। অন্যের পকেটের দিকে তাকিয়ে থাকা বন্ধ করে স্বাবলম্বী হওয়ার শপথ নিন। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী আলেম সমাজই পারবে একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করতে।



