মাহে রমজানের বিদায় ও মুমিনের প্রাপ্তি
শুরুর কথা : আমরা একেবারে মাহে রমজানের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। আজ রমজানের সর্বশেষ জুমা। কয়েকদিন পর আমাদের থেকে বিদায় নিবে পবিত্রতম এ মাস। রহমত, বরকত আর মাগফিরাতের বার্তাবাহী দিনগুলো চোখের পলকেই যেন শেষ হয়ে গেল। এভাবেই একদিন আমাদের দুনিয়ার জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটে যাবে। তাই জীবনের প্রতিটি মুহুর্তকে কাজে লাগাতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: বলতেন,
আফসোস এজন্য হতো যে, আমার হায়াতের একটি দিন ফুরিয়ে গেল কিন্তু আমার আমলের কোন প্রবৃদ্ধি হলো না’। তাই, প্রতিমুহুর্তে আমাদের আমলের প্রবৃদ্ধি ঘটাতে হবে। পবিত্রতম এ মাসের যে কয়টি দিন এখনও বাকি আছে গণিমত মনে করে ইবাদতে লেগে থাকতে হবে। ইচ্ছা থাকলে এই ক’দিনেই নিজেকে বদলে ফেলা সম্ভব। কেননা রমাদানের প্রতিটি মুহুর্তই অনেক দামি। প্রতিটি মুহুর্তই রহমত ও মাগফিরাতের, প্রতিটি মুহুর্তই জাহান্নাম থেকে মুক্তির।
মাগফিরাত মুমিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো, মাগফিরাত বা ক্ষমা। একজন মুমিনের গোটা জীবনের পরম চাওয়া হলো, মাগফিরাত তথা আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা আর আখিরাতে চিরমুক্তি। আল্লাহ যদি কোন বান্দাকে মাফ করে দেন সে চূড়ান্তভাবে সফল। আল্লাহ তায়ালার একটু সন্তুষ্টি মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মুমিনের এরচেয়ে বড় কোন পাওয়া হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,“আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তাই মহাসাফল্য” সূরা তাওবা
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা মুমিনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ, আল্লাহর ক্ষমা এবং তাঁর সন্তুষ্টি ব্যতীত জান্নাতে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাই, মাগফিরাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি মুমিনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। এজন্য মাগফিরাতের দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন “তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও”। সূরা হদীদ ২১
রমজানের প্রতিটি আমল ছিল মাগফিরাতের বার্তাবাহী
মুহতারাম হাযিরীন ! পবিত্র রমাদান মাস পুরোটাই ছিল মাগফিরাতময়। এ মাসের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মুমিনকে মাগফিরাতের মালিক বানানো। এটিই ছিল এমাসের প্রধান আবেদন। এজন্য এ মাসের প্রায় সবগুলো আমলের প্রাপ্তি বা পুরস্কার হিসেবে রাখা হয়েছে মাগফিরাত তথা আল্লাহর পক্ষ হতে ক্ষমা, সন্তুষ্টি ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি। পুরো রামাদান জুরে ছিল মাগফিরাত তথা আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও গোনাহের কাফফারা এবং আখিরাতে মুক্তি লাভের নানা আয়োজন। নি¤েœ আমরা এধরণের কিছু আমল তুলে ধরছি..
১. সিয়াম : রমাদানের মূল আমল হলো, রোযা। আর এর প্রাপ্তি হিসেবে রাখা হয়েছে মাগফিরাত বা ক্ষমা। হাাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন ,
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাদান মাসের রোযা রাখবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” সহিহ বুখারি
অন্য হাদিসে এসেছে, রোযা গোনাহের কাফফরা স্বরূপ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “পাঁচ ওয়াক্ত নামায, এক জুমা থেকে অপর জুমা, এক রমাদান থেকে অপর রমাদান মধ্যবর্তী সময়ের (গোনাহের) কাফফারা হয়ে যাবে যদি কবীরা গোনাহ হতে বেঁচে থাকে।” সহিহ মুসলিম ২৩৩
২. কিয়াম : রমাদানের দ্বিতীয় আমল হলো, কিয়াম তথা তারাবীহের নামায। এর প্রাপ্তি হিসেবেও রাখা ছিল মাগফিরাত ও গোনাহ থেকে মুক্তি লাভ। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি রমাদানে তারাবীহের নামায পড়বে তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”সুনানে তিরমিযি ৮০৮ সহিহ
অপর এক হাদিসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর রমাদানের রোযা ফরয করেছেন, আর আমি কিয়ামুল লাইল (তারাবীহ) এর নামাযকে সুন্নত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাদানের সিয়াম ও কিয়াম আদায় করবে, সে ঐ দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে যেদিন সে মায়ের গর্ভ থেকে সদ্যভূমিষ্ঠ হয়েছিল”। সুনানে নাসায়ী ২৫১৮ যয়িফ
৩. লাইলাতুল কদর : লাইলাতুল কদরে ইবাদতের পুরস্কার হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে মাগফিরাত তথা ক্ষমাকে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “ যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদত করে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হবে। ” সহিহ বুখারি ১৯০১
৪. ইফতার করানো : পবিত্রতম এ মাসে অন্যকে ইফতার করিয়েও সুযোগ ছিল মাগফিরাত লাভ করার। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে তা তার জন্য গোনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে” শুয়াবুল ঈমান ৩৩৩৬ যয়িফ
৫. অধীনস্থদের কাজ হালকা করে দেওয়া : অধীনস্থদের কাজ কমিয়ে দিয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা ও মাগফিরাতের সুযোগ ছিল। হাদিস শরীফে এসেছে, নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি এই মহিমান্বিত মাসে নিজ কর্মচারীদের কাজের বোঝা হালকা করে দিবে আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করবেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। শুয়াবুল ইমান ৩৩৩৬ যয়িফ

৬. তিলাওয়াত : রমাদানে সাধারণত কুরআন তিলাওয়াত বেশি হয়ে থাকে। এটিও মাগফিরাতের বার্তাবাহি। কেননা কুরআন কিয়ামাতে আল্লাহর দরবারে বান্দাদের মাগফেরাতের জন্য সুপারিশ করবে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, “কিয়ামতের দিন রোযা এবং কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, “হে আমার প্রতিপালক! আমি তাকে পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। অত:পর তাদের উভয়ের সুপারিশ গৃহীত হবে।” আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ২০৩৬ সহিহ
৭. লাইলাতুল কদরে রাসূলের শিখানো দোয়া : লাইলাতুল কাদরে রাসূল উম্মতকে মাগফিরাত হাসিলের জন্য বিশেষ দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন। হাদিস শরীফে এসেছে আইশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু কে জিজ্ঞাসা করেন,
“হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তাহলে আপনি কী বলতে বলবেন? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি বলো, ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাকারী, আপনি মাফ করতে পছন্দ করেন, অতএব আপনি আমাকে মাফ করে দেন’ সুনানে তিরমিযী ৩৫১৩ সহিহ
৮. মুমিনের মাগফিরাত কামনায় ফেরেশতাকুল নিয়জিত থাকে : পবিত্রতম এ মাসে রোযাদারদের মাগফিরাত কামনায় ফেরেশাতাগণও নিয়েজিত ছিল। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা বলেন,
“ ফেরেশতাগণ রোযাদারদের জন্য ইফতার পর্যন্ত মাগফিরাতের দোয়া করে” মুসনাদে আহামাদ ৭৯১৭ ৯. আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল : পবিত্রতম এ মাসে দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে মাগফেরাত নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ ছিল। কারণ, রমাদানে রোযাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তিন ধরনের লোকের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। রোযাদার যতক্ষণ না ইফতার করে, সুবিচারক শাসকের দোয়া এবং মজলুমের দোয়া।” সুনানু তিরমিযী ৩৫৮৯ যয়িফ
আরও পড়ুন: রমজানের শেষ দশক ও কিছু আমল
১০. এছাড়াও রমাদানের প্রতি রাতে বিশেষভাবে আল্লাহ তায়ালা অগণিত বান্দাদের মাগফিরাত দিয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে দেন। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা বলেন, “ আল্লাহ তায়ালা প্রতি ইফতারে অসংখ্য লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এবং তা প্রতি রাতেই ”। সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৪৮ সহিহ
মাগফিরাতময় মাসে মাগফিরাত থেকে বঞ্চিত ব্যক্তির পরিণতি
পুরো রমাদান মাস ছিল মাগফিরাত লাভের অপার সুযোগ। এ মাসের প্রতিটি মুহুর্ত আল্লাহ তায়ালার মাগফিরাত প্রাপ্তির। আল্লাহ তায়ালা মুমিনের চির শত্রæ শয়তানকে আবদ্ধ করে, জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত রেখে, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে, হাজারো গোনাহ মাফির ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন এ মাসে। এরপরও যদি কেউ মাগফেরাত হাসিল করতে ব্যর্থ হয়। তাহলে তার ধ্বংস অনিবার্য। তাকে দুনিয়া আখিরাতে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। এ মহান মাসের যেমন ফযিলত অনেক বেশি, তেমনি এ মাসের বেহুরমতির সাজাও অনেক ভয়ংকর। হাদিস শরীফে এসেছে, জাবির রাযি. বলেন,
“এক দিন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীর মিম্বারে আরোহণের সময় প্রথম সিড়িতে পা রেখে বললেন, আমীন। মিম্বারের দ্বিতীয় সিড়িতে পা রেখে আবার বললেন, আমীন। মিম্বারের তৃতীয় সিড়িতে পা রেখে পুনরায় বললেন, আমীন। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন হে আল্লাহর রাসূল আমরা আপনাকে তিনবার আমীন বলতে শুনেছি!
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি যখন প্রথম সিড়িতে পা রাখি তখন আমার নিকট জিবরীল আ. এসে বলল, ধ্বংস হোক ওই ব্যক্তি, যে রমাদান মাস পেল অথচ তার গোনাহ মাফ হলো না। আমি বললাম, আমীন। অত:পর জিবরীল বলল, ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি, যে তার পিতা মাতা উভয়কে বা উভয়ের একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল অথচ তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারলো না। অর্থাৎ পিতা-মাতার সেবা করে সে জান্নাত লাভ করতে পারল না। আমি বললাম, আমীন। অত:পর জিবরীল বলল, ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি,যার সামনে আপনার নাম উচ্চারিত হওয়ার পরও সে আপনার উপর দরূদ পড়েনি। আমি বললাম, আমীন। আল আদাবুল মুফরাদ ৬৪৪ সহীহ
অন্য হাদিসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি, যার নিকট রমাদান মাস এলো অথচ তার গোনাহ মাফ হওয়ার পূর্বেই তা চলে গেল” সুনানে তিরমিযী ৮৫৪৫ সহিহ
অপর বর্ণনায় এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“আমার নিকট জিবরীল আ. এসে বলল, যে রমাদান মাস পেল অথচ তার গোনাহ মাফ হলো না, সে জাহান্নামে প্রবেশ করুক, আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হোক। আমি বললাম আমিন। ” সহিহ ইবনে হিব্বান ৯০৭ হাসান
রমজানের শেষ মুহুর্তে বিশেষ তিনটি আমল
১. মাগফিরাত হাসিল করার জন্য শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া : রমাদানে এতো সুযোগ দেওয়ার পরও যদি আমরা মাগফিরাত লাভে ব্যর্থ হই, তাহলে আর এমন কোন্ সময় আছে যখন আমারা মাগফেরাত লাভ করে ফেলবো ? এটি মাহরুমির বড় একটি আলামত হয়ে যাবে। পরবর্তীতে মাগফিরাত পাওয়া অনেকটা দুষ্কর হয়ে পড়বে। কাতাদাহ রাযি.থেকে সাঈদ রাহি. বর্ণনা করেন,
“ওই সময় বলা হত, যাকে রমাদানে ক্ষমা করা হয় না তাকে অন্য মাসেও ক্ষমা করা হবে না”। লাতাইফুল মাআরিফ ২১১ তাই, যেকোন মূল্যে রমাদান শেষ হওয়ার আগেই মাফ নিয়ে নিতে হবে। এখনো সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যায়নি। রমাদানের আরো কয়েকদিন এখনো বাকি আছে। এখনো লাইলাতুল কদর হওয়ার মতো দুই রাত আমাদের সামনে আছে। ইচ্ছা থাকলে আমরা ক্ষমা প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবো।
রমজানের আখেরি লামহাতেও যেন থাকে ইসতেগফার : শেষ সময়টা যেন ইসতেগফারের মাধ্যমে কাটে সেদিকে বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে। কারণ, ইসতেগফার সব ভালো কাজের সুন্দর পরিসমাপ্তি। এজন্য আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবুওয়াতির যিম্মাদারী পালন পূর্ণ করার পর ইসতেগফার পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যখন আল্লাহ সাহায্য ও বিজয় আসবে। তুমি মানুষকে দেখবে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করছে, তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল” সূরা নাস্র ১-৩
অনুরূপভাবে হজের বিধান পালনের পর পবিত্র কুরআনে ইসতেগফার পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চই আল্লাহ তায়ালা অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” সূরা বাকারা ১৯৯
তাই, রমাদানের শেষ দিকে এসে আমাদের বিশেষ আমল হলো,বেশি বেশি ইসতেগফার পড়া । এমনকি রমাদানের ইখতেতাম তথা একেবারে শেষ সময়টাও যেন ইসতেগফারের মাধ্যমে অতিবাহিত হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। ওমর বিন আব্দুল আযীয রাহি. সম্পর্কে বর্ণিত আছে,
“তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই বলে ফরমান জারি করে পত্র পাঠাতেন, যেন সকলেই রমাদান মাসের ইখতেতাম করে ইসতেগফারের মাধ্যমে”। লাতাইফুল মাআরিফ ২১৪
২. রমাদানের যাবতীয় আমল আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল করানো : এই মুহুর্তে আমাদের বিশেষ আরেকটি কাজ হচ্ছে, আমাদের সিয়াম, কিয়াম, তিলাওয়াতসহ রমাদানের যাবতীয় আমলগুলো আল্লাহ তায়ালার কাছে কবুল করানো। এজন্য আমাদের উচিত হবে তাকওয়া অবলম্বন করা। কারণ, আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের আমলকে গ্রহণ করে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
আল্লাহ তায়ালা কেবলই মুত্তাকীদের থেকে (আমল) কবুল করেন ” সূরা মায়িদাহ ২৭।
আলী রাযি.বলতেন,
“আমল করার পর সে আমল কবুল করানোর জন্য তোমরা আরো বেশি চেষ্টা মেহনত চালিয়ে যাও। তোমরা কি শুননি! আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে, তিনি কেবলই মুত্তাকীদের থেকে (আমল) কবুল করেন ”। লাতাইফুল মাআরিফ ৯০৯। এজন্য এখন আমাদের কাজ হবে সর্বোচ্চ তাকওয়া অবলম্বন করা। সবধরনের গোনাহের কাজ থেকে বিরত থাকা, পাশাপশি সকল নেক কাজ মনোযোগের সাথে আদায় করা। তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইবাদতগুলো কবুল করবেন।
৩. সাদাকাতুল ফিতির আদায় করা : সাদাকাতুল ফিতির আদায় করার আমলটিও মূলত রোযার ক্রটি-বিচ্যুতি মাফ করানোর জন্যই। এর মাধ্যমেও রোযার ভুল-ত্রæটি মাফ হয়ে যায়। হাদিস শরিফে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদাকাতুল ফিতরকে আবশ্যক করেছেন। অর্থহীন ও অশালিন কাজে রোযার যে ক্ষতি হয় তা পূরণের জন্য এবং নি:স্ব লোকের আহার যোগানোর জন্য”। সুনানে আবি দাউদ ১৬০৯ হাসান

সাদাকায়ে ফিতিরের নেসাব
কারো কাছে যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা এর মূল্যপরিমাণ যে কোন ধরনের সম্পদ ঈদুল ফিতরের দিন ছুবহে সাদিক এর সময় থাকে, তাহলে সাদাকায়ে ফিতির আদায় করা ওয়াজিব। তাতারখানিয়া ৩/৪৫৩ যাকারিয়া
সাদাকায়ে ফিতির ও যাকাতের নেসাবের মাঝে পার্থক্য
১. যাকাতের নেসাবের ক্ষেত্রে সাধারণত স্বর্ণ, রুপা, নগদ টাকা ও ব্যবসায়িক সম্পদের হিসাব করা হয়। আর সাদাকায়ে ফিতিরের নেসাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সব ধরনের সম্পদের হিসাব হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি জমা ও উৎপাদিত ফসলও এর আওতাভুক্ত। আল মুহিতুল বুরহানি: ৮/৪৫৫
২. যাকাতের নেসাবের ক্ষেত্রে বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত আছে কিন্তু সাদাকায়ে ফিতিরের নেসাবে এমন শর্ত নেই বরং ঈদুল ফিতরের দিন ছুবহে সাদিকের সময় নেসাবের মালিক হলেই সাদাকায়ে ফিতির আদায় করা ওয়াজিব। যাকাতের মতো সাদাকায়ে ফিতিরের নেসাব সারা বছর থাকা জরুরী নয়। রদ্দুল মহতার: ৬/৩১২
সাদকায়ে ফিতির কার উপর ওয়াজিব
যে ব্যক্তি উল্লিখিত নেসাবের মালিক হবে তার উপর সাদাকায়ে ফিতির আদায় করা ওয়াজিব। চাই সে পুরুষ হোক বা মহিলা, মুসাফির হোক বা মুকিম, জ্ঞান সম্পন্ন হোক বা পাগল, বালেগ হোক বা নাবালেগ। যদি নাবালেগের নিজস্ব সম্পদ থেকে থাকে তাহলে তার সম্পদ থেকে আর তার নিজস্ব সম্পদ না থাকলে পিতার সম্পদ থেকে সাদাকায়ে ফিতির আদায় করতে হবে। আর যাদেরকে যাকাত দেওয়া যায় অর্থাৎ নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়, এমন ব্যক্তিদেরকে সাদাকায়ে ফিতর দেওয়া যাবে। বাদায়েউস সানায়ে ২/১৯৯, আল ফাতওয়াল ওয়াল ওয়ালিজিয়া ১/২৪৪,হিন্দিয়া ১/১৯২, শামী ৩/৩৭৬-৩৭৯ সাঈদ।
হাদিসে বর্ণিত সাদাকাতুল ফিতির আদায়ের দ্রব্যাদী ও পরিমাণ
হাদিস শরীফে যেবস দ্রব্যের কথা এসেছে, সেগুলো হলো, ১. গম বা আটা ৯. যব বা ভুট্টা ৮. খেজুর ৪. পনির ৫. কিসমিস। যেমন, আবূ সাঈদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত ঃ এক হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন,
“আমরা এক সা’ পরিমাণ খাদ্য (ভুট্টা) অথবা এক সা’ পরিমাণ যব অথবা এক সা’ পরিমাণ খেজুর অথবা এক সা’ পরিমাণ পনির অথবা এক সা’ পরিমাণ কিসমিস দিয়ে সাদাকাতুল ফিতির আদায় করতাম”। সহীহ বুখারি ১৫০৬
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন ঘোষক পাঠালেন মক্কার পথে পথে এ ঘোষণা য্য জেন করার
“জেনে রেখো! প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, গোলাম-স্বাধীন, ছোট-বড় সকলের উপর সাদাকায়ে ফিতির অপরিহার্য। দুই মুদ (আধা সা’) গম , কিংবা এক সা’ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য”। সুনানে তিরমিযী ৬৭৪ হাসান
অর্থাৎ, খেজুর, কিসমিস পনির, ভুট্টা ও যব ইত্যাদি দিয়ে সাদকাতুল ফিতির আদায় করলে এক সা’ (৮ কেজি ১৮৪ গ্রাম) বা এর সমমূল্য আদায় করতে হবে। আর গম ও আটা দিয়ে আদায় করলে অর্ধ সা’ (১ কেজি ৫৯৯ গ্রাম) বা এর মূল্য আদায় করতে হবে। বর্তমান এর বাজার মূল্য প্রায় ১১০ টাকা।
মূল্য দিয়ে সাদাকায়ে ফিতির আদায় করা
সাদাকায়ে ফিতির যেমনভাবে খেজুর, পনির, কিসমিস, যব, গম ইত্যাদি দ্বারা আদায় করা যাবে, তেমনি এগুলোর মূল্য দিয়ে আদায় করলেও সহীহ হবে। সাহাবায়ে কেরাম থেকে এরূপ আমল প্রমাণিত আছে। যেমন, হযরত যুহাইর রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি আবু ইসহাক থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন,
“আমি সাহাবায়ে কেরাম রাযি. কে এই অবস্থায় পেয়েছি যে, তারা রমাদানে সাদাকায়ে ফিতির খাবারের বিনিময়ে টাকা দ্বারা আদায় করতেন। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ১০৩৭১ সহীহ সনদ
অনুরূপ হযরত হাসান বসরী থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন,
“টাকা দ্বারা সকদায়ে ফিতির আদায় করতে কোন সমস্যা নেই”। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ১০৩৭০
শেষ কথা : আল্লাহ তায়ালা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকটি আমলই ছিল মাগফিরাত হাসিলের একেকটি উপলক্ষ। রমাদানের এই শেষ প্রহরে এখন আমাদের হিসাব-নিকাশের পালা। রমাদানে মাগফিরাত লাভের সুবর্ণ সুযোগ আমি কাজে লাগাতে পেরেছি কিনা। মাগফিরাত আমার লাভ হয়েছে কিনা। গোনাহের কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখার মত শক্তিশালী তাকওয়া হাসিল হলো কিনা। এ বিষয়গুলো এখনই পরখ করার সময়। যদি কোন কমতি থেকে থাকে রমাদান মাস শেষ হওয়ার পূর্বেই যেকোন কিছুর বিনিময়ে তা পূর্ণ করে ফেলতে হবে।
মাগফিরাত অর্জনে সফল হতে হবে। অন্যথায় আমরা রাসূলের সেই ধমকিবাণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব (আল ইয়াযু বিল্লাহ)। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে রমাদানের সকল ফযিলত হাসিল করার তাওফিক দান করুন। বিশেষ করে আমাদের সকলকে কাক্সিক্ষত সেই মাগফিরাত নসীব করুন। আমাদের জীবনে বারবার রমাদান ও লাইলাতুল কদর দান করুন। আমীন! ইয়া রাব্বাল আলামীন।



