প্রিয় পাঠক সামনে জুময়ায় আপনি যাকাতের গুরুত্ব ও ফজিলত নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। তা ছাড়া
যাকাতের গুরুত্ব ও ফজিলত
জানা আমাদের প্রত্যেকের জানা আবশ্যক।
শুরুর কথা : যাকাত ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য একটি ফরয বিধান। যা ইসালামের পঞ্চ-স্তম্ভের অন্তর্ভূক্ত। নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক ব্যক্তির উপর যাকাত আদায় করা ফরয। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বহুবার সালাতের পাশাপাশি যাকাত প্রদানের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই, দৈহিক ইবাদতের মধ্যে নামাজ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, আর্থিক ইবাদতের মধ্যে যাকাতও তেমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত।
পাশাপাশি যাকাত আদায়ের মাধ্যমে একটি অভাবমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে অসহায় ও অসচ্ছল গরিব মানুষগুলোর সাহায্য-সহযোগিতা হয়। সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্যরেখা অনেকটাই কমে আসে। এজন্য ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক একটি সৌন্দর্য হলো যাকাত ব্যবস্থা।
বর্তমান প্রচলিত অর্থব্যবস্থা ও ইসলামী অর্থব্যবস্থা
পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা: এর মূল কথা হলো,এ অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তি মালিকানার বলগাহীন স্বাধীনতা ও সম্পদ উপার্জনের হালাল-হারাম সকল পদ্ধতির বৈধতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এতে সম্পদ দরিদ্রদের হাতে বিকেন্দ্রীকরণের কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। যার ফলে মানুষ হালাল-হারামের কোন তোয়াক্কা না করে সুদ,ঘুস ইত্যাদি হারাম পন্থায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। সুদি মহাজনরা সুদি কারবার করে গরিবের টাকাগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে। এভাবে মানুষের মাঝে ধনী-দরিদ্রে বৈষম্যরেখা দিন দিন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা : এ অর্থব্যবস্থার মূল শ্লোগান হলো; “কেউ খাবে কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না”। সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করাই এ অর্থব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য। মুখরুচক এমনসব শ্লোগান থাকলেও এই অর্থব্যবস্থা একটি অকার্যকর অর্থব্যবস্থা। বর্তমান দুনিয়া এর বাস্তব সাক্ষী। এ অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তি মালিকানাকে একেবারে অস্বীকার করে সবকিছুর মালিকানা দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রেকে।
জনগণ হলো রাষ্ট্রের কর্মচারী। যার ফলে অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছে। কারণ,মানুষের স্বভাবজাত একটি বিষয় হলো,তারা নিজের জিনিসকে দেখেশুনে রাখে এবং অত্যাধিক যতœ নেয়। কিন্তু যখন নিজের বলতে কিছু থাকে না, তখন মানুষের স্বভাবজাত আগ্রহ হারিয়ে যায়। তখন কাজ-কর্মে আগের মতো মনোযোগ থাকে না। বরং অলসতা আর কাজ ফাঁকির হিড়িক পড়ে যায়। এভাবে কোন রাষ্ট্র বা কোন প্রতিষ্ঠান টিকতে পারে না।
আমাদের দেশের বিখ্যাত ‘আদমজী জুট মিলস’ এর বাস্তব উদাহরণ। এটি যখন ব্যক্তি মালিকানাধীন ছিল, তখন এর সুনাম-সুখ্যাতি বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ ছিল। এর আয়-উৎপাদনও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু যখন এটিকে রাষ্ট্রের মালিকানায় নিয়ে নেওয়া হয়, তখন থেকে এর আয় উন্নতি আস্তে আস্তে কমতে থাকে। এমনকি এক পর্যায়ে এটি পরিচালনা করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় তার এক ভাগও আয় করা অসম্ভব হয়ে পরে। যে কারণে সরকার এটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
ইসলামী অর্থব্যবস্থা : ইসলামী অর্থব্যবস্থা ভারসাম্যপূর্ণ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থব্যবস্থা। এতে ব্যক্তি মালিকানা অস্বীকার করা হয়নি। তবে তা বলগাহীন রাখা হয়নি বরং সম্পদ ধনীদের থেকে গরিবদের মাঝে বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাছাড়া সম্পদ উপার্জনের যে কোন পন্থাকে ইসলাম সমর্থন করেনি। এক্ষেত্রে হালাল-হারামের সীমারেখা দাঁড় করে দিয়েছে। তাই এই অর্থব্যবস্থায় সুদ-ঘুস, চুরি-ডাকতি, ইত্যাদি অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: অব্যবহৃ ও ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তি মালিকানা তথা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়টি স্বীকার করার কারণে মানুষের কাজ-কর্মের গতি সচল থাকে। ব্যক্তি মালিকানাকে বলগাহীন না রেখে সম্পদ ধনীদের থেকে গরিবদের মাঝে বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা রাখার মাধ্যমে সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমিয়ে এনেছে।
আপনি “যাকাত বিশ্বকোষ” কিতাবটি ক্রয় করতে এখানে ক্লিক করুন
ধনীদের থেকে সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যম ধনীদের সম্পদ গরিবদের হাতে আসার অন্যতম একটি মাধ্যম হলো, যাকাত ব্যবস্থা। দারিদ্র বিমোচনে এর কোন জুড়ি হতে পারে না। এমন কার্যকারী পন্থা একমাত্র ইসলামী অর্থব্যবস্থাতেই রাখা আছে। যাকাত ছাড়াও সদকায়ে ফিতির,দান-সদকা,মানত,বিভিন্ন কাফফারা যেমন, কসমের কাফফারা, যিহারের কাফফারা, রোজার কাফফারা, নামাজ-রোজার ফিদিয়া ইত্যাদি মাধ্যমেও ধনীদের সম্পদের একটি অংশ গরিবদের কাছে চলে যায়।
আপনি ’’ফাজায়েল ও মাসায়েল জাকাত ও ফিতরা’’ কিতাবটি ক্রয় করতে এখানে ক্লিক করুন
দারিদ্র বিমোচনে যাকাতের বিকল্প নেই
সমাজের প্রতিটি বিত্তবান যদি যথাযথভাবে যাকাত আদায়ের প্রতি যতœশীল হয়,অতি অল্প সময়েই দারিদ্র বিমোচন করা সম্ভব। ইতিহাস সাক্ষী, তখন ছিল ইসলামের স্বর্ণালি যুগ। শাসন ক্ষমাতায় ছিলেন হযরত ওমর (রা:)। তিনি বিত্তবান থেকে যাকাত উসূল করে দরিদ্রদের মাঝে তা সুষম বন্টনের ফরমান জারি করেন। এতে করে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটে। পরিস্তিতি এমন দাঁড়ায় যে,পুরো মুসলিম বিশ্বে যাকাত গ্রহণ করবে এমন দরিদ্র ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। তাই দারিদ্র বিমোচনে এবং জনশক্তিকে স্বাবলম্বী করে তুলতে যাকাতের কোন বিকল্প নেই।
যাকাতের পরিচয়
যাকাতের আভিধানিক অর্থ হলো: বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্র হওয়া ইত্যাদি। কারণ,যাকাত দিলে সম্পদ পবিত্র হয় এবং সম্পদে বরকত হয়। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনি রাহি.বলেন,
سميت زكاة للبركة التي تظهر في المال بعدها
‘যাকাত আদায় করার পর সম্পদের মাঝে প্রকাশ্য বরকত হয় তাই যাকাতকে যাকাত বলা হয়’। উমদাতুল কারী ৮/২৩৩
যাকাতের পারিভাষিক অর্থ হলো,
‘শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সম্পদের একটি অংশ কোন মুসলিম গরিব-দু:খীকে মালিক বানিয়ে দেওয়াকে যাকাত বলা হয় ’। (কাওয়াইদুল ফিকহ ১৯৩)
যাকাতের ফযিলত
যাকাত আদায়ের অনেক ফযিলত ও উপকার রয়েছে। কিছু ফযিলত আমারা তুলে ধরছি..
১. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমত লাভ হয় : যাকাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত নাযিল হয়। পবিত্র কুরআনে এসেছে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“ আর আমার দয়া তো প্রত্যেক বস্তুতে ব্যাপ্ত। সুতরাং আমি আমার রহমত তাদের জন্য নির্ধারণ করবো যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে। (সূরা আ‘রাফ: ১৫৬) অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে ,
“তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য করো যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হতে পারো”। (সূরা নূর: ৫৬৩)
২. সওয়াব বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া হয় : আল্লাহ তায়ালা যাকাত আদায়ের সাওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিয়ে থাকেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তোমাদের (মধ্যে যারা) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যাকাত প্রদান করে তারাই আল্লাহ তায়ালার নিকট দ্বিগুণ সাওয়াব প্রাপ্ত হবে”। (সূরা রূম : ৩৯)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যারা আল্লাহর পথে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে,তাদের দৃষ্টান্ত এ রকম- যেমন একটি শস্য দানা সাতটি শীষ উদগত করে এবং প্রতিটি শীষে একশ’ দানা জন্মায়। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন বহুগুণে সওয়াব বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ তায়ালা প্রাচুর্যময়,সর্বজ্ঞ”। (সূরা বাকারা ২৬১)
৩. জান্নাতের বিষেশ দরজা দিয়ে যাকাত দাতাকে ডাকা হবে : যাকাত আদায়কারীকে জান্নাতের বিশেষ দরজা দিয়ে আহবান করা হবে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“যে সাদাকাহ দানকারী,তাকে সাদাকার দরজা হতে ডাকা হবে। (সহীহ বুখারী ১৮৯৭)
৪. বিপদাপদ দূর হয় : যাকাত আদায় করলে আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত হয় এবং বিপদ-আপদ দূর হয়। হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“নিশ্চয়ই সাদাকাহ আল্লাহর ক্রোধকে ঠান্ডা করে ও খারাপ মৃত্যু হতে রক্ষা করে। (সুনানে তিরমিযী ৬৬৪ যয়িফ)
যাকাত আদায়ে দুনিয়াবী উপকার
১. সম্পদ পবিত্র হয় : যাকাত আদায়ের ফলে সম্পদ পবিত্র হয়। এতে করে সম্পদের মধ্যে বকরত হয়। অনাকাঙ্কিত বিপদ-আপদ থেকে সম্পদ হেফাজত থাকে। পাশাপাশি যাকাত প্রদানকারীর আত্মিক উন্নতি ও প্রশান্তি লাভ হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“ (হে নবী!) আপনি তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ গ্রহণ করুন, এর মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র ও বরকতপূর্ণ করবেন আর তাদের জন্য দোয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনার দোয়া তাদের জন্য প্রশান্তিদায়ক। আল্লাহ সবকথা শুনেন, সবকিছু জানেন।” (সূরা তাওবা: ১০৩)
২. সম্পদে বরকত হয় : যাকাত আদায়ের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে সম্পদের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ঘটে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে সম্পদ হ্রাস পেলেও আল্লাহর পক্ষ হতে এতে বরকত নাযিল হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আল্লাহ তায়ালা সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সাদাকাহকে বর্ধিত করেন” (সূরা বাকারা ২৭৬)
হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সাদাকাহ করলে সম্পদ কমে না।” সহীহ মুসলিম২৫৮৮
৩. ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর হয় : সামাজিক ভাবেও যাকাত আদায়ের ব্যাপক প্রভাব পড়ে। কারণ,যাকাত ধনীদের থেকে উসূল করে দরিদ্রদেরকে দেওয়া হয়। যেমন, হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
تؤخذ من أغنيائهم وترد في فقرائهم (إسناده صحيح على شرط الشيخين)
“ যকাত ধনীদের থেকে নিয়ে দরিদ্রদেরকে দেওয়া হবে।” (মুসনাদে আহমাদ: ২০৭১ সহিহ)
এজন্য যাকাত ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূরীকরণ, দারিদ্রতা বিমোচন, পাস্পারিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক সমাজ তৈরিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
যাকাত আদায় না করার ভয়াবহ শাস্তি
যাকাত যেহেতু সর্বোচ্চ ফরজ বিধানের মধ্যে অন্যতাম একটি। তাই, যাকাত আদায় না করা অনেক বড় অপরাধ। এমনকি দুনিয়াতেই এ কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। আর আখিরাতের ভয়াবহ শাস্তি তো আছেই। যাকাত আদায় না করার ভয়াবহ কিছু শাস্তির কথ তুলে ধরা হলো,
১. শরীরে আগুনের দাগ দেওয়া হবে : সম্পদের যাকাত আদায় না করলে ওই সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে এর মাধ্যমে মালিকের কপাল,পাঁজর ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদের যন্ত্রণাময় শাস্তির সুসংবাদ দাও, যে দিন সে ধন-সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে তারপর তা দ্বারা তাদের কপাল, তাদের পাঁজর ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। সেদিন বলা হবে এই হচ্ছে সেই সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। সুতরাং তোমরা যে সম্পদ পূঞ্জীভূত করতে, তার মজা ভোগ করো” (সূরা তাওবা ৩৪-৩৫)
এরূপ শাস্তি কতদিন পর্যন্ত চলবে সেটিও হাদিস শরিফে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম বলেন,
“(দাগ দেওয়ার পর) যখনই ঠান্ডা হয়ে আসবে পুনরায় তা উত্তপ্ত করা হবে। আর এরূপ করা হবে এমন একদিন যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। এরূপ শাস্তি শেষ বিচার পর্যন্ত চলতে থাকবে। ”। (সহীহ মুসলিম : ৯৮৭)
শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রাহি.বলতেন, এই তিনটি অঙ্গে বিশেষভাবে শাস্তি দেওয়ার কারণ হলো, কোন ভিক্ষুক যখন কারো কাছে সাহায্য চায়, তখন প্রথমত মানুষের কপালের মাঝে একটা বিরক্তির ভাজ পড়ে, এরপর যদি আবার তার কাছে চাইতে থাকে, তখন বিরক্তি হয়ে তার দিকে পার্শ্ব প্রদর্শন করে অন্যদিকে ফিরে থাকে, এরপরও যদি তার কাছে চাইতে থাকে তখন, ওই ব্যক্তি সায়েলের দিকে পিঠ দিয়ে অন্যদিকে চলে যায়।
এভাবে দান,সদাকা, যাকাত ইত্যাদির সময় মানুষের বিরক্তির ভাব তার কপাল,পাঁজর ও পিঠের মাঝে প্রকাশ পায়। তাই এই তিন অঙ্গকে বিশেষভাবে শাস্তির আওয়তায় আনা হবে।
২. সম্পদ বিষধর সাপ হয়ে ধ্বংসন করবে : যে সম্পদের যাকাত আদায় করা হয় না। এমন সম্পদকে কিয়ামতের দিন বিষধর সাপের অকৃতি দেওয়া হবে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা ধন-সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে ওই ধন-সম্পদের যাকাত আদায় করেনি, সে ধন-সম্পদকে কেয়ামতের দিন টাকমাথা সাপে পরিণত করা হবে। এ সাপের দু’চোখের উপর দুটি কালো দাগ থাকবে। এরপর ওই সাপ গলায় মালার মতো পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। অত:পর তা ওই ব্যক্তির দু’চোয়ালে কামড়াবে আর বলবে, আমিই তোমার সম্পদ, আমিই তোমার সংরক্ষিত ধন-সম্পদ। (সহিহ বুখারি ১৪০৩)
৩. আগুনের অলংকার পড়ানো হবে : স্বর্ণ-রূপার অলংকারের যাকাত না দিলে কিয়ামতের দিন আগুনের অলংকার পড়িয়ে দেওয়া হবে। হাদিস শরিফে এসেছে,
“আমর ইবনু শুয়াইব হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদা থেকে বর্ণিতঃ দুই জন মহিলা রাসূল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে আসে। তাদের দুজনের হাতে স্বর্ণের বালা ছিল। তিনি তাদের উভয়কে প্রশ্ন করেনঃ তোমরা কি এর যাকাত প্রদান কর? তারা বলল না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের বললেনঃ তোমরা কি ইহা পছন্দ করো যে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন) তোমাদের আগুনের দুটি বালা পড়াবেন ? তারা বললঃ না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তাহলে তোমরা এর যাকাত প্রদান করো। (সুনানে তিরমিযী: ৬৩৭ হাসান)
আরও পড়ুন: কোন কোন সম্পদের উপর যাকাত ফরজ
৪. অনাবৃষ্টি দেখা দেয় ও সম্পদ হালাক হয়ে যায় : যাকাত আদায় না করলে এসব ভয়াবহ শাস্তির পাশাপাশি দুনিয়াতেও বিভিন্ন ধরনের শাস্তির সম্মুখিন হতে হয়। সম্পদে আল্লাহর পক্ষ হতে কোন বরকত থাকে না। নানা কারণে সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ, বালা-মুসিবত লেগেই থাকে। অনেক সময় আগুন লেগে সম্পদ শেষ হয়ে যায়। অনেক সময় চুরি-ডাকাতি ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যায়। অনেক সময় অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি দেখা দেয়। ফলে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়। হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“যে সম্প্রদায় যাকাত দিতে অস্বীকার করবে, আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য বৃষ্টি বন্ধ করে দিবেন”। (আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৭৭২২ সহিহ)
অন্য হাদিসে এসেছে, যাকাত না দিলে এ সম্পদ অন্য সম্পদকে হালাক করে ফেলে। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“মালের সাথে যাকাতের মাল মিশ্রিত হলে তা মালকে ধ্বংস করে দিবে”। (নাইলুল আওতার ১৫৬০)
তাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে যথাযথ হিসাব করে পূর্ণ সম্পদের যাকাত আদায় করে দেওয়া। যাকাত না দিয়ে কৃপণতা করা দুনিয়া আখিরাতে ধ্বংসের কারণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আল্লহর দেয়া সম্পদে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে এটা তাদের জন্য উত্তম বরং তা তাদের জন্য মন্দ। যে সম্পদ নিয়ে তারা কৃপণতা করে কেয়ামতের দিন তা তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে দেওয়া হবে ”। (সূরা আলে ইমরান ১৮০)
যাদের উপর যাকাত ফরয
ইসলামি শরিয়ত কোনো ক্ষেত্রেই সাধ্যের বাইরে কাউকে কোনো বিধান চাপিয়ে দেয়নি। প্রত্যেক ইবাদতের জন্য সাধ্য ও সামর্থ্যরে প্রতি লক্ষ্য রেখেছে। চায় শারীরিক ইবাদত হোক বা আর্থিক। নামাজ, রোজার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানের ক্ষেত্রেও যখন সক্ষমতা না থাকে, তখন আদায় করতে হয় না। তদ্রƒপ আর্থিক ইবাদত যেমন, যাকাত ও হজ এগুলো সবার জন্য নয় বরং এগুলোর জন্য বিভিন্ন শর্ত শারায়েত রয়েছে।
যাকাত ফরয হওয়ার মৌলিক কিছু শর্ত
১. নেসাবের মালিক হওয়া : যাকাতের নেসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে শরিয়ত স্বর্ণ ও রুপাকে মানদÐ নির্ধারণ করেছে। স্বর্ণের নেসাবের পরিমাণ হলো, সাড়ে সাত ভরি/তোলা। আর রুপায় নেসাবের পরিমাণ সাড়ে বায়ান্ন ভরি/তোলা। অর্থাৎ কারো কাছে যদি সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা থাকে তাহলে সে নেসাবের মালিক হবে। তদ্রƒপ যদি এ দুটির কোন একটির সমমূল্য পরিমাণ নগত ক্যাশ বা ব্যবসায়িক সম্পদ থাকে তাহলেও সে নেসাবে মালিক। অনুরূপ কারো কাছে যদি অল্প স্বর্ণ, অল্প পরিমাণ রুপা, কিছু নগদ টাকা, ও কিছু ব্যাবসার সম্পদ থাকে তাহলে এই সবগুলোর মূল্য একত্রিত করলে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমূল পরিমাণ হয়ে যায় তাহলে সে নেসাবের মালিক বলে গণ্য হবে।
খোলাসা কথা হলো, যদি কারো কাছে শুধু স্বর্ণ থাকে তাহলে নেসাব পূর্ণ হতে হলে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ থাকতে হবে। আর যদি কারো কাছে শুধু রুপা থাকে তাহলে নেসাব পূর্ণ হওয়ার জন্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা থাকতে হবে। আর যদি করো কাছে কিছু স্বর্ণ থাকে সাথে কিছু রুপা বা নগদ ক্যাশ বা ব্যবসার সম্পদ থাকে তখন সবগুলোর মূল্যমান হিসাব করতে হবে। যদি সবগুলো মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমমূল্য পরিমাণ (যার বর্তমান বাজার মূল্য ৯০,০০০+) হয় তাহলে নেসাবের মালিক বলে গণ্য হবে। (সুনানে আবি দাউদ ১৭২৩ সহিহ, শামী ৩/২৩৪ যাকারিয়া।)
আমাদের দেশে সাধারণত এই চার ধরনের সম্পদের উপর যাকাত ফরয হয়,
ক-খ.স্বর্ণ-রূপা : স্বর্ণ-রুপা যে কোন অবস্থায় থাকুক, চায় তা কাঁচা বার আকারে থাকুক বা অলংকার আকারে থাকুক, ব্যবহৃত হোক বা না হোক যাকাতের হিসাবে আসবে।
গ. নগদ অর্থ : যেমন, ক্যাশ, চেক, হজ বা বিবাহের উদ্দেশ্যে জমানো টাকা, ব্যাংক একাউন্ট, কারো নিকট পাওনা টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা ইত্যাদি।
ঘ. ব্যবসায়িক পণ্য : অর্থাৎ, বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত যে কোন পণ্য। চাই তা বিক্রয়যোগ্য পণ্য (ভরহরংযবফ ঢ়ৎড়ফঁপঃ) হোক, প্রক্রিয়াধীন পণ্য হোক বা কাঁচা মাল হোক। এসব পণ্যের বাজার মূল্য এবং বাকিতে বিক্রয় করা পণ্যের মূল্যের উপর যাকাত আবশ্যক হবে। এই চার প্রকার সম্পদ ছাড়া অন্যান্য সম্পদ যেমন, হিরা, জওহার, মনি-মুক্তা, মূল্যবান পাথর ইত্যাদি যতো দামিই হোক না কেন এগুলোর উপর যাকাত আসবে না। তবে ব্যবসার হলে যাকাত আসবে।
৭. হাওলানে হাওল বা বছর অতিক্রান্ত হওয়া : যেদিন কেউ উল্লিখিত নেসাবের মালিক হবে সেদিন থেকে চন্দ্রবর্ষ হিসাবে বছর শেষেও যদি সে ব্যক্তি নেসাবের মালিক থাকে তাহলে যাকাত আবশ্যক হবে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“যে লোক সম্পদ অর্জন করলো, তার উপর বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত যাকাত আদায় করতে হবে না”। (সুনানে তিরমিযী ৬৩১ সহিহ)
‘হাওলানে হাওল’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বছরের শুরু ও শেষে নেসাব পূর্ণ থাকা। বছরের মাঝখানে নেসাবপূর্ণ থাকা শর্ত নয়। বছরের মাঝে কম বেশি হতে পারে। বছরের মাঝখানে যাকাতযোগ্য যত সম্পদ মালিকানায় আসবে তা চলমান ওই নেসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আর যদি বছরের মাঝখানে নেসাব একেবারেই শেষ হয়ে যায় তাহলে, ওই বছরের হিসাব বাতিল হয়ে যাবে। পরবর্তীতে নেসাব পরিমাণ সম্পদ হলে তখন থেকে নতুন করে বছরের হিসাব শুরু হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৩/৪৭০)
৩. হাওয়ায়েজে আসলিয়া বা মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া : অর্থাৎ নেসাব পরিমাণ সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে। ওই সম্পদ নিজের ও পরিবারের অন্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, ঘর-বাড়ি, কাপড়-চোপড়,আসবাবপত্র ইত্যাদির অতিরিক্ত হতে হবে। পাশাপাশি তা ঋণ মুক্ত হতে হবে।
মোটকথা : যাকাতযোগ্য সম্পদ হিসাব করার পর কারো কাছে পাওনা থাকলে তা যোগ করতে হবে আর কোন দেনা থাকলে তা বিয়োগ করতে হবে। অত:পর তা যদি নেসাব পারিমাণ হয়, এবং এর উপর বছর অতিক্রান্ত হয় এবং তা মৌলিক প্রয়োজন থেকে অতিরিক্ত হয় তাহলে যাকাত ফরয হবে।
যাকাত আদায়ের পদ্ধতি ও কতটুকু যাকাত দিতে হবে
যাকতযোগ্য সম্পদ হিসাব করে মোট সম্পদের আড়াই পার্সেন্ট বা ৪০ ভাগের এক ভাগ যাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে। এ অর্থ হকদারের কাছে হস্তান্তর করার সময় বা অন্য সম্পদ থেকে অলাদা করার সময় যাকাতের নিয়ত করা জরুরি। নিয়ত ছাড়া যাকাত আদায় করলে যাকাত আদায় সহীহ হবে না। যাকাত আদায় সহীহ হওয়ার অন্যতম আরেকটি শর্ত হলো, যাকাতের অর্থ হকদারকে মালিক বানিয়ে দেওয়া।
তাই, কোন সংস্থা, সংগঠন, কবরস্থান, খাল, সেতু নির্মাণ ইত্যাদি জনকল্যাণমুলক কাজে যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে না। কারণ, এসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে কাউকে মালিক বানানো হয় না। তাই, এসব ক্ষেত্রে যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে না । (রাদ্দুল মুহতার ২/৩৪৪)
কাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে
কারো কাছে মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে কোনো ধরনের সম্পদ যেমন, টাকা-পয়সা, জমি-জমা, বাগান বাড়ি, মুনি-মুক্তা, হিরা-জওহার, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সব ধরনের সামানাপত্র ইত্যাদি মিলে যাকাতের নেসাব পরিমাণ (সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সমপরিমাণ) সম্পদ না থাকে, তাহলে তাকে যাকাত দেওয়া যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ২/১৫৮, রদ্দুল মুহতার: ৩/২৮৪)
অর্থাৎ ফকির,মিসকিন ও অভাবী লোকদের যাকাত দিতে হবে। যাকাত প্রদানের খাত বর্ণনা করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, “প্রকৃতপক্ষে সাদাকা (যাকাত) ফকির ও মিসকিনদের হক এবং সে সকল কর্মচারীদের, যারা সাদাকা উসূলের কাজে নিয়োজিত এবং যাদের মনোরঞ্জন করা উদ্দেশ্য তাদের। তাছাড়া দাসমুক্তিতে,ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধে এবং আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের সাহেয্যেও তা ব্যয় করা হবে। এটি আল্লাহর পক্ষ হতে প্রদত্ত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা তাওবা ৬০)
আয়াতটির সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ
ফকির,মিসকীন : আভিধানিক অর্থে ফকির বলা হয় যে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়। আর মিসকিন বলা হয় যার তেমন কোন সম্পদই নেই। পরিভাষায় ফকির বলা হয় এমন অভাবীকে যে মানুষের কাছে নিজের অভাবকে লুকিয়ে রাখে, অন্যের কাছে হাত পাতা থেকে বিরত থাকে। আর যে অন্যের কাছে হাত পাতে, মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়ায় তাকে মিসকিন বলে। (তাফসীরে কুরতুবী ৪/৫০০, তাফসীরে তাবারী ১৪/৩০৬)
মোটকথা: ফকির, মিসকিন উভয় শ্রেণীই অভাবী। পরিচয়ের মাঝে ভিন্নতা হলেও এদিকে উভয়ই এক যে, তারা অভাবী, তারা নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়, তাই তাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে ২/১৫১ যাকারিয়া)
আরও পড়ুন: ঈদুল ফিতরের বয়ান, ফযিলত ও আমল
যাকাত উসূলকারী : রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যারা লোকদের থেকে যাকাত উসূল করে এবং হকদারদের কাছে যাকাত পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত। এমন লোকদেরকে যাকাতের অর্থ থেকে তাদের কাজের বিনিময় বা বেতন দেওয়া হবে। যাকাত হিসেবে এ অর্থ দেওয়া হবে না। তাই এমন ব্যক্তি চাই ধনী হোক বা দরিদ্র যাকাতের অর্থ থেকে তার পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। যাকাত প্রদানের খাত সমূহের মাঝে শুধু এ খাতটিই এমন যে এখানে ধনী-দরিদ্রের তারতম্য করা হয়নি। এছাড়া বাকী খাতগুলোর মাঝে ফকির বা দরিদ্র হওয়া শর্ত। (তাফসীরে তাবারী ১৪/৩১০) বাদায়েউস সানায়ে ২/১৫১ যাকারিয়া )
ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা : ইসলামের প্রতি লোকদের আকৃষ্ট ও মনোরঞ্জন এবং যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তারা যেন অর্থের অভাব ও দারিদ্রতার কারণে আবার পূর্বের ধর্মে ফিরে না যায় সেজন্য তাদেরকে যাকাতের অর্থ দেওয়া। এটি ইসলামের শুরুযুগে ছিল কিন্তু পরবর্তীতে রহিত হয়ে যায়। হযরত ওমর রা: এটিকে রহিত করে দেন। হাসান বসরী, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেক, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারকসহ অধিকাংশ ফুকাহ এ মতটি গ্রহণ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম শাফী, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহি.সহ অনেকের বক্তব্য হলো, হযরত ওমর রা: এটি রহিত করেছেন এর অর্থ হলো তখন প্রয়োজন ছিল না, তাই তিনি এরূপ করেছেন।
কিন্তু কোন সময় প্রয়োজন হলে মনতুষ্টির জন্য যাকাতের অর্থ দেওয় যাবে। অর্থাৎ, এটি রহিত হয়নি। (তাফসীরে তাবারী ১৪/৩১৩) বাদায়েউস সানায়ে ২/১৫৩ যাকারিয়া)
এ বিষয়ে মুফতি শফী রাহি.বলেন, ‘মুআল্লাফাতুল কুলুব’ তথা মনতুষ্টির ব্যাবপকাতার মাঝে যদিও মুসলিম ও অমুসলিম শামিল রয়েছে কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন অমুসলিমকে ইসলাম গ্রহণের জন্য যাকাতের অর্থ দিয়েছেন তা প্রমাণিত নয়। এ ব্যাপারে ইমাম কুরতুবী রাহি. বলেন,
وبالجملة فكلهم مؤمن ولم يكن فيهم كافر.
‘মোটকথা, মনতুষ্টির জন্য যাদেরকে যাকাতের অর্থ দেওয়া হয়েছে তাদের কেউই কাফের ছিল না’। (তাফসীরে কুরতুবী ৮/১৮১)
তারফসীরে মাজহারীতে এসেছে,
لم يثبت ان النبي صلى الله عليه وسلم اعطى أحدا من الكفار لاليالف شيئا من الزكوة
‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এটি প্রমাণিত নয় যে, তিনি কোন কাফেরকে মনতুষ্টির জন্য যাকাতের অর্থ দিয়েছেন’। (তাফসীরে মাজহারী ৪/২৩৫)
কোন কোন রেওয়াতে এসেছে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু অমুসলিমকে দান করেছেন। যেমন, সহীহ মুসলিম ও তিরমিযি শরীফে এসেছে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফওয়ান বিন উমাইয়্যাহ রাযি:কে কাফের থাকাকালীন সময়ে কিছু দিয়েছেন। ইমাম নববী রাহি. এর ব্যাখ্যায় লিখেন, তাকে হুনাইন যুদ্ধের গনিমতের সম্পদের খুমুস থেকে সহযোগীতা করা হয়েছে। তাই ফুকাহায়ে কেরাম বলেন,গনিমতের সম্পদের খুমুস যা বাইতুল মালে নেওয়া হয় তা দ্বারা মুসলিম, অমুসলিম সবাইকে সাহায্য করা যায়। কিন্তু যাকাতের অর্থ কোন অমুসলিমকে দেওয়া যাবে না।
এজন্য হানফি মাযহাব মতে অমুসলিমকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য যাকাতের অর্থ দেওয়া বৈধ নয়। তবে দরিদ্র মুসলিমদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে রাখার জন্য যাকাতের অর্থ দেওয়া বৈধ হবে। এ হিসেবে আয়াতটি রহিত নয়, বরং এর হুকুম এখনো বলবৎ আছে। (জাওয়াহিরুল ফিকহ ৩/২০১)
গোলাম আযাদ : এর দ্বারা উদ্দেশ্য মুকাতাব তথা অর্থের বিনিময়ে মুক্তির জন্য চুক্তিবদ্ধ গোলাম। এমন দাস-দাসী যে, অর্থের বিনিময়ে নিজের মুক্তির জন্য মুনিবের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, তাকে যাকাতের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা যাবে। যাকাতের অর্থ দিয়ে যে কোন গোলাম ক্রয় করে আযাদ করে দিলে যাকাত আদায় হবে না। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফী, ইমাম আহমদ বিন হম্বল রাহিমাহুল্লাহ সহ জুমহুরের বক্তব্য এটি। কারণ এরূপ গোলামের মালিকান বলতে কিছু নেই বরং সে নিজেই মুনিবের মালিকানাধীন। তাই তাকে যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে না। (জাওয়াহিরুল ফিকহ ৩/২০৩)
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি : বৈধ কোন কাজ করতে গিয়ে কেউ যদি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং এই ঋণ পরিশোধ করার মতো তার কোন আর্থিক সংগতি, জায়গা-জমি ইত্যাদি না থাকে, অর্থাৎ কোনভাবেই এই ঋণ পরিশোধ করা তার জন্য সম্ভব না হয়, তাহলে তাকে ঋণ পরিশোধ করার জন্য যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে। (তাফসীরে তাবারী ১৪/৩১২ , বাদায়েউস সানায়ে ৭/১৭৪ যাকারিয়া)
আল্লাহর রাস্তায় : এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুজাহিদ। অর্থাৎ, যদি মুজাহিদদের সাথে নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে তাহলে তাদেরকে যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে। তদ্রুপ প্রয়োজনে তাদেরকে অস্ত্র-সামগ্রী কিনে দিলেও যাকাত আদায় হবে। অনুরূপ কারো উপর হজ ফরজ হয়ে ছিল কিন্তু এখন তার ওই ফরজ হজ আদায় করার মতো সংগতি নেই, তাকেও যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে। ফি সাবিলিল্লাহ দ্বারা মুজাহিদ ও হাজী উদ্দেশ্য। এছাড়া অন্য কোন ইবাদতরত ব্যক্তি এর অন্তর্ভূক্ত হবে না। ফুকাহায়ে কেরাম এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষন করেছেন। (জাওয়াহিরুল ফিকহ ৩/২০৫)
মুসাফির : এমন মুসাফির যার হাতে বর্তমানে সফরের প্রয়োজনীয় অর্থ-সম্পদ নেই। এরূপ মুসাফিরকে যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে। যাতে করে সে তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারে, যদিও তার বাড়িতে অনেক সম্পদ থাকুক না কেন। (তাফসীরে তাবারী ১৪/৩৭১)
মোটকাথা: যাকাতের খাত সমূহের মধ্যে শুধুআমেলীনে যাকাত তথা যাকাত উসূলকারী ব্যতীত বাকী সবগুলে খাতে দরিদ্র হওয়া, অভাব ও প্রয়োজন থাকা শর্ত। যদিও প্রথম দুটি খাতে ফকির,মিসকিন পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তথাপি বাকী খাত গুলোতেও এ শর্তটি বিদ্ধমান রয়েছে। (জাওয়াহিরুল ফিকহ ৩/১৯০)
আত্মীয়দের যাকাত দেয়া
নিজের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও আপনজন যদি যাকাতের হকদার হয় তাহলে তাদেরকে যাকাত দেওয়া দ্বিগুণ সাওয়াবের কাজ। এক্ষেত্রে যাকাত আদায়ের সাওয়াবের পাশাপাশি আত্মীয়তার হক আদায়ের সাওয়াব পাওয়া যাবে। তবে আত্মীয়দের মধ্যে চার প্রকার অত্মীয়দের যাকাত দেওযা যাবে না।
১. নিজের পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানি এভাবে উপরের দিকে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় স্বজন।
২. নিজের সন্তানাদি,নাতি-পুতি এভাবে নিচের দিকে রক্তের সম্পর্কের বংশধর।
৩-৪.স্বামী,স্ত্রী একে অপরকে যাকাত দিতে পারবে না। উল্লিখিত চার প্রকার আত্মীয়-স্বজন ব্যতীত অন্য সকল আত্মীয় যেমন,ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা, শশুর-শাশুড়ি, তাদের সন্তানাদি যদি যাকাতের হকদার হয় তাহলে তাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে। (আল বাহরুর রায়েক ২/৪২৫)
মুহতারাম হাযিরীন ! যাকাত দেওয়ার অন্যতম একটি উত্তম ক্ষেত্র হলো, দেশের দীনি প্রতিষ্ঠানের গোরাবা ফান্ড। এ ফান্ড থেকে দরিদ্র, অসহায়, অনাথ শিশুদের লিখা-পড়া ও খাবার খরচ বহন করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে যাকাত দিলে যাকাতের আদায়ের পাশাপাশি সদকায়ে জারিয়ার সওয়াবও পাওয়া যাবে।
আমার অর্থের সহযোগিতায় যদি অসহায়, দরিদ্র, এতিম কোন শিশু কুরআন ও কুরআনের ইলম শিখে, পরবর্তীতে তার মাধ্যমে এই ইলমের সিলসিলা যতদিন চালু থাকবে ততদিন এর সওয়াব আমি পাইতে থাকবো। এদিকে আমরা বিশেষভাবে খেয়াল রাখবো, ইনশাআল্লাহ।
যাকাতেস সম্পদের মালিক মূলত হকদার ব্যক্তিরাই
প্রিয় মুসল্লি সাহেবান ! যাকাত হিসেবে দরিদ্রদের হাতে আমরা যা তুলে দেই, মুলত তা তাদের হক। এ অর্থের মূল মালিক তারাই। কেননা,আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন,
অর্থ-সম্পদে আছে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতদের নির্ধারিত হক।’ (সুরা মাআরিজ ২৪-২৫)
তাই, তাদের ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বরং শুকরিয়া আদায় করা যে আমি তার প্রাপ্য হক তাকে বুঝিয়ে দিতে পেরেছি। তাই উচিত হলো, হাকদারদের নিকট যথাযথ সম্মানের সাথে যাকাত পৌঁছে দেওয়া।
কিন্তু অত্যান্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের সমাজে যাকাত দেওয়ার নামে দরিদ্র মানুষদের জমায়েত করা হয়। এতে বিশৃঙ্খল একটা পরিবেশ তৈরি হয়। যাকাত নিতে এসে ভিড়ের মধ্যে পরে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে এমন নযিরও আছে। যাকাত নিয়ে এমন তামাশার কোন মানে হয় না। অনেকে আবার যাকাত দেওয়ার জন্য যাকাতের শাড়ি,লুঙ্গি খোঁজ করে থাকে। কোন কোন দোকানে সাইনবোর্ড লাগানো থাকে ‘এখানে যাকাতের শাড়ি লুঙ্গি পাওয়া যায়’ এসব দোকান থেকে খুবই নিম্ন মানের শাড়ি-লুঙ্গি কিনে অনেকে যাকাত দিয়ে থাকি। অথচ,দানের ক্ষেত্রে কুরআনের বার্তা হলো,
‘তোমরা কিছুতেই পুণ্যের নাগাল পাবে না যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় জিনিস দান না করবে।’ (সূরা বাকারা ৯২)
অন্য আয়াতে এসেছে,
‘তোমারা যা কিছু উপার্জন করেছ তার উৎকৃষ্ট জিনিস সমূহ থেকে একটি অংশ আল্লহর পথে ব্যয় করো’।(সূরা বাকারা ২৬৭)
এজন্য আমাদের একটু অবহেলার কারণে এত দামি আমল যেন নষ্ট না হয়ে যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আমারা যদি কাপড়-চোপড় কিনে যাকাত দিতে চাই, তাহলে একটু ভালো মানের কাপড়-চোপড় দেওয়ার চেষ্টা করবো।
শেষ কথা : যাকাতের অনেক মাসআলা-মাসাইল রয়েছে। অনেক আধুনিক বিষয়ও আছে। আমাদের কোন কিছু জানার প্রয়োজন হলে সরাসরি বিজ্ঞ মুফতিয়ানে কেরাম থেকে জেনে নিব। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহীহভাবে যাকাত আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন! ইয়া রাব্বাল আলামীন।



