আমরা সব বিষয়ে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করি বাট রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করি না। আমদের উচিত দ্বীনী বিষয়ে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করা। বিশেষ করে সামনে রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করা। চলুন আজ দেখে নেই আমরা কীভাবে
রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি
গ্রহণ করতে পারি। আশা করছি পূর্ণ প্রবন্ধটি পড়লে উপকৃত হতে পারবেন। চলুন পড়ি ও আমল করি।
রহমত, বরকত, মাগফেরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে সমহিমায় উপস্থিত হয় রমজানুল মুবারক। লাইলাতুন নিসফা মিন শাবান অতিবাহিত হয়েছে। শাবান মাস ২৯/৩০ দিন পূর্ণ হলেই শুরু হবে এ বরকতময় রমজান মাস।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই মাস আগে থেকে রোজার প্রস্তুতি শুরু করতেন। রজব মাস আসলেই প্রিয় নবি রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। রোজা রাখতেন, নামাজ পড়তেন, বেশি বেশি এ দোয়া করতেন- উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান। অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসের বরকত দান করুন এবং আমাদেরকে রমজানে পৌঁছে দিন।
রমজানের পূর্ণ রহমত, বরকত ও ক্ষমা পাওয়ার জন্যে আমরা নিম্নে বর্ণিত রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি নিতে পারি ৷
এক. একনিষ্ঠভাবে তওবা ও ইস্তেগফার করা মুমিন ব্যক্তি যেহেতু এক মহান মাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাই অনতিবিলম্বে নিজের মাঝে ও স্বীয় রবের মাঝে যে গুনাহগুলো রয়েছে এবং নিজের মাঝে ও অন্য মানুষের মাঝে অধিকার ক্ষুণ্ণের যে বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলো থেকে দ্রুত তওবা করে নেয়া উচিত।
যাতে করে সে পূত, পবিত্র মন ও প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে এ মুবারক মাসে প্রবেশ করতে পারে এবং আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে মশগুল ও লিপ্ত হতে পারে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আর হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্র কাছে তওবা কর; যাতে করে সফলকাম হতে পার।”[আন-নূর : ৩১] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “হে লোকেরা, আপনারা আল্লাহ্র কাছে তওবা করুন। আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে ১০০ বার তওবা করি।”[মুসলিম, ২৭০২]
আরও পড়ুনঃ শবে বরাতের ফজিলত ও আমল
দুই. কোন ওয়াজিব রোজা নিজ দায়িত্বে থেকে থাকলে তা হতে মুক্ত হওয়াও রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণের মধ্যে পড়ে।
আবু সালামাহ্ হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কে বলতে শুনেছি যে,
তিনি বলেন: كان يكون علي الصوم من رمضان فما أستطيع أن أقضي إلا في شعبان. অর্থঃ “আমার উপর বিগত রমজানের রোজা বাকি থাকলে শা‘বান মাসে ছাড়া আমি তা আদায় করতে পারতাম না।” [বুখারী,১৮৪৯ ] হাফেয ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন:“আয়েশা (রাঃ) এর শাবান মাসে কাযা রোজা আদায় পালনে সচেষ্ট হওয়া থেকে বিধান গ্রহণ করা যায় যে, রমজানের কাযা রোজা পরবর্তী রমজান আসার আগেই আদায় করে নিতে হবে।”[ফাতহুল বারী,৪/১৯১]
তিন. রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি স্বরূপ শাবান মাসে কিছু রোজা রাখা ।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত যে তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনভাবে সিয়াম পালন করতেন যে, আমরা বলতাম–তিনি আর সিয়াম ভঙ্গ করবেন না এবং এমনভাবে সিয়াম ভঙ্গ করতেন যে আমরা বলতাম–তিনি আর সিয়াম পালন করবেন না।
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে রমজান ছাড়া অন্য কোন মাসের গোটা অংশ রোজা পালন করতে দেখিনি এবং শাবান ছাড়া অন্য কোন মাসে অধিক সিয়াম পালন করতে দেখিনি।” [বুখারী,১৮৬৮) ও মুসলিম,১১৫৬]
চার. স্ত্রী-পুত্রসহ পরিবারের সকল সদস্যকে নিয়ে বসে রমজানের ফযিলত, বরকত ও মাসয়ালা-মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করা এবং ছোটদেরকেও রোজা পালনে উদ্বুদ্ধ করা। এটাও রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ।
পাঁচ. যে কাজগুলো রমজান মাসে একজন মুসলমানের ইবাদত বন্দেগীতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে সেগুলো দ্রুত সমাপ্ত করার চেষ্টা করা।
ছয়. বেশি বেশি দোআ করা: কিছু কিছু সলফে সালেহীন হতে বর্ণিত আছে যে, তারা ৬ মাস আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন যেন আল্লাহ তাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছান। রমজানের পর পাঁচ মাস দোয়া করতেন যেন আল্লাহ তাঁদের আমলগুলো কবুল করে নেন। তাই একজন মুসলিম তার রবের কাছে বিনয়াবনতভাবে দোয়া করবে যেন আল্লাহ তাআলা তাকে শারীরিকভাবে সুস্থ রেখে, উত্তম দ্বীনদারির সাথে রমজান পর্যন্ত হায়াত দেন।
সে আরো দোয়া করবে আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে নেক আমলের ক্ষেত্রে সাহায্য করেন। আরো দোয়া করবে আল্লাহ যেন তার আমলগুলো কবুল করে নেন।
সাত. রমযান মাসের আমলের রুটিন করা রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে গণ্য।
মানুষের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। সবার আয়ু নির্ধারিত। দুনিয়ার ছোট্ট জীবন শেষে রয়েছে পরকালের সীমাহীন জীবন। এ দুনিয়ায় কেউ চিরকাল থাকবে না। সবাই মৃত্যুবরণ করবে। মানুষ এক একটি দিন অতিবাহিত করেই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই জীবনের মূল্যবান সময়কে শ্রেষ্ঠ সম্পদ মনে করতে হবে।

তা হিসাব করে ব্যয় করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা সময়ের রুটিন করে নিতে হবে। বিশেষ করে রমজানুল মুবারকে ৷ রমজান মাসজুড়ে যে যেই কাজেই থাকুক না কেন, পুরো সময়টি কোন কোন কাজে কীভাবে ব্যয় হবে তার একটি সম্ভাব্য রুটিন তৈরি করে নেয়া। আগাম রুটিন থাকলে রমজানে চরম ব্যস্ততার মাঝেও নেক আমলসহ অন্যান্য কাজগুলোও ইবাদতের মধ্যেই কেটে যাবে। এক কথায় সব কাজের তালিকা করে নেয়া।
আট. প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসে চাঁদের হিসাব রাখতে দিন গণনা করতেন। আর রমজানের নতুন চাঁদ দেখার জন্য অপেক্ষা করতেন। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসের চাঁদের হিসাব যেভাবে রাখতেন অন্য কোনো মাসের হিসাব সেভাবে রাখতেন না। পরে চাঁদ দেখে রোজা রাখতেন।’ (মুসনাদে আহমদ)
আরও পড়ুনঃ নারী পুরুষের নামাজের পার্থক্য
হজরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নতুন চাঁদ দেখতেন তখন বলতেন- اللهم أهله علينا باليمن والإيمان والسلام والإسلام ربي وربك الله উচ্চারণ : আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ঈমানি ওয়াস্সালামাতি ওয়াল ইসলামি ওয়াত্তাওফিকি লিমা তুহিব্বু ওয়া তারদা রাব্বুনা ওয়া রাব্বুকাল্লাহ। অর্থ : আল্লাহ মহান, হে আল্লাহ! এ নতুন চাঁদকে আমাদের নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদয় কর। আর তুমি যা ভালোবাস এবং যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও, সেটাই আমাদের তাওফিক দাও। আল্লাহ তোমাদের এবং আমাদের প্রতিপালক।’ (সুনানে দারেমী, হাদীস নং,1697)
প্রিয় পাঠক, আপনি রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ নামক শিরোনামে যে প্রবন্ধটি পড়লেন। চেষ্টা করবন তার উপর আমল করার জন্য। এবং দাওয়াত হিসেবে মানুষের কাছে শেয়ার করবে। আল্লাহ সকলকে রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন।



