লাইলাতুল কদর ; ফযিলত ও আমল
শুরুর কথা : আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মুহাম্মাদীকে অন্য সকল নবীর উম্মত থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পবিত্র কুরআনে এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা হলে সর্ব শ্রেষ্ঠ উম্মত”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উম্মতকে অনুগ্রহ প্রাপ্ত উম্মত বলে ঘোষণা করেছেন,‘আমার এই উম্মত দয়াপ্রাপ্ত’। (আবু দাউদ ৮৭২৪ সহীহ)
এই উম্মতই অন্য সকল উম্মতের আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘আমরা দুনিয়াতে সর্বশেষ আগমন কারী, সর্বাগ্রে জান্নাতে প্রবেশকারী’। (বুখারী ৭৭৪)
পাশাপাশি জান্নাতে এ উম্মতের সংখ্যাই হবে সবচেয়ে বেশি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি আশাকরি তোমরা সমস্ত জান্নাতিদের অর্ধেক হবে। (বুখারি ৪৪৮৪)
এই উম্মতকে আল্লাহ তায়ালা সর্বদিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আর এই শ্রেষ্ঠত্বের পিছনে বড় পাঁচটি কারণ রয়েছে।
শ্রেষ্ঠত্বের বড় পাঁচটি কারণ
এই উম্মতকে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ অনুগ্রহে পাঁচটি জিনিস দান করেছেন,
এই উম্মত পেয়েছে শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে, পেয়েছে শ্রেষ্ঠ কিতাব আল কুরআন, শ্রেষ্ঠ মাস রমাদান আর শ্রেষ্ঠ রাত লাইলাতুল কদরকে, পাশাপাশি পেয়েছে শ্রেষ্ঠ দিন জুমা ও দুই ঈদকে। এই পাচঁ সায়্যিদ, উম্মতে মুহাম্মাদীকেও সায়্যিদ বানিয়ে দিয়েছে।
মুহতারাম হাযিরীন ! লাইলাতুল কদর এমন এক মর্যাদাপূর্ণ রাত যা উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্বের পিছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই এক রাতের মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মাদীর আমলনামায় হাজার মাস ইবাদতের সওয়াব জমা পড়ে।
লাইলাতুল কদরের নাম করণের কারণ
এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলে নাম করণের বেশ কিছু কারণ রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হলো, ১. কদর অর্থ হলো নির্ধারণ করা। এ রাতে যেহেতু পূর্ণ বছরের যবতীয় বিষয় যেমন, রিযিক, জন্ম, মৃত্যু, বিপদাপদ, মুসিবত, সফলতা ইত্যাদি সকল বিষয় নির্ধারণ করা হয়, তাই এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘ এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়। সূরা দুখান -৪
২. কদর অর্থ হলো মর্যাদা। এ রাতে যেহেতু শ্রেষ্ঠ কিতাব আল কুরআন নাযিল হয়েছে। তাই তাকে লাইলাতুল কদর বলা হয়। ইমাম কুরতুবি রাহি.বলেন,،قدر ذا كتابا فيها أنزل ألنه بذلك سميت ‘লাইলাতুল কদর এজন্য বলা হয়, কারণ এ রাতে মর্যাদাবান কিতাব নাযিল হয়েছে। (তাফসসীরে কুরতুবি ২০/১৩১)
৩. কেউ কেউ বলেন এ রাতে ইবাদতের মর্যাদা অনেক বেশি। এর মাধ্যমে মানুষ মর্যদাবান হতে পারে এজন্য লাইলাতুল কদরকে লাইলাতুল কদর বলা হয়। তাফসীরে কুরতুবিতে এসেছে,
“এ রাতকে লাইলাতুল কদর বা মর্যাদাবান রাত এজন্য বলা হয়, এ রাত জাগ্রত থেকে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তয়ালার কাছে যার কোন ধরণের মান,মর্যাদা ছিলনা সেও অনেক মার্যাদাবান হয়ে যায় ”। (তাফসসীরে কুরতুবি ২০/১৩১)
সূরা কদরের শানে নুযূল ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর
শানে নুযূল : বাইহাকি শরিফে এসেছে,
“নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি ইসরাঈলের এক ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন যে হাজার মাস আল্লাহর পথে যুদ্ধের ময়দানে কাটিয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম তা শুনে আশ্চর্যান্বিত হলে আল্লাহ তায়ালা তাদের সান্তনার জন্য সূরায়ে কদর নাযিল করেছেন”। (আস সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী ৮৫২২ মুরসাল )
তাফসীরে ইবনে কাসিরে এসেছে, আলি ইবনে উরওয়া হতে বর্ণিত তিনি বলেন,
“ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি ইসরাঈলের চারজন আবেদ তথা আইয়্যুব, যাকারিয়া, হিজকীল, ইউশা বিন নূন যারা আশি বছর লাগাতার আল্লাহর ইবাদত করেছেন, এক মুহুর্তও তারা আল্লাহার নাফরামনিতে লিপ্ত হন নি, তাদের কথা আলোচনা করলেন। এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম আশ্চর্যবোধ করলেন।
তখন জিবরীল আ. এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনার উম্মত তাদের আশি বছর লাগাতার ইবাতের কারণে অবাক হয়েছে? আল্লাহ তায়ালা এর চেয়ে উত্তম জিনিস আপনার উপর নাযিল করেছেন। অত:পর জিবরীল আ. হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই সূরাটি পড়ে শুনিয়ে দেন। ( তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৮৭৬)
সূরাটির সংক্ষিপ্ত তাফসীর
‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি লাইলাতু কদরে’। পবিত্র কুরআন আল্লাহ তায়ালা কদরের রাতে নাযিল করেছেন। আর তা ছিল রমাদান মাস। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“রমাদান মাস- যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে”।( সূরা বাকারা ১৮৫)।
রমাদান মাসে শুধু কুরআনই নয় বরং পূর্ববর্তী অনেক আসমানি কিতাব এ মাসে নাযিল করা হয়েছে, তাফসিরে তাবারীতে এসেছে, কাতাদা রাযি.বলেন,
‘রমাদানের প্রথম রাতে ইবরাহীম আ.এর উপর সহীফা নাযিল হয়। তাওরাত নাযিল হয় রমাদানের ষষ্ঠ রাতে। যাবুর নাযিল হয়েছে ষোলই রমাদান। ইনজিল নাযিল হয়েছে আঠারই রমাদান’। (তাফসীরে তাবারী ৫/৭১ সহিহ ।)
রমাদান মাসের সাথে আসমানি কিতাবের সুনিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পবিত্র কুরআনও রমাদানের লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ হয়েছে। লাইলাতুল কদরে কুরআন নাযিলের দ্বারা উদ্দেশ্য বর্ণনা করে ইমাম কুরতুবী রাহি. বলেন,
‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কুরআন নাযিলের সূচনা হয় শবে কদরে। আর কেউ কেউ বলেন, এ রাতে সম্পূর্ণ কুরআন লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আকাশের বাইতুল ইজ্জা নামক স্থানে অবর্তীণ হয়। অত:পর সেখান থেকে জিবরীল আ. অল্প অল্প করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে আসতেন। যা তেইশ বছরে শেষ হয়। (তাফসীরে কুরতুবী ২০/১৩০, তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন ৩/৬৬৭)।
‘আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর এক হাজার মাস অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ’। এ আয়াতে লাইলাতুল কদরের ফযিলত বর্ণনা করা হয়েছে । অর্থাৎ এক হাজার মাস ইবাদত করলে যে সওয়াব হতে পারে এই এক রাত ইবাদতে তার চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। (তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন ৩/৬৬৭)।
‘সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ প্রত্যেক কাজে তাদের রবের অনুমতি ক্রমে অবতীর্ণ হয়’। সে রাতে অসংখ্য অগণিত ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়। ইমাম কুরতুবী রাহি বলেন,
‘এ রাতে প্রত্যেক আসমান এবং সিদরাতুল মুনতাহা থেকেও ফেরেশতা নেমে আসেন। তাদের মাঝখানে থাকেন জিবরীল আ.। তারা জমিনে এসে এ রাতে দোয়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের দোয়ায় আমীন আমীন বলতে থাকেন। ফজর পর্যন্ত এরূপ করতে থাকেন। আর রুহ দ্বারা উদ্দেশ্য জিবরীল আ.।
আরও পড়ুন: ফতারের সহীহ দোয়া ও মতিউর রহমানের মিথ্যাচার
এসব হাদিসে বিষয়টি স্পষ্ট যে, লাইলাতুল কদর রমাদানের শেষ দশকের কোন এক বেজোড় রাতে রয়েছে। প্রতিটি বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ ব্যাপারে প্রতি রাতের জন্য আলাদা আলাদা সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
সাতাইশ রজনি লাইলাতুল কদর হওয়ার কিছু প্রমাণ
যদিও শেষ দশকের সবগুলো বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর সপক্ষ্যে সহীহ হাদিসও আছে। তথাপি সাতাইশ তারিখ রজনি লাইলাতুল কদর হওয়ার ব্যাপারে অনেকগুলো সহীহ হাদিস রয়েছে। পাশাপাশি জুমহুরের বক্তব্য মতে সাতাইশ তারিখে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নি¤েœ এমন কিছু প্রমাণ তুলে ধরা হলো,
১. আল্লাহর নবীর প্রিয় একজন সাহাবী হযরত উবাই বিন কাব রাযি. শপথ করে বলেন,
“আল্লাহর কসম! কোন রাতটি কদরের তা আমি জানি। সেটি হলো এ রাত, যে রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। ২৭ রমাদান তারিখে সকালের পূর্বের রাত। ” সহিহ মুসলিম ৭৬২
২. অন্য হাদিসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে লাইলাতুল কদর তালাশ করে সে যেন সাতাইশ রজনিতে তালাশ করে”। (মুসনাদে আহমাদ ৪৮০৮ সহিহ )
ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
‘এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমি বৃদ্ধ,দুর্বল একজন ব্যক্তি,দাঁড়ানো আমার জন্য কষ্টকর। আমাকে এমন এক রাতের কথা বলুন যেন আল্লাহ তায়ালার তাওফিকে তা আমার জন্য লাইলাতুল কদর হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি সপ্তম রাত তথা সাতাইশ রজনিকে আকড়ে ধর’। (মুসনাদে আহমদ ২১৪৯ সহিহ)
৪. ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহি. লাইলাতুর কদর নিয়ে নথিদীর্ঘ আলোচনার পর বলেন, “ জুমহুর তথা অধিকাংশের মতানুযায়ী লাইলাতুল কদর হলো সাতাইশ রজনী”। (ফাতহুল বারী লি ইবনে রজব ৮/৭৬৬)। ইমাম কুরতুবী রাহি.বলেন, ‘বড় একটি দল এর উপর যে, লাইলাতুল কদর সাতাইশ রজনি’। (তাফসীরে কুরতুবী ২০/১৩৪ )
৫. ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহি.বলেন, অনেকেই লাইলাতুল কদর সাতাইশ রজনি হওয়ার ব্যাপারে এভাবেও প্রমাণ পেশ করে থাকেন,
“সূরা কদরে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি তিনবার এসেছে। আর ‘লাইলাতুল কদর’ আরবীতে লিখতে নয়টি হফর প্রয়োজন হয়। আর ৩ সংখ্যাকে ৯ এর মাঝে গুণন করলে (৩ ঢ ৯) সাতাইশ হয়। লাতাইফুল মাআরিফ ২০২। যদিও এটি পৃথক কোন দলিল নয়, নুকতাহ হিসেবে কেবল উল্লেখ করা হলো।
তবে এ ব্যাপারে শেষ কথা হলো, লাইলাতুল কদর রমাদানের শেষ দশকের যে কোন বেজোড় রাতে হতে পারে। নিশ্চিতভাবে কোন রাতকে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়।
লাইলাতুল কদর গোপন থাকার রহস্য
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে প্রথমে অবহিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়। হাদিস শরিফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
‘আমি তোমাদের লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জানানোর জন্য বের হয়েছিলাম; কিন্তু তখন অমুক অমুক বিবাদে লিপ্ত থাকায় তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। হয়তোবা এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক’। (সহিহ বুখারি ৪৯)।
এ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নির্দিষ্ট না করাটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। এর কিছু ব্যাখা আমরা নিচে তুলে ধরছি..
১. নির্দিষ্ট করে না বলার কারণে রমাদানের শেষ দশকে, বিশেষ করে বেজোড় রাত্রিগুলোতে অনেক বেশি ইবাদাত হয়। বরং এক রাতের জন্য পাঁচ রাতে ইবাদত করা হয়। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনি রাহি. হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, “এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, লাইলাতুল কদরের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা ও সে রাত পাওয়ার জন্য অনেক আমল করা এটিই কল্যাণকর ”। (উমদাতুল কারী ১১/১৩৮)
গোপন থাকার হেকমত বর্ণনা করে উলামাগণ বলেন, যাতে করে এ রাত অন্বেষণে পরিশ্রম হয় আর্থাৎ এ রাত খোঁজতে গিয়ে যেন অনেক ইবাদত হয়ে যায়’। (ফাতহুল বারি লিবনি রজব ৪/২৬৬)।
২. যদি লাইলাতুল কদর জানিয়ে দেওয়া হত, তাহলে অনেক মানুষ এ রাতের উপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়তো। সারা বছর আমল না করে এই এক রাতের আমলের উপর ভরসা করে বসে থাকত। ইমাম ইবনু রজর রাহি. বলেন, “ যদি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো তাহলে এর উপরই সীমাবদ্ধ হয়ে যেত। (ফাতহুল বারি লিবনি রজব ৪/২৬৬)।
৩. নিশ্চিত জানা থাকার পর যদি বাস্তবিক কোন অপারগতাবশত এ রাতে আমল করা সম্ভব না হতো, তাহলে আফসোসের আর শেষ থাকত না। সারা জীবন এই আফসোস বয়ে বেড়াতে হতো। ৪. নির্দিষ্ট থাকলে এ রাতে যারা আল্লাহর নাফরমানিতে কাটায় তাদের শাস্তি ও ভয়ানক পরিণতি আরো দ্বিগুণ হয়ে যেত। জেনেশুনে এই পূণ্যময় রাতে নাফরমানিতে লিপ্ত থাকা একটি ভয়ংকর বিষয় হতো। (তাফসীরে রাযি ৩২/২২৯)।
লাইলাতুল কদরের কিছু আলামত
লাইলাতুল কদর নির্দিষ্ট না হলেও কিছু আলামাত হাদিস শরীফে পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে কিছুটা অনুমান করা যায় এটি লাইলাতুল কদর। এমন কিছু আলামত আমরা তুলে ধরছি,
১. সেদিন সকালের সূর্য উজ্জ্বল হবে তবে সূর্য্যের তেজ হালকা থাকবে। হাদিস শরীফে এসেছে, উবাই বিন কাব রাযি.বলেন,
“আর ওই রাতের আলামত হলো, সে রাত শেষে সকালে সূর্য উদিত হবে তা উজ্জ্বল হবে কিন্তু সে সময় তার কোন তীব্র আলোকরশ্মি থাকবে না অর্থাৎ অন্য দিনের তুলানায় কিছুটা নিষ্প্রভ হবে”। (সহিহ মুসলিম ৭৬২)
২. সে রাতে চাঁদ থালার একটি টুকরার মতো দেখাবে। হাদিস শরীফে এসেছে আবু হুরাইরা রাযি. বলেন,
আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে কদরের রাত সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেন তোমাদের মধ্যে কে সেই রাত স্বরণ করবে, যখন চাঁদ উদিত হয়ে থালার একটি টুকরার ন্যায় হবে। (সহিহ মুসলিম- ১১৭০)
৩-৫. রাতে গরম বা শীতের কোন তীব্রতা থাকবে না, রাতটি হবে স্বচ্ছ ও আরামাদায়ক, এক প্রকার প্রশান্তি অনুভব হবে। তারকাগুলো দৃশ্যমান থাকবে। ফাতহুল বারীতে এসেছে,
“সে রাতটি স্বচ্ছ ও আরামদায়ক হবে, অনেক গরম বা ঠান্ডা হবে না, তারকাগুলো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে”। ফাতহুল বারী ৪/২৬০
৬. রাতে মৃদুবাতাস ও হালকা বৃষ্টি হতে পারে। ফাতহুল বারীতে এসেছে, “লাইলাতুর কদর হলো, মৃদু বাতাস ও হালকা বৃষ্টির রাত”। ( ফাতহুল বারী ৪/২৬০)।
যদিও এই আলামতগুলো বিভিন্ন হাদিসে পাওয়া যায়, তথাপি এগুলোর মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে লাইলাতুল কদর নির্ধারণ করে ফেলা অনেকটাই অসম্ভব ব্যাপার।
লাইলাতুল কদরের আমল
১. কিয়ামুল লাইল : তথা বেশি বেশি কিয়ামুল লাইল বা নফল নামায পড়া। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে কিয়ামুল লাইল করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”সহিহ বুখারি ১৯০১।
৭. ইসতেগফার তথা গোনাহ মাফ চাওয়া : হাদিস শরীফে এসেছে আইশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু কে জিজ্ঞাসা করেন,
“হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তাহলে আপনি কী বলতে বলবেন? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি বলো, ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাকারী, আপনি মাফ করতে পছন্দ করেন, অতএব আপনি আমাকে মাফ করে দেন’ (সুনানে তিরমিযী -৩৫১৩)
৩. দোয়া করা : নিজের জন্য, নিজের পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বিশ্ব মুসলিমের জন্য দোয়া করা। ইমাম নববী রাহি. বলেন, ‘মুসতাহাব হলো, এ রাতে বেশি বেশি দোয়ার ইহতেমাম করা। বিশেষ করে মুসলমানদের যাবতীয় বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা’। (আল আযাকার ১৯১)।
৪ যিকির করা : কালিমা শাহাদতের যিকির করা, আল্লাহ তায়ালার কাছে জান্নাত চাওয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করা। হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল (সা:) বলেন, “রমাদান মাসে তোমরা চার কাজ বেশি করবে। অধিক পরিমাণে কালিমা-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং ইস্তেগফার পাঠ করবে আর আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত প্রার্থনা করবে।” শুয়াবুল ইমান ৩৩৩৬ যয়িফ ৪. কুরআন তিলাওয়াত করা : যেহেতু এ রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে তাই, এ রাতে কুরআন তিলাওয়াতে লিপ্ত থাকা। কুরআনের সাথে সম্পর্ক করা।
আপনি, “শবে মেরাজ, শবে বরাত ও শবে কদর কালেকশন” কিতাবটি ক্রয় করতে পারন। ক্রয় করতে এখানে ক্লিক করুন।
মোটকথা: নিজের মুনাসিব মতো যেকোন ইবাদতের মাধ্যমে রাত্রিটি জাগ্রত অবস্থায় কাটিয়ে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করা। তবে অবশ্যই এ বিষয়টি লক্ষ রাখেতে হবে এতে যেন ফজরের নামায বা জামাত ফওত না হয়ে যায়।
কারণ পূর্ণ রাত ইবাদতে কাটাতে না পারলেও যদি কমপক্ষে ইশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সাথে পড়া যায় তাহলেও পূর্ণ রাত ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যাবে। হযরত উসমান রাযি. থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ইশার নামায আদায় করলো সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত সালাত আদায় করলো। আর যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাতের সাথে আদায় করলো সে যেন সারা রাত জেগে সালাত আদায় করলো। সহিহ মুসলিম ৬৫৬।
সংক্ষেপে কদরের রাতের ফযিলত
১. এ রাতে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন নাযিল করেছেন। ২. এই রাতের ইবাদত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। ৩. এই রাতে ইবাদত করলে পূর্বের সকল গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। ৪. এই রাতে আল্লাহ তায়ালা অগণিত ফেরেশতা নাযিল করেন। ৫. এ রাতে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ রহমত নাযিল করেন। ৬. এ রাতে আল্লাহ তায়ালা মানুষের হায়াত, রিযিক ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় নির্ধারণ করেন। ৭. এই রাতের নামে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা পৃথক একটি সুরা নাযিল করেছেন।
মুহতারাম হাযিরীন! এ রাতের যেমন অসংখ্য ফযিলত ও মর্যাদা রয়েছে, তেমনি এ রাত হেলায়-খেলায় নষ্ট করে দেওয়ার পরিণামও বড় ভয়াবহ। এ রাত থেকে যে মাহরুম হবে, সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর থেকে বঞ্চিত হলো, সে সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। কেবল বঞ্চিত ব্যক্তিরাই তা থেকে বঞ্চিত হয়”। সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৪৪ সহিহ।
শেষ কথা : আমরা নিয়ত করি, লাইলাতুল কদরের ফযিলত লাভের আশায় এ রাতে বেশি বেশি আমল করবো, ইন-শা-আল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের ফযিলত নসীব করুন। আমাদের জীবনে বারবার রমাদান ও লইলাতুল কদর দান করুন। আমীন! ইয়া রাব্বাল আলমীন।



