ঈদুল ফিতরের বয়ান, ফযিলত ও আমল
অনেকেই গুগলে ঈদুল ফিতরের বয়ান, ফযিলত ও আমল লিখে সার্চ করেন। আজকের পরবন্ধটি তাদের জন্য যারা গুগল থেকে পড়ে জুমার বয়ান করেন। চলুন তাহলে আরম্ভ করি।
ঈদুল ফিতরের বয়ান, ফযিলত ও আমল
শুরুর কথা : হাসি-খুশি, আনন্দ উপভোগ ইত্যাদি মানুষের একটি ফিতরাত বা স্বভাবজাত চাহিদা। আর ইসলাম মানুষের এই স্বভাবজাত চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। কেননা ইসলাম হলো, ফিতরাতের ধর্ম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন,
ফিতরাত অনুযায়ী চল, যে ফিতরাতের উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন সাধন সম্ভব নয় ” সূরা রূম ৩০। ফিতরাতের এই দাবি থেকেই দীর্ঘ একমাস সিয়াম-সাধনার পর আল্লাহ তায়ালা এই খুশির ব্যবস্থা করেছেন। আজকের এই দিনে রোযা রাখাকে আল্লাহ তায়ালা হারাম করে দিয়েছেন। আজকের এই দিন খুশির দিন। ধনী-গরিব সবার জন্যই আনন্দের দিন। সমাজের বিত্তবানদের পাশাপাশি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষও যেন ঈদের এ খুশি উপভোগ করতে পারে সেজন্য ইসলাম সদকায়ে ফিতিরের মাধ্যমে তাদেরও কিছু অর্থের ব্যবস্থা দিয়েছে। আর প্রকৃতপক্ষে আজাকের আনন্দ তো কেবল তাদের জন্য যারা রমাদানের হক আদায় করতে পেরেছে। যারা হক আদায় করে রোযাগুলো রেখেছে, রমাদানের পবিত্রতা রক্ষা করেছে তাদের জন্য মূলত আজকের দিনটি মহা খুশি ও পুরস্কার প্রাপ্তির দিন।
ঈদকে ‘ঈদ’ কেন বলা হয়
ঈদ মানে ফিরে আসা, বারবার আসা ইত্যাদি। যেহেতু প্রতি বছর এই দু’টি দিন আল্লাহর তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি বিভিন্ন অনুগ্রহ ও রহমত নিয়ে উপস্থিত হয়, তাই তাকে ঈদ বলা হয়। ইমাম ইবনু আবেদিন শামি রাহি. বলেন,
‘ঈদকে ‘ঈদ’ এজন্য বলা হয়, কারণ প্রতি বছর এই দিনে আল্লাহ তায়ালার অনেক অনুগ্রহ বান্দার প্রতি আবর্তিত হয়। যেমন, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে দীর্ঘ এক মাস রোজার পর দিনের বেলা খাবার গ্রহণের অনুমতি, সাদাকাতুল ফিতির, ঈদুল আজহার সময় হজ্জ সম্পাদন করা, কুরবানি করা ইত্যাদি। এসব নেয়ামত আসার কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে খুশি ও আনন্দ অনুভব হয়’।
ঈদের ইতিহাস
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় আসলেন, তখন দেখতে পান মদীনার লোকেরা জাহেলী পন্থায় বছরে দুই দিন উৎসব পালন করে, আনন্দ-উল্লাস করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এই দুই দিন কি জন্য আনন্দ, ফুর্তি করো ? তারা বলল, জাহেলী যুগে আমরা এই দুটি উৎসব পালন করতাম। তখন রাসূল তাদের জন্য বিকল্প দুই ঈদের ব্যবস্থা করলেন। হাদিস শরীফে এসেছে আনাস রাযি. বলেন,
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন মদীনাবাসী নির্দিষ্ট দুটি দিনে খেলাধূলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন এ দু’টি দিন কিসের ? সকলেই বললো জাহিলী যুগে আমরা এ দু,দিন খেলাধূলা করতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদেরকে এ দু’দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিন ” সুনানে আবি দাউদ ১১৩৪
এই হাদিস থেকে দু’টি শিক্ষা
১.বিজাতীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা : এ হাদিসে স্পষ্ট যে, অমুসলিমদের উৎসব বর্জন করার জন্যই আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দুটি ঈদ দান করেছেন। সুতরাং আমরা আমাদের ঈদ উদযাপন করব, অমুসলিমদের সবধনের উৎসব থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ, উৎসব ধর্ম বাদ দিয়ে হয় না। উৎসবের সাথে ধর্মের সংযুক্তি থাকবেই।
এজন্য এমন স্লোগান ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ সম্পূর্ণ কুফরী স্লোগান। বরং ধর্ম যার উৎসবও হবে তার। তাই কোন মুসলমান বিজাতীর আচার-উৎসবে শরিক হওয়া, শুভেচ্ছা জানানো, সাহায্য-সহযোগিতা করা সবই হারাম। রাসুল (সাঃ) বলেন,
‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৫১১৪) অপর বর্ণনায় এসেছে,
‘যে ব্যক্তি বিধর্মীদের সমাবেশ ও পাপ কাজে সংখ্যা বৃদ্ধি করল, অবশ্যই তাদের সাথে তাকেও শাস্তি ভোগ করতে হবে (উমদাতুল কারী ১১/২৩৭)
হযরত উমর রাযি বলেন,
আরও পড়ুন: সহীহ হাদিসের আলোকে তারাবির নামায কত রাকাত
‘তোমরা কাফের ও মুশরেকদের উপাসনালয়ে তাদের উৎসবের দিনগুলোতে প্রবেশ করো না। কারণ,সেই সময় তাদের উপর আল্লাহর গজব নাযিল হয়’। (আল আদাব লি ইবনে আবী শায়বা পৃঃ১৫৩) হযরত উমর রাযি. আরো বলেন,”
‘তোমরা আল্লাহর দুশমনদের উৎসবগুলোতে অংশ গ্রহণ হতে বিরত থাক,। (আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী ৯/৩৯২)
২. ইসলামে ঈদ কেবলমাত্র দুটি : পূর্বের হাদিসে একথাও স্পষ্ট যে, ইসলামে ঈদ কেবলমাত্র দুটি। একটি ঈদুল ফিতর, আর দ্বিতীয়টি হলো, ঈদুল আযহা। এছাড়া অন্য কোন ঈদ নেই। কেউ যদি নিজের পক্ষ থেকে অন্য কোন ঈদ আবিষ্কার করে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং তা বিদআত বলে গণ্য হবে যা পরিত্যাজ্য ও বর্জনীয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ করতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা অন্য কোন দিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করো না’। মুসান্নাফে আবদির রাযযাক ৩৫৮৩।
তাই, নবীর জন্মকে কেন্দ্র করে ঈদে মিলাদুন্নাবী নামে কোন ঈদ ইসলামী শরিয়তে নেই। রাসূলের জন্মদিনে ঈদ নয় বরং ওই দিন সুন্নাহ সম্মত আমল হলো রোযা রাখা। হাদিস শরিফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি সোমবার দিন রোজা রাখতেন। তাঁকে রোযা রাখার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি’। সহিহ মুসলিম ৬৬১১
ঈদের হাকিকত
ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য বছরে দুটি ঈদ তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার আয়োজন করেছে। তবে এ দুটি উৎসব আয়োজনে ইসলামের রয়েছে বিশেষ কিছু একক বৈশিষ্ট্য। যা অন্য কোন ধর্ম বা মতবাদে পাওয়া যায় না।
বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মালম্বীরা পূর্বের কোন বিশেষ ঘটনাকে স্বরণ করার জন্য উৎসব পালন করে থাকে। যেমন নসারারা নিজেদের পক্ষ থেকে যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন নির্ধারণ করে বড়দিন পালন করে, ইহুদিরা হযরত মুসা আলাহিস সালাম ও বনী ঈসরাইলের মুক্তি আর ফেরাউনের সাগরে ডুবে মরার দিনকে কেন্দ্র করে উৎসব পালন করে থাকে। অনুরূপ মুশরিকরাও যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিভিন্ন কাল্পনিক ও বানোয়াট ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানান উৎসবের আয়োজন করে থাকে।
কিন্তু, ইসলামের স্বাতন্ত্র এখানেই যে, পুরো উম্মাহর ঈদ বা খুশি উদযাপনের জন্য ঐতিহাসিক কোন কিছুকে নির্ধারণ করেনি। যদিও ইসলামের শৌর্য-বীর্য ও গৌরব গাঁথা ঐতিহাসিক ঘটনার কোনো অভাব নেই। এরপরও ইসলাম আনন্দের দুটি উৎসব ওই সকল ঐতিহাসিক কোন ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করেনি। বরং দুটি ঈদকে ইসলামের মহান দুটি রুকনের সাথে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ঈদুল ফিতরকে সিয়াম এর সাথে, আর ঈদুল আযহাকে হজ্জে বাইতুল্লাহর সাথে।
ঈদে খুশির মূল কারণ দু’টি
১. ইসলামের মৌলিক দু’টি রুকন আদায়ের শোকরিয়া প্রদর্শন স্বরূপ খুশি প্রকাশ করা : এক মাস রোযার বিধান পালন ও হজ্জে বাইতুল্লাহর মতো ইসলামের মৌলিক রুকন আদায় করা অনেক বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। এ দু’টি বিধান পালনের পর শোকরিয়া আদায় করার জন্যই ঈদ বা খুশির আয়োজন।
কারণ, মুমিনের আলামত হলো যখন সে ভালো কাজ করার সুযোগ পাবে তখন তার অন্তরে একধরণের আনন্দ ও খুশি অনুভব হবে। এটি মুমিনের অন্যতম একটি বড় পারিচয়ও বটে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“তোমার নেক কাজ যদি তোমাকে আনন্দ দেয় এবং পাপ কাজ তোমাকে কষ্ট দেয় তাহলে তুমি মুমিন” সহীহ ইবনে হিব্বান সহীহ ৬৩১
২. আল্লাহর পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও নাজাত লাভে আনন্দ প্রকাশ করা : আল্লাহ তায়ালা দুই ঈদের দিনে অসংখ্য বান্দাকে মাগফিরাত দান করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে দেন। মুমিনের এর চেয়ে বেশি খুশির কোন কারণ হতে পারে না। ইবনে রজব রাহি বলেন,
“ঈদুল ফিতরের দিন সমস্ত উম্মতের জন্য ঈদ ও আনন্দের দিন হওয়ার কারণ হলো, ওই দিন আল্লাহ তায়ালা রোযাদারদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। ফলে যারা গোনাহগার তারাও নেককারদের দলে শামিল হয়ে যায়। আর ঈদুল আযহার দিন বড় ঈদ হওয়ার কারণ হচ্ছে, এর আগের দিন হলো, আরাফার দিন, যেদিন এত বিপুল পরিমাণ লোকদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, সারা বছরের আর কোনো দিন এত লোককে মুক্তি দেওয়া হয় না”।
ঈদ তো তাদেরই যারা আজ মাগফিরাতের অধিকারী হবে
ঈদের খুশি কেবল তাদেরই যারা আজকের এই দিনে মাগফিরাত আর ক্ষমার পুরস্কার লাভে ধন্য হবে। কারণ আজকের দিন হলো, পুরস্কার প্রাপ্তির দিন। ইমাম ইবনু রজব রাহি. বলেন,
“ঈদের দিনকে পুরস্কারের দিন বলা হয়”। লাতাইফুল মাআরিফ২০৮ অর্থাৎ পুরো রমাদান মাস ছিল প্রতিযোগিতা পর্ব। আর আজকে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হবে।
ا “আল্লাহ তায়ালা রমাদান মাসকে বান্দাদের জন্য প্রতিযোগিতার ময়দান বানিয়েছেন। এ মাসে মানুষ আল্লাহর আনুগত্বের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে অগ্রসর হয়। একদল এতে বিজয়ী হয় এবং তারাই সফল আর অপর দল পরাজিত হয় যারা ক্ষতিগ্রস্ত।” (লাতাইফুল মাআরিফ ২০৯)
“যখন ঈদুল ফিতিরের দিন হয় তখন আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন। এবং বলেন, আমার বান্দাগণ! তোমরা আমার জন্য রোযা রেখেছ, আমার জন্য কিয়ামুল লাইল করেছ, যাও তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম”। (লাতাঈফুল মাআরিফ ২০৮ )

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. ঈদের দিন বলতেন,
“জানি না, আমাদের মধ্যে কে পুরস্কৃত হয়েছে, তাকে আমরা অভিবাদন জানাতাম ! আর কে বঞ্চিত, তার জন্য আমরা শোক প্রকাশ করতাম! হে পুরস্কৃত! তোমাকে অভিনন্দন। হে বঞ্চিত! আল্লাহ তোমার ক্ষতিপূরণ করুন”। (লাতাইফুল মাআরিফ ২৩৫)
আবু মানছুর শীরাজী রাহি. বলেন,
‘যাকে অঞ্জলি ভরে দান করা হলো, ঈদ তো তার জন্য নয়। ঈদ তো হলো ওই ব্যক্তির জন্য, যার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হলো’। (মুজামুস সাফার ৩০২)
‘ঈদের দিন যাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তার জন্য সেদিন ঈদ ও খুশির দিন আর ওই দিন যে মুক্তি পায়নি তার জন্য এদিন কান্না ও বিলাপের দিন’। (লাতাইফুল মাআরিফ, ২৩৭-২৩৮)
ঈদের দিনের বিশেষ কিছু আমল
১. আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করা : আমরা পূর্ণ মাস সিয়াম সাধনা করার সুযোগ পেয়েছি, রমাদানের মতো নেয়ামাত আমরা পেয়েছি সেজন্য আল্লাহ তায়ালার প্রতি শোকরগুজার হতে হবে। কারণ শোকরিয়া আদায় করা আল্লাহ তায়ালার প্রিয় একটি ইবাদত। এ করণে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘আর তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে, তিনি তোমাদের জন্য তা পছন্দ করবেন’। (সূরা যুমার ৭) পাশাপাশি শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা নেয়ামতকে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘যদি তোমারা কৃতজ্ঞতা আদায় করো তাহলে তোমাদের নিয়ামত আরো বড়িয়ে দিব’ (সূরা যুমার ৭)
এছাড়াও আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা ঈদের দিনের বিশেষ একটি আমল। রোযার বিধান ফরজ করার পর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘এবং তিনি চান যাতে তোমরা যেন রোযার সংখ্যা পূরণ কর, এবং তিনি যে পথ দেখিয়েছেন এজন্য তাকবির পাঠ কর এবং শুকরিয়া আদায় কর’। (সূরা বাকারা ১৮৫ )
২. তাকবিরের চেতনা জাগ্রত করা : ঈদুল ফিতরে আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করার বিশেষ একটি আমল হলো, তাকবীর তথা আল্লাহর বড়ত্ব বর্ণনা করা। এটি ঈদের দিনের আন্যতম একটি আমল। ঈদের রাত থেকেই এ আমল শুরু হয়ে যায়, ঈদের নামায পর্যন্ত তা চলতে থাকে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ বলেন,
‘এবং তিনি চান যাতে তোমরা যেন রোযার সংখ্যা পূরণ কর, এবং তিনি যে পথ দেখিয়েছেন এজন্য তাকবির পাঠ কর’। (সূরা বাকারা ১৮৫ )
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের দিন বেশি বেশি তাকবির পড়তেন। হাদিস শরীফে এসেছে ,
‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতিরের দিন তাকবীর বলতে বলতে ঈদগাহে যেতেন। নামায পড়ার আগ পর্যন্ত তাকবির বলতেন।’( মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৫৬২১ )
তাকবিরময় এ দিনে খুতবার মধ্যেও বেশি বেশি তাকবির বলা সুন্নাহ সম্মত আমল। হাদিস শরীফে এসেছে,
“নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই ঈদের খুতবায় বেশি বেশি তাকবির বলতেন”। (সুনানে ইবনে মাজাহ ১২৮৭ যয়িফ)
শুধু খুতবাতেই নয় ববং ঈদের নামযের মধ্যেও অতিরিক্ত ছয়বার আল্লাহু আকবার বলে তাকবির বলাকে ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে। হাদিস শরীফে এসেছে, রসুলের একজন সাহাবি বলেন,
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নিয়ে ঈদের নামায পড়লেন এবং চারটি করে তাকবির (অর্থাৎ প্রথম রাকাতে তাহরীমার তাকবির ও অতিরিক্তি তিন তাকবির, আর দ্বিতীয় রাকাতে রুকর তাকবির ও এর আগে অতিরিক্ত তিন তাকবির) দিলেন”। (তাহাবী শরীর ৩১৩৩ হাসান )
তাই আজকের এই ঈদুল ফিতর উদযাপনের পুরো বিষয়টিই ‘আল্লাহু আকবার’ এর চেতনাকে জাগ্রত ও উজ্জীবিত করার। তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ব বর্ণনা করাই ঈদুল ফিতরের প্রধান তাৎপর্য।
আরও পড়ুন: তারাবির নামাজের দোয়া পড়া কি বিদআত
৩. আমলগুলো কবুল করানো ও মাগফেরাত লাভের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করা : এক মাস আল্লাহর বিধান সিয়াম-সাধনার পর আজ আমরা আমাদের আমল আল্লাহর দরবারে কবুল করিয়ে তার কাছ থেকে মহা প্রতিদান নিতে এসেছি। এজন্য আমাদের আল্লাহ তায়ালার দিকে খুব মুতওয়াজ্জিহ থাকতে হবে। একটাই চাওয়া আমাদের, আল্লাহ যেন আমাদের আমলগুলো কবুল করে নেন। আমাদেরকে মাগফিরাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন।
এটিই আল্লাহ তায়ালার দরবারে আজ আমাদের প্রধান চাওয়া-পাওয়া। এজন্য বেশি বেশি দোয়ার ইহতেমাম করতে হবে। ওমর বিন আব্দুল আযীয রাহি. ঈদের খুতবায় বলতেন,
‘হে লোকসকল! তোমরা এক মাস রোযা রেখেছ ও তারাবীহের নামায পড়েছ, আর আজ ঈদগাহে এসেছ এই দোয়া করার জন্য, যেন আল্লাহ তোমাদের আমলগুলো কবুল করে নেন’ (লাতাইফুল মাআরিফ ২০৯।) এজন্য এই মুহুর্তে আমাদের উচিত হবে সর্বোচ্চ তাকওয়া অবলম্বন করা। কারণ, আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের আমলকে গ্রহণ করে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আল্লাহ তায়ালা কেবলই মুত্তাকীদের থেকে (আমল) কবুল করেন ” (সূরা মায়িদাহ ২৭)।
এছাড়াও ঈদের দিনে আরো কিছু সুন্নাত আমল রয়েছে, গোসল করা, ঈদগাহে যাওয়ার আগে খেজুর বা মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া। নিজের কাছে থাকা সবচেয়ে ভালো জামা পারিধান করা। সুগন্ধি ব্যবহার করা। এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া ও ভিন্ন রাস্তা দিয়ে আসা। ফরজরের নামাযের পর থেকে ঈদের নামায আদায় পর্যন্ত কোন নফল নামায না পড়া, তদ্রুপ ঈদগাহে ঈদের নামাযের পর কোন নফল নামায না পড়া।
ঈদের খুশি উদযাপনের পদ্ধতি
ইসলাম যেমনভাবে তার অনুসারীদের জন্য দুটি ঈদের ব্যবস্থা করেছে তেমনি ঈদের খুশি প্রকাশের পদ্ধতিও ইসলাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর তা হলো, ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে সম্মিলিতভাবে দু’রাকাত নামায আদায় করা এবং এর মাধ্যমে শোকরিয়া আদায় করা। পশাপাশি ঈদগাহে যাওয়ার আগে সাদাকাতুল ফিতির আদায় করা। হাসান বসরী রাহি. বলেন,
“ ঈদুল ফিতর হলো, ঈদের নাময পড়া ও সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা। আর ঈদুল আযহা হলো, ঈদের নামায পড়া ও কুরবানি করা। (শুয়াবুল ঈমান ৩৪৩৭)।
এছাড়ারও আজকের এই দিনে আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা বিশেষ একটি আমল। বৈধ ও শরিয়ত সমর্থিত যে কোন পন্থায় আনন্দ উদযাপন করা যাবে। হাদিস শরীফে এসেছে আইশা রাযি. বলেন,
“ আবু বকর রাযি. আমার কাছে আসলেন, এ সময় দুজন (নাবালিকা) মেয়ে ওই গজলটি গাচ্ছিল যা আনসারগণ বু’আস যুদ্ধের সময় গেয়েছিলেন। ওই দুটি মেয়ে অবশ্য গায়িকা ছিল না। আবু বকর রাযি. বললেন একি ? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির জন্য উৎসবের ব্যবস্থা আছে । আর এটা হচ্ছে আমাদের উৎসবের দিন।” (সহীহ মুসলিম ৮৯২)
তাই ঈদের দিন নিজেও খুশি থাকা এবং নিজের পরিবার পরিজন সাবার জন্যই সাধ্যমতো খুশি ও আনন্দ উদযাপনের পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া। আল্লামা ইবনু আসকালানী রাহি. বলেন,
‘ঈদের দিনে পরিবারের জন্য সব ধরনের বৈধ বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেওয়া যাতে, তাদের অন্তর প্রফুল্ল থাকে। শরীরটাকেও এদিন ইবাদত-বন্দেগি থেকে একটু হালকা রাখা। এদিন নফল ইবাদত না করাই শ্রেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঈদের দিনে আনন্দ প্রকাশ দীনের নিদর্শন’। (ফাতহুল বারি ২/৪৪৩)
আনন্দের আতিশয্যে যেন রমাদানের আমল বরবাদ না হয়ে যায়
পবিত্র রমাদান মাসে শয়তান বন্দি ছিল, নফস দুর্বল ছিল, গোনাহের পরিবেশও কম ছিল, তাই গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা অনেকটা সহজ ছিল। পাশাপাশি রমাদানে আমরা অনেক আমল করেছি। সিয়াম-সাধানা করেছি, তাকওয়ার চর্চা করেছি, দান-খয়রাত, তিলাওয়াত, নামায ইত্যাদি অনেক ইবাদত করেছি। সেগুলোকে আমরা শরীয়তে নিষিদ্ধ কোন আনন্দের মাধ্যমে নষ্ট না করে ফেলি। আমাদের ঈদ যেন অমুসলিমদে পর্ব-উৎসবের মত নিছক পার্থিব আমোদ-প্রমোদের ক্ষেত্র না হয়ে যায়, সেদিকেও খুব খেয়াল রাখতে হবে। যদি অমুসলিমদের উৎসবের মতো নাচ,গান, ডিজে পার্টি, অশ্লিলতা, বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনার কোন আয়োজন আমাদের ঈদ উৎসবে থাকে তাহলে এজন্য দুনিয়া আখিরাতে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাঃ বলেন,
‘যারা বিধর্মীদের মতো উৎসব পালন করবে। কিয়ামত দিবসে তাদের হাশর ওই লোকদের সাথেই হবে’। (আস সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী ৯/৩৯২ )
এজন্য আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমরা নিজেরাও কোন ধরণের গোনাহে লিপ্ত হবো না। আমাদের সন্তান বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদেরকেও গোনাহের পরিবেশে যেতে দিবনা। আমাদের মা, বোন, মেয়েদের জন্য শতভাগ পর্দা-পুশিদা নিশ্চিত করবো। আমরা অভিবাকগণ যদি সতর্ক থাকি তাহলে পর্দাহীনতা ও বেপর্দার পরিবেশ অনেকটাই কমে আসবে।
চোখের গোনাহ যেন না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ,চোখের গোনাহই অন্যসব গোনাহের ভুমিকা হিসেবে কাজ করে। তাই এদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা। ওয়াকী ইবনুল জাররাহ রাহি. বলেন, ঈদের দিন সুফিয়ান সাউরী রাহি.এর সাথে বের হলাম। তিনি বললেন,
“আজকের দিন যে কাজের মাধ্যমে আমরা ঈদের সূচনা করব তা হল দৃষ্টির হেফাযত”। (আলওয়ারা ৬৩ )
আবু হাকীম রাহি. বলেন, হাসসান ইবনে আবু সিনান রাহি ঈদের নামায থেকে ফিরে আসার পর তার স্ত্রী তাকে দৃষ্টির গুনাহ থেকে বেঁচেছেন কি না জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন,
“কী বলছ! ঘর হতে বের হওয়া থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত দৃষ্টি কেবল পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির প্রতি নিবদ্ধ ছিল। (হিলইয়াতুল আওলিয়া ৩/১১৫)
ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়
ঈদের দিন রাসূলের সাহাবীগণ পরস্পরে সাক্ষাত হলে যে বাক্যের মাধ্যমে একে-অপরকে আমল কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করতেন। জুবায়ের বিন নুফায়ের রাহি. বলেন,
كان أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا التقوا يوم العيد يقول بعضهم لبعض تقبل الله منا ومنك
ঈদের দিন সাহাবায়ে করাম মিলিত হলে একে-অপরের উদ্দেশে বলতেন, تقبل الله منا ومنك আল্লাহ আমাদের থেকে এবং আপনাদের থেকে (সকল আমল) কবুল করুন। (ফাতহুল বারী ২/৪৪৬ হাসান)।
আমাদের সমাজে ‘ঈদ মোবারক ’ বলে একে অপরের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের যে প্রচলন আছে, এভাবেও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা যাবে। তবে সুন্নাহ সম্মত পূর্বের দোয়াটির প্রচলন ঘটানো উচিত। (ফাতাওয়ায়ে কাসেমীয়া ৩/১৭৬)
ঈদের নামাযের পর মুসাফাহা ও মুআনাকা
ঈদগাহে আমরা ব্যাপকভাবে মুসাফাহা ও মুআনাকা,কোলাকুলিতে লিপ্ত হয়ে পড়ি। অথচ এগুলো ঈদের দিনের কোন বিশেষ আমল নয়। ঈদের কোন আমল মনে করে ঈদগাহে মুসাফাহা ও মুআনাকা বা কোলাকুলি করা সবই বেদআত বলে গণ্য হবে। তবে, কারও সঙ্গে অনেকদিন পর ঈদের মাঠেই দেখা হলো, তার সঙ্গে মুসাফাহা, মুআনাকা করতে অসুবিধা নেই। বিশিষ্ট মুফতি কিফায়েতুল্লাহ রাহি. বলেন, ঈদে মুআনাকা করা কিংবা ঈদের বৈশিষ্ট্য মনে করে মুসাফাহা করা শরিয়তসম্মত নয়; বরং এটি বিদআত যা পরিত্যাজ্য ও বর্জনীয়। (কেফায়েতুল মুফতি : ১/৬৬৬-১১২ )
শেষ কথা : মুমিনের সুখ-দু:খ, হাসি-কান্না সবই দীন ও আখেরাত কেন্দ্রিক। সুতরাং মুমিনের ঈদ ও আনন্দ অমুসলিমের উৎসব-বিনোদনের, আমোদ-ফুর্তির মতো হবে না। মুমিন তার ঈদ উদযাপনে আল্লাহর নাম ভুলবে না, শরীয়তের সীমা অতিক্রম করবে না এবং বিজাতির উৎসব ও আমোদ-প্রমোদের অনুসরণ করবে না, গুনাহে লিপ্ত হবে না। মুমিন অন্যান্য সকল বিষয়ে যেমন নবীজীর সুন্নাহর অনুসরণ করে এবং সালফে সালেহীন তথা মহান পূর্বসূরিদের আদর্শের অনুসরণ করে, ঈদের আনন্দ উদযাপনেও তাঁদেরই অনুকরণ করবে। ঈদুল ফিতরের বয়ান, ফযিলত ও আমল প্রবন্ধটি সবার মাঝে ছড়িয়ে দিন।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আলামীন।





