মুহতারাম হাজিরিন, বাংলা বর্ষপঞ্জির হিসেবে আরও একটি বছর আমাদের জীবন থেকে বিদায় নিল এবং নতুন একটি বছর শুরু হলো । সময়ের এই পরিবর্তন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হচ্ছি । বৈশাখ মাসের মাধ্যমে আমাদের দেশে বর্ষ গণনা শুরু হয়, কিন্তু এই নতুন বছরকে ঘিরে আমাদের সমাজে বর্তমানে যে শিরক ও পৌত্তলিকতার মহড়া চলে, তা একজন মুমিনের জন্য চিন্তার বিষয় । আজ আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দেখব, পহেলা বৈশাখ পালনের পদ্ধতি এবং এর পেছনের বিশ্বাসগুলো ইসলামের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ।
পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রেক্ষাপট
আমাদের দেশে বর্ষবরণ উদযাপনে বর্তমানে অনেক নতুন প্রথা যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া এবং হালখাতা খোলা । ‘শুভ নববর্ষ’ স্লোগানের মাধ্যমে এই উৎসব উদযাপন করা হয় ।
ইতিহাসের পাতায় বর্ষবরণ
-
১৯৬০-এর দশক থেকে ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানট আয়োজিত সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষবরণ এক ভিন্ন মাত্রা পায় ।
-
১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সর্বপ্রথম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ শুরু হয়।
-
পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে এই ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ।
মঙ্গল শোভাযাত্রার ধর্মীয় গোড়াপত্তন
অনেকে মনে করেন এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক উৎসব। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে ভিন্ন ধর্মের বিশ্বাস। হিন্দু ধর্ম মতে, দেবী দুর্গা অসুরকে দমন করে এবং এই বিশ্বাস থেকেই অশুভ শক্তি তাড়াতে মঙ্গল কামনা করা হয় । ১৯৮৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের জনৈক ছাত্রের মাধ্যমে এটি এ দেশের মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায় ।
পহেলা বৈশাখ: ইসলাম কী বলে?
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বর্তমান পদ্ধতির প্রায় প্রতিটি কাজই ইসলামের মৌলিক আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক । নিচে এর কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. নতুন উৎসবের অনুপ্রবেশ
ইসলামে আনন্দ প্রকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট দুটি দিন বরাদ্দ করা হয়েছে—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা । রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় গিয়ে দেখলেন সেখানকার মানুষ দুটি দিনে আনন্দ উৎসব করে। তিনি যখন জানতে চাইলেন এগুলো কীসের দিন, তারা জানালো এগুলো জাহিলি যুগের উৎসব । তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন:
“আল্লাহ তাআলা তোমাদের এই দুই দিনের পরিবর্তে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন—ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর” (সুনানে আবি দাউদ-১১৩৪) ।
সুতরাং, মুমিনদের জন্য নিজস্ব ধর্মীয় উৎসবের বাইরে অমুসলিমদের অনুকরণে কোনো নতুন উৎসব পালনের সুযোগ নেই ।
২. শিরক ও পৌত্তলিকতার সংমিশ্রণ
পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গা হলো এর শিরকি অনুষঙ্গ। মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রতীক ও মূর্তি মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজনীয় প্রাণীর প্রতিচ্ছবি ।
- ইঁদুর: এটি গণেশের বাহন ।
- ইগল: বিষ্ণুর বাহন ।
- সিংহ ও বাঘ: দেবী দুর্গার বাহন ।
- পেঁচা: এটি লক্ষ্মীর বাহন এবং কথিত মঙ্গলের প্রতীক ।
- মহিষ: মৃত্যু দেবীর বাহন ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমরা মূর্তির নাপাকি থেকে বিরত থাক” (সুরা হজ: ৩২) । শিরক এমন এক অপরাধ, যা মানুষের পূর্বের সমস্ত নেক আমল নষ্ট করে দেয় এবং এর কোনো ক্ষমা নেই ।
৩. লাভ-ক্ষতির মালিকানা নিয়ে ভ্রান্ত বিশ্বাস
মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিভিন্ন পশুপাখির মূর্তিকে কল্যাণ বা মঙ্গলের প্রতীক মনে করা হয় । ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, কল্যাণ বা অকল্যাণ, লাভ বা ক্ষতির একমাত্র মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা । আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
“তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন সৃষ্টির ইবাদত করছো, যা তোমাদের কোনো উপকার বা অপকার করার শক্তি রাখে না?” (সুরা মায়েদা: ৭৬) ।
শয়তানের উপাসনা কল্পনা করে রাক্ষস-খোক্ষসের মুখোশ পরা এই বিশ্বাসে যে—শয়তান খুশি হয়ে অমঙ্গল করবে না—এটি সরাসরি শিরক ।
৪. বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ
পহেলা বৈশাখ এবং এর আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠানগুলো মূলত হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির অংশ । হাদিসে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, যারা বিজাতির অনুসরণ করবে, তারা তাদেরই দলভুক্ত বলে গণ্য হবে । হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি অমুসলিমদের দেশে গিয়ে তাদের নওরোজ বা নববর্ষ পালন করবে এবং সেই অবস্থায় মারা যাবে, কিয়ামতের দিন তার হাশর তাদের সাথেই হবে । আরো পড়ুন: এ সপ্তাহের জুমার বয়ান: Mufti Rejaul Karim
সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়
উৎসবের নামে পহেলা বৈশাখে যা হয়, তা কেবল ধর্মীয়ভাবেই নয়, বরং নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ:
- বিপুল অর্থের অপচয়: শোভাযাত্রা ও মূর্তিপূজার প্রস্তুতির জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করা হয়, যা কুরআনের ভাষায় শয়তানের কাজ । আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই” (সুরা বনি ইসরাইল: ২৭) ।
- বেপর্দা ও বেহায়াপনা: এই উৎসবে গান-বাজনা, ডিজে এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার আয়োজন থাকে, যা যুবসমাজকে চারিত্রিক ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় ।
- খাদ্যাভ্যাসে সাদৃশ্য: কাফেরদের উৎসব উপলক্ষে বিশেষ খাবার তৈরি করা বা উপহার বিনিময় করাও ওলামায়ে কেরামের মতে হারাম ।
আমাদের দায়িত্ব ও করণীয়
একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে এই দিনে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে:
- উৎসব বর্জন করা: নিজে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করা এবং সন্তানদেরও শরিক হতে বাধা দেওয়া । হাদিস অনুযায়ী, পরিবারের কর্তাব্যক্তি তার অধীনস্থদের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে ।
- অন্তর থেকে ঘৃণা পোষণ করা: যদি শক্ত হাতে এই গর্হিত কাজ বন্ধ করার ক্ষমতা না থাকে, তবে অন্তত মনে মনে এর প্রতি ঘৃণা পোষণ করতে হবে ।
- দাইয়ুস হওয়া থেকে বাঁচা: যে ব্যক্তি তার পরিবারকে পাপাচারে লিপ্ত হতে দেখেও বাধা দেয় না বা ঘৃণা করে না, তাকে ‘দাইয়ুস’ বলা হয়, যার জন্য জান্নাত হারাম ।
- সচেতনতা তৈরি করা: আলেমদের দায়িত্ব হলো সাধারণ মানুষের সামনে এই উৎসবের অসারতা ও ধর্মীয় ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা ।



