Responsive Menu with Logo & Banner
Banner

শাবান মাসে রমজানের প্রস্তুতি-2025

Picture of মুফতি রেজাউল করিম

মুফতি রেজাউল করিম

প্রফেশনাল ওয়েবসাইট ডিজাইনার

ইসকন কি? বাংলাদেশে ইসকনের কার্যক্রম

আমরা দুনিয়াবী কাজে পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকি। ঠিক তেমনি ভাব শাবান মাসে রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। আজকের প্রবন্ধে আলোচনা করব, কীভাবে আমরা শাবান মাসে রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারি।

মাহে রমাদানের আগমনী বার্তা; মুমিনের প্রস্তুতি

শুরুর কথা :  আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মুহাম্মাদীকে অন্য সকল নবীর উম্মত থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পবিত্র  কুরআনে এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা হলে সর্ব শ্রেষ্ঠ উম্মত”। রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উম্মতকে অনুগ্রহ প্রাপ্ত উম্মত বলে ঘোষণা করেছেন,  (‘আমার এই  উম্মত দয়াপ্রাপ্ত’। (আবু দাউদ ৮৭২৪ সহিহ)

এই উম্মতই অন্য সকল উম্মতের আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,  ‘আমরা দুনিয়াতে সর্বশেষ আগমন কারী, সর্বাগ্রে  জান্নাতে প্রবেশকারী’। (বুখারি ৭৭৪)

 পাশাপাশি জান্নাতে এ উম্মতের সংখ্যাই হবে সবচেয়ে বেশি। রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি আশাকরি তোমরা  সমস্ত জান্নাতিদের অর্ধেক হবে’। (বুখারি ৪৪৮৪)

এই উম্মতকে আল্লাহ তায়ালা সর্বদিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দান  করেছেন। আর এই শ্রেষ্ঠত্বের পিছনে বড় পাঁচটি কারণ রয়েছে। পাচঁ কারণে এই উম্মত শ্রেষ্ঠ উম্মত হয়েছে।

শ্রেষ্ঠত্বের বড় পাঁচ কারণ

এই উম্মতকে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ অনুগ্রহে পাঁচটি জিনিস দান করেছেন,

এই উম্মত পেয়েছে শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে, পেয়েছে শ্রেষ্ঠ কিতাব আল কুরআন,  শ্রেষ্ঠ মাস রমাদান আর শ্রেষ্ঠ রাত লাইলাতুল কদরকে, পাশাপাশি পেয়েছে শ্রেষ্ঠ দিন জুমা ও দুই ঈদকে। এই  পাচঁ সায়্যিদ, উম্মতে মুহাম্মাদীকেও সায়্যিদ বানিয়ে দিয়েছে। 

মুহতারাম হাযিরীন ! এসব ফযিলতপূর্ণ বিষয়গুলোর কারণে এই উম্মত স্বল্প হায়াত পেয়েও অন্যান্য উম্মত যারা  দীর্ঘকাল হায়াত পেয়েছে তাদের চেয়ে মর্যাদা আর শ্রেষ্ঠত্বে অগ্রগামী হয়েছে। এগুলোর কারণে তাদের অল্প  আমলের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এ সব কিছুই এই উম্মতের প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ।  হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

 “আগেকার উম্মতের হায়াতের তুলনায় তোমাদের হায়াত হলো,আসর হতে সূর্য অস্ত যাওয়ার মর্ধবর্তী সময়ের  ন্যায়। তাওরাত অনুসারীদেরকে তাওরাত দেয়া হয়েছিল। তারা তদনুযায়ী কাজ করতে লাগলো; যখন দুপুর  হলো, তখন তারা অপারগ হয়ে পড়লো।

তাদের এক এক কিরাত করে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। আর ইনজীল অনুসারীদের ইনজিল দেওয়া হলো, তারা আসরের নামায পর্যন্ত কাজ করে অপারগ হয়ে গেল। তাদেরকে এক  এক কিরাত করে পারিশ্রমিক প্রদান করা হলো। অত:পর আমাদেরকে কুরআন দেওয়া হলো, আমরা সূর্যাস্ত  পর্যন্ত কাজ করলাম। আমাদের দু’ দু’ কিরাত করে দেওয়া হলো।

এতে কিতাবী সম্প্রদায় বললো, হে আমাদের  প্রতিপালক! তাদের দু’ দু’ কিরাত করে দান করেছেন, আর আমাদের দিয়েছেন এক এক কিরাত করে; অথচ  আমলের দিক থেকে আমরাই বেশি (আমরা সময় বেশি পেয়েছি)। আল্লাহ তায়ালা বললেন, তোমাদের  পারিশ্রমিকের ব্যাপারে আমি কি যুলুম করেছি? তারা বললো, না। তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, এ হলো,  আমার অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তাকে দেই। সহীহ বুখারী ৫৫৭

শাবান মাসে রমজানের প্রস্তুতি

মুহতারাম হাযিরীন ! আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বিশেষভাবে যে উপহারগুলো দিয়েছেন,এর মধ্যে একটি  হলো, মাহে রমাদান বা সিয়াম-সাধনার মাস। ইবাদতের এই বষন্তকাল আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। অল্প কিছুদিন পরই সে মহান মাসের আগমন ঘটবে। এই মহান মাসকে বরণ করার জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নিতে  হবে। মাহে রমাদানের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য আগেই নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। পূর্ব থেকেই  পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কারণ, এ মাস উপলক্ষে শুধু দুনিয়াতেই নয় বরং ঊর্ধ্ব জগতেও ব্যাপক প্রস্তুতি  শুরু হয়। 

মুবারক এ মাসকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্ব জগতের প্রস্তুতি

এ মাসকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্ব জগতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। আল্লাহ তায়ালা তাকবীনি (পরিচালনাগত)  অনেক কিছু পরিবর্তন আনেন। 

১.জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া : এ মাসকে উপলক্ষ্য করে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেন,  হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,   “ যখন রমাদানের শুভাগমন হয় তখন জান্নাতের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।” সহীহ বুখারী ১৮৯৮

অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,  “এ মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং এর কোন দরজাই তখন আর বন্ধ করা হয় না।” সুনানে  তিরমিযী ৬৮২ সহিহ

২. রহমতের দরজা খুলে দেওয়া : এ মাসকে কেন্দ্র করে আল্লাহ তায়ালা রহমতের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে  দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

 “ যখন রমাদান মাস আসে তখন রহমতের দরজাগুলো উন্মোচিত করা হয়” সহীহ মুসলিম ১০৭৯  ৪. জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া : পবিত্র রমাদান মাস আসলে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামের দরজাগুলো  বন্ধ করে দেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 

 “রমাদান মাস আসলে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, এবং এর একটি দরজাও তখন আর  খোলা হয় না।” সুনানে তিরমিযী ৬৮২ সহিহ

৪. শয়তানকে শিকলবদ্ধ করা : পবিত্র এ মাসে মুমিন বান্দা যেন নির্বিঘেœ ইবাদত করতে পারে সেজন্য আল্লাহ  তায়ালা শয়তানকে শিকলবদ্ধ করে রাখেন। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

 “ এ মাসে শয়তানদের শিকলবদ্ধ করে রাখা হয়” সহীহ মুসলিম ১০৭৯

৫. দুষ্ট প্রকৃতির জিনদের আবদ্ধ করে রাখা: এ মহান মাসে আল্লাহ তায়ালা দুষ্ট প্রকৃতির জিনদের আবদ্ধ করে  রাখেন। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

 “ রমাদানের শুরুর রাতেই শয়তান ও দুষ্ট প্রকৃতির জিনদের শিকলে আবদ্ধ করে দেওয়া হয়।” সুনানে তিরমিযী  ৬৮২ সহিহ

৬. ভালো কাজের প্রতি উদ্ভুদ্ধ করার জন্য ঘোষক নির্ধারণ: এ মাসে নেক আমল করতে ও গোনাহ থেকে বেঁচে  থাকতে একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে। হাদিস শরিফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেন,

এই মাস উপলক্ষ্যে আল্লাহ তালার পক্ষ থেকে এজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকে, “হে কল্যাণ  অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও। হে পাপাচারী! থেমে যাও” সুনানে তিরমিযী ৬৮২ সহিহ

মাহে রমাদান উপলক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রস্তুতি

মুহতারাম হাযিরীন! পবিত্র এ মাস শুরু হওয়ার পূর্বেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রস্তুতি মূলক বেশ  কিছু কার্যক্রম হাতে নিতেন। নিম্নে আমরা সেগুলো তুলে ধরছি,

১. প্রস্তুতি বার্তা : রমাদান মাস শুরুর পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে রমাদানের আগমনি বার্তা শুনাতেন। তাদেরকে রমাদানের সুসংবাদ দিতেন। এ মাসের খাইর-বারাকাত ও ফযিলতের কথা  তাদের সামনে তুলে ধরে রমাদানের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত হতে বলতেন। হাদিস শরীফে এসেছে, রমাদান মাস শুরু  হওয়ার পূর্বে সাহাবাদের লক্ষ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

 “তোমাদের সামনে রমাদানের শুভাগমন হচ্ছে, যা একটি বরকতময় মাস। তোমাদের উপর আল্লাহ তায়ালা  এই মাসে রোজাকে ফরজ করেছেন। এ মাসের আগমনে জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের  দরজা সমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, আর আল্লাহর অবাদ্ধ শয়তানদের গলায় লোহার বেড়ি পড়ানো হয়। এ মাসে  একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে  প্রকৃতপক্ষে বঞ্চিত রয়ে গেল ”। সুনানে নাসায়ী ২১০৬ সহিহ

শুয়াবুল ঈমানের এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাদানকে স্বাগত জানিয়ে  সাহাবাদের উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেন,

“হে লোক সকল! তোমাদের সামনে এমন এক মাস আসছে, যা অত্যন্ত মর্যাদাশীল ও বরকতময়। এ মাসে  এমন এক রাত রয়েছে যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তায়ালা এই মাসে রোজা ফরজ করেছেন এবং  রাতের কিয়ামকে নফল করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কোন নফল ইবাদত করল, সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ ইবাদত করল। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ ইবাদত করল, সে যেন অন্য মাসে ৭০টি ফরজ আদায় করল। শুয়াবুল ইমান ৩৩৩৬ যয়িফ।

আরও পড়ুন: সহীহ হাদিসের আলোকে তারাবির নামায কত রাকাত

ইমাম ইবনু রজব রাহি. বলেন,

هذا الحديث أصل في تهنئة الناس بعضهم بعضا بشهر رمضان 

“এসব হাদিসে মূলত একে অপরকে মাহে রমাদানের অভিনন্দন ও স্বাগত বার্তা জানানো হয়েছে”। লাতাইফুল  মাআরিফ ১৪৮ 

২. চাঁদের হিসাব রাখার নির্দেশ : সাহাবাদেরকে ভালোভাবে শাবান মাসের চাঁদের হিসাব রাখতে বলতেন,  যাতে করে সবাই রমাদানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন। হাদিস শরিফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

 “তোমারা রমাদানের জন্য শাবানের চাঁদ গণনা করে রাখো।” সুনানে তিরমিযী ৬৮৭ সহিহ। ৩. রমাদান শুরুর পূর্বে কম্পকে দুই দিন রোযা না রাখার নির্দেশ : শবানের পুরা মাসে রোযার প্রতি উদ্ভুদ্ধ  করলেও রমাদান শুরু হওয়ার দু’এক দিন পূর্বে রোযা না রেখে রমাদানের রোযার জন্য শক্তি সঞ্চার করতে  নির্দেশ দিতেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

 “রমাদানের একদিন বা দুই দিন পূর্বে তোমরা নফল রোজা রেখো না।” সহিহ মুসলিম ১০৮২

এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনু রজব রহি.বলেন,

إنه أمر بذلك للتقوي على صيام رمضان فإن مواصلة الصيام قد تضعف عن صيام الفرض فإذا حصل الفطر قبله بيوم  أو يومين كان أقرب إلى التقوي على صيام رمضان

“রমাদানে রোজা রাখার জন্য নিজেকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে এই নির্দেশ দিয়েছে। কেননা, ধারাবাহিক  রোজার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে, তাই রমাদানের রোজার দু’একদিন পূর্বে রোজা না রাখলে  রামদানের জন্য শক্তি অর্জনে অধিক উপযোগী হবে।” লাতাইফুল মাআরিফ ১৪৫

৪. শ্রমিকের কাজ কমিয়ে আনা : রমাদান মাসে সবশ্রেণীর মানুষ যেন সুন্দরভাবে রোজা রাখতে পারে সেজন্য শ্রমিকের কাজ কমিয়ে দিতে উৎসাহ প্রদান করতেন। হাদিস শরীফে এসেছে, নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াসাল্লাম বলেন,

 “যে ব্যক্তি এই মহিমান্বিত মাসে নিজ কর্মচারীদের কাজের বোঝা হালকা করে দিবে আল্লাহ তায়ালা তাকে  ক্ষমা করবেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন”। শুয়াবুল ইমান ৩৩৩৬ যয়িফ।

সাহাবায়ে কেরামের প্রস্তুতি

মুহতারাম হাযিরীন ! এই মহান মাস পাওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরাম অনেক আগ থেকেই উদগ্রীব হয়ে  থাকতেন। প্রায় ছয় মাস আগ থেকে এ মাস পাওয়ার জন্য দোয়া করতে থাকতেন,

قال معلى بن الفضل: كانوا يدعون الله تعالى ستة أشهر أن يبلغهم رمضان

তাবেয়ী মুআল্লা ইবনু ফযল বলেন, সাহবায়ে কেরাম ছয় মাস আগ থেকেই এ মাস পাওয়ার জন্য ফরিয়াদ  করতে থাকতেন।

ইয়াহইয়া ইবনু আবি কাসির বলেন,

كان من دعائهم : اللهم سلمني إلى رمضان

“সাহাবাগণ এরূপ দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! পবিত্র রমাদান পর্যন্ত আমাকে নিরাপদে পৌঁছে দিন”। লাতাইফুল  মাআরিফ ১৪৮ 

মুহতারাম মুসল্লি সাহেবান! রমাদান মাস পাওয়া অনেক বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। এর মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা বহুগুণে বেড়ে যায়। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে দুই ব্যক্তির আলোচনা হচ্ছিল, যারা দুই জন এক সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের একজন আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেন। আর অপরজন এক বছর পর স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু জান্নাতে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি 

শহিদের আগে প্রবেশ করেছে। সাহাবায়ে কেরাম এটা শুনে আশ্চর্যবোধ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া  সাল্লাম বলেন, 

 “অপর লোকটি কি তার পর একবছর জীবিত থাকেনি ? তাঁরা বললো হ্যাঁ। তিনি বলেন, সে একটি রমাদান  মাস পেয়েছে, রোজা রেখেছে এবং এক বছর যাবৎ এই এই নামায পড়েনি ? তাঁরা বললো হ্যাঁ, অত:পর রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,আসমান-জমিনের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তাদের দু’জনের মাঝে  রয়েছে তার চেয়ে অধিক ব্যবধান।” সুনানে ইবনু মাজাহ ৫২২৩ সহিহ

হায়াত কামনা করা

মুহতারাম হাযিরীন! এজন্য আল্লাহ তায়ালর কাছে নেক হায়াত কামনা করা যাবে। রমাদান মাস পাওয়ার জন্য  আল্লাহ তালার কাছে প্রার্থনা করা যাবে। হায়াত বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করতে কোন সমস্যা  নেই। কারণ, বিভিন্ন আমালের মাধ্যমে হায়াত বৃদ্ধি পায় এমন অনেক বর্ণনা রয়েছে। এক হাদিসে এসেছে,  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

 ‘দোয়া ব্যতীত অন্য কোন কিছুই ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে না এবং সৎ কাজ ব্যতীত অন্য কোন কিছুই  হায়াত বাড়াতে পারে না। ’ সুনানে তিরমিজী ৭১৪৯ হাসান 

অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 

 ‘নিশ্চয় আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় থাকলে নিজেদের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসা তৈরী হয় এবং ধন-ম্পদ  ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়’। সুনানে তিরমিজী ১৯২৯ সহিহ।

সলফ ও আকাবিরগণের রমাদান পূর্ব প্রস্তুতি

মুহতারাম হাযিরীন ! আমাদের সলফ ও আকাবিরগণ রমাদান উপলক্ষে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন।  রমাদানের অনেক আগ থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে দিতেন। রমাদানকে শুধুমাত্র ইবাদতের জন্যে রেখে দিতেন।  কারণ, রমাদান হলো ইবাদতের মৌসুম। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতেন, নিজের সর্বোচ্চ টুকু দিয়ে নেকের  পাল্লায় কিভাবে পুঁজি জমা করা যায় সেই চেষ্টা করতেন। কারণ, রমাদান মাসই হলো, নেক আমালের সওয়াব  ঘরে তোলার মোক্ষম সিজন। ইমাম আবু বকর আল বালখী রাহি.বলেন, 

شهر رجب شهر للزرع وشعبان شهر السقي للزرع ورمضان شهر حصاد الزرع

রজব মাস হলো, চারা রোপণের মাস, শাবান মাস হলো, তা পরিচর্যার মাস আর রমাদান হলো, ফসল ঘরে  তোলার মাস। লাতায়েফুল মাআরিফ ১২১

এজন্য রমাদানে সলফগণ অন্য সকল ব্যস্ততা থেকে অবসর হয়ে একনিষ্ঠভাবে ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন। সুফিয়ান  সাওরি রাহি.সম্পর্কে বর্ণিত আছে 

إذا دخل رمضان ترك جميع العِّادة وأقِّل على قراءة القرآن

“রমাদানে অন্য সকল কাজ থেকে অবসর নিয়ে কুরআন তিলাওয়তে লিপ্ত হয়ে যেতেন।” 

ইমাম মালেক রাহি. সম্পর্কে এসেছে, 

إذا دخل رمضان يفر من قراءة الحديث ومجالسة أهل العلم

“যখন রমাদান মাস শুরু হতো হাদিস পাঠ ও অন্যান্য ইলমি মজলিস এড়িয়ে চলতেন এবং রমদান কেন্দ্রিক  ইবাদাতে লিপ্ত হয়ে পড়তেন”। লাতায়েফুল মাআরিফ ১২১

সম্মানিত হাযিরীন! আমাদের নিকট অতীতের অনেক আকাবির যেমন, হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রাহি.,  কুতবে আলম রশিদ আহমদ গাঙ্গোহি, হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতভি, শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান  দেওবন্দি, হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানবি, শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানি রাহি.সহ অনেক  আকাবির এমন ছিলেন, যারা রমাদানে অন্য সব মাশগালা বাদ দিয়ে একনিষ্ঠ চিত্তে ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন।  রমাদানের আগেই তারা রমাদানের রুটিন সাজিয়ে ফেলতেন। কেউ কেউ পুরা রমাদান মাস এতেকাফে কাটিয়ে  দিতেন। আবার কেউ রমাদানের দশ দিন আগ থেকেই এতেকাফে বসে যেতেন।

শাইখুল হাদিস যাকারিয়া রাহি. রমাদানের আগেই তাঁর চিরচেনা রুটিন দরস-তাসরীস,কিতাব লেখালিখি,  তাবলিগ,তাসাওউফ ইত্যাদি যাবতীয় কাজ বন্ধ করে দিতেন। রমাদানে শুধুমাত্র একাগ্রচিত্তে রমাদান কেন্দ্রিক  ইবাদত ও তিলায়াতে লিপ্ত থাকতেন।

আমাদেকেও প্রস্তুতি শুরু করে দিতে হবে

মুহতারাম হাযিরীন : আমরা পবিত্র মাহে রমাদানের একেবারে দোরগোড়ায় আছি। অল্প কদিন পর মাহে রমাদান  শুরু হয়ে যাবে। তাই আমাদের এখই প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরা রমাদানের সারাদিন কিভাবে কাটাবো এখন  থেকেই একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এখনই সংকল্প করতে হবে যত কষ্টই হোক এই রমাদানের কোন  রোজাই আমি ছাড়ব না। কোন দিন তারাবিতে অনুপস্থিত হব না। 

মুহতারাম,এখন থেকেই পাচঁ ওয়াক্ত নামায মসজিদে এসে জামাতের সাথে পড়ার অভ্যাস করে ফেলতে হবে।  ফরজ নামাজের আগে পরের সুন্নাতের ইহতেমাম করতে হবে। আওয়াবিন, ইশরাক ইত্যাদি ফযিলপূর্ণ নামাযে  এখন থেকেই অভ্যস্ত হয়ে যেতে হবে।

আরও পড়ুন: তারাবির নামাজের দোয়া পড়া কি বিদআত

তাছাড়া, রমাদানে যেহেতু শেষ রাতে আমরা সাহরীর জন্য এমনিতেই  জাগ্রত হব, তাই ইচ্ছা থাকলে এ সময় দু’ চার রাকাত তাহাজ্জুদের আমলও সহজ হয়ে যাবে। যারা কুরআন  দেখে পড়তে পারি আমরা রমাদানে কতবার কুরআন খতম দিবো তাও এখন নির্ধারণ করে ফেলতে হবে। যারা  পড়তে পারি না, দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করি এই রমাদানে যেকোনো মূল্যে আমি আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত শিখব,  ইন শা আল্লাহ।

শেষ কথা : অল্প ক’দিন পরেই এই শেষ্ঠ মাসের আগমন ঘটবে। যদি আমি ইচ্ছা করি এ মাসে পাপ-পঙ্কিলতা  থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র হতে, তাহলে এর সুযোগ আছে। আর যদি আমি এই মূল্যবান সময়কে হেলায়-খেলায়  কাটিয়ে দিতে চাই, তারও সুযোগ আছে। রমাদান আমার জন্য বসে থাকবে না। ভালো কাজ করলেও চলে  যাবে, অবহেলা করলেও চলে যাবে।

 

কিন্তু মুহতারাম, এই সুযোগে যদি আল্লাহর কাছ থেকে মাগফেরাত নেওয়া  না যায়, বান্দা ও মনিবের মাঝে সম্পর্ক উন্নয়ন করা না যায়, তাহলে এর চেয়ে মাহরুমি আর আফসোসের কিছু  থাকবে না। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে পবিত্র এ মাস আসার আগেই পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে রমাদানের সকল খাইর-বারকাত হাসিল করার তাওফীক দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

👁️ পড়া হয়েছে: ২ বার

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
Twitter
Print
WhatsApp
LinkedIn
Telegram

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পর্কিত পোস্ট

পুঁজি ও অভিজ্ঞতা ছাড়া ছোট ব্যবসার আইডিয়া এবং সফল হওয়ার ৩টি মূলমন্ত্র

পুঁজি ও অভিজ্ঞতা ছাড়া ছোট ব্যবসার আইডিয়া এবং সফল হওয়ার ৩টি মূলমন্ত্র

পুঁজি ও অভিজ্ঞতা ছাড়া ছোট ব্যবসার আইডিয়া এবং সফল হওয়ার ৩টি মূলমন্ত্র বর্তমান সময়ে বেকারত্ব আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা। অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে ভালো

পুঁজি ও অভিজ্ঞতা ছাড়া ছোট ব্যবসার আইডিয়া এবং সফল হওয়ার ৩টি মূলমন্ত্র

অলসতা দূর করার উপায়: জীবন বদলে দেওয়ার আধুনিক গাইড

অলসতা দূর করার উপায়: জীবন বদলে দেওয়ার আধুনিক গাইড আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কোনো না কোনো সময় আলস্য গ্রাস করে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল

পুঁজি ও অভিজ্ঞতা ছাড়া ছোট ব্যবসার আইডিয়া এবং সফল হওয়ার ৩টি মূলমন্ত্র

বিক্রি বাড়ানোর কৌশল: অনলাইন ব্যবসায় ১০ গুণ প্রবৃদ্ধি আনুন

বিক্রি বাড়ানোর কৌশল: অনলাইন ব্যবসায় ১০ গুণ প্রবৃদ্ধি আনুন বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে শুধু ভালো পণ্য থাকলেই ব্যবসা সফল হয় না। পণ্যটি যে সত্যিই ভালো, তার

জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া: Mufti Rejaul Karim

জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া: Mufti Rejaul Karim

জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া: Mufti Rejaul Karim আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা সেই মহান সত্তার, যিনি আমাদের ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ধর্ম ইসলাম

জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া: Mufti Rejaul Karim

পহেলা বৈশাখ: ইসলাম কী বলে? Mufti Rejaul Karim

মুহতারাম হাজিরিন, বাংলা বর্ষপঞ্জির হিসেবে আরও একটি বছর আমাদের জীবন থেকে বিদায় নিল এবং নতুন একটি বছর শুরু হলো । সময়ের এই পরিবর্তন আমাদের স্মরণ

জালিমের জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া: Mufti Rejaul Karim

এ সপ্তাহের জুমার বয়ান: Mufti Rejaul Karim

এ সপ্তাহের জুমার বয়ান: Mufti Rejaul karim মুমিনের আত্মশুদ্ধি ও মহান আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার উপায় আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আজকের জুমার এই বরকতময় মজলিসে

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব ভালোবাসা  দিবস নিয়ে ইসলাম কি বলে

আমার সাথে কাজ করতে আগ্রহী? চলুন শুরু করা যাক!

50+ ই-কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি।  ৪ বছরের অভিজ্ঞতা। ক্লায়েন্ট সন্তুষ্টির হার 100% এবং পুনরাবৃত্ত গ্রাহকের হার 70 % । আপনার ব্যবসার জন্য সেরা ওয়েবসাইট  পেতে এখনই যোগাযোগ করুন।