তাকওয়া চর্চার মাস; পবিত্র মাহে রমজান
শুরুর কথা : মাহে রমাদানের প্রধান ও মূল লক্ষ্য হলো, বান্দাদের মাঝে তাকওয়া তথা খোদাভীতির সিফাত পয়দা করা। তাকওয়ার গুণকে বহুগুণে বৃদ্ধি ও শক্তিশালী করার জন্যই মূলত এ মাসের সিয়াম ও কিয়াম। তাই এ মাসের মূল কাজই হলো, তাকওয়া বৃদ্ধি করে নেওয়া। তাকওয়ার গুণের প্রতি আমরা সবাই মুখাপেক্ষী।
এটি এমন এক জিনিস যা একজন সাধারণ মুসলিম বা যে সবেমাত্র মুসলমান হয়েছে তার জন্য যেমন জরুরি, ঠিক একজন আলেম বা একজন আল্লাহর ওলীর জন্যও তেমন জরুরি। তাকওয়ার সর্বশেষ কোন সীমা নেই। জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রতিটি মুহুর্তে, এমনকি জীবনে আখেরি লামহা পর্যন্ত তাকওয়ার উপর থাকা একজন মুমিনের জন্য অতি আবশ্যিক একটি বিষয়। তাকওয়া মুমিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এজন্য আল্লাহ তায়ালা তাকওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। পবিত্র কুরআনে প্রায় ৮৪ বার তাকওয়ার কথা আলোচনা করে মানবজাতির সামনে তাকওয়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
আল্লাহ তায়ালার নিকট মর্যাদাপ্রাপ্তির একমাত্র মাধ্যম তাকওয়া
আল্লাহ তায়ালার কাছে মর্যাদাবান ও প্রিয় হওয়ার একমাত্র মানদ- হলো, তাকওয়া। যে যত বেশি মুত্তাকি হবে, যার অন্তরে যত বেশি আল্লাহর ভয় থাকবে, সে আল্লাহ তায়ালার কাছে ততবেশি সম্মানি ও মার্যাদাবান হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তোমাদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদা সম্পন্ন, যে তোমাদের মাঝে অধিক মুত্তাকি” সূরা হুজুরাত ১৩।
বিদায় হজের ভাষণে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বিষয়টি স্পষ্ট বলে গেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“অনারবের উপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আরবের উপর অনারবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্বেতাঙ্গের শেষ্ঠত্ব নেই কৃষ্ণাঙ্গের উপর। কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই শ্বেতাঙ্গের উপর। তাকওয়াই হলো, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাটি। (মুসনাদে আহমাদ ২৩৪৮৯ সহিহ)
আপনি চাইলে “রমজান প্যাকেজ” বইটি এখানে ক্লিক করে ক্রয় করতে পারেন।
তাই,তাকওয়ার গুণ হাসিল করা খুবই জরুরি একটি বিষয়। আর তাকওয়ার গুণ হাসিল হয়ে গেলে দুনিয়া আখিরাতে কোন ধরনের মুসিবতে পড়তে হবে না। বরং আল্লাহ তায়ালা সবকিছু সহজ করে দিবেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের কোন পথ তৈরি করে দিবেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিযিক দান করবেন যা তার ধারণার বাইরে”। (সূরা তালাক ২-৩)
তদ্রুপ, পরকালে মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে দ্বিগুণ প্রতিদান। প্রবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়লা বলেন,
“আর যে আল্লাহ তায়ালার সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে তার জন্য রয়েছে দু’টি জান্নাত”। (সূরা রহমান ৪৬)
তাকওয়ার পরিচয়
তাকওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহর ভয়-ভীতি ইত্যাদি। আর পরিভাষায় তাকওয়া বলা হয়
“আল্লাহ তায়ালার নির্দেশাবলি পালন করা ও নিষেধাবলি থেকে বিরত থাকা। (আল মুজামুল ওয়াসীত ১০৮০ )
আল্লামা সায়্যিদ শরিফ জুরজানী রাহি. বলেন,
هو صيانة النفس عما تستحق به العقوبة من فعل أو ترك
“শাস্তি যোগ্য কাজ-কর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখা” (আত-তারিফাত ৬৯ )
তাকওয়ার মূল কথা হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মুহাব্বত লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালার আদেশগুলো যথাযথভাবে পালন করা। আর তাঁর অসন্তুষ্টি ও শাস্তির ভয়ে নিষিদ্ধকাজগুলো থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
রমজানের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া সৃষ্টি করা
পবিত্র রমাদানের রোযার আসল মাকসাদ হলো মুমিনের অন্তরে আল্লাহ তায়ালার ভয় জাগ্রত করা। তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর ফরয করা হয়েছিল,যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। সূরা বাকারা ১৮৩
আয়াতটির সংক্ষিপ্ত তাফসীর
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মানুষদের সাধারণত দুইভাবে খেতাব (সম্বোধন) করেছেন।
সাধারণ খেতাব,
يايها الناسবলে সম্বোধন করেছেন। এসব আয়াতে আল্লাহ তালায়া মুসলিম,অমুসলিম সকলকে সম্বোধন করে বিভিন্ন ফরমান দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন যেহেতু গোটা মানবজাতির জন্য হেদায়েত। তাই,এসব আয়াতে সকল মানুষকে উদ্দেশ্য করে খেতাব করা হয়েছে।
يايها الذين امنواবলে খেতাব করেছেন। এসব আয়াতে শুধুমাত্র ঈমানদারদের বিশেষভাবে খেতাব করা হয়েছে। সাধারণত দুনিয়া,আখিরাতের বিশেষ কল্যাণ ও সফলাতার বার্তাবাহী কোন বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা এভাবে সম্বোধন করেছেন। পবিত্র কুরআনে প্রায় ৮৯ স্থানে আল্লাহ তায়ালা এভাবে খেতাব করে ঈমানদারদের বহুবিদ নির্দেশনা দিয়েছেন।
এসব স্থানে আল্লাহ তায়ালা ‘হে মুমিনগণ’ বলে সম্বোধন করেছেন।
আর মুমিন কারা ? তাদের পরিচয় অন্য আয়াতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের বন্ধু”। (সূরা বাকারা ২৫৭)
সুতরাং, আমরা আয়াতের তরজমা করতে পারি আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে আমার বন্ধুগণ!’
‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর রোযাকে ফরয করে দিয়েছেন’। আয়াতের এ অংশের মাধ্যমে আমাদের উপর রোযাকে ফরয করে দেয়া হয়েছে। তাই রোযা ফরয বা আবশ্যিক একটি বিধান। এমনকি এটি ইসলামের পঞ্চ-স্তম্ভের একটি। এজন্য রোযার প্রতি অবহেলার কোন সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে কঠোর ধমকিবাণী ও শাস্তির কথা এসেছে।
রোযা না রাখার ভয়াবহ শাস্তি
রোযা না রাখা বা রেখে ভেঙ্গে ফেলা অনেক বড় অপরাধ ও গোনাহের কাজ। এই গোনাহের কারণে আখেরাতে ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। এধরণের কিছু শাস্তির কথা তুলে ধরা হলো;
১. উল্টোকরে ঝুলিয়ে মুখের দুই প্রান্ত ছিড়ে ফেলা হবে : যারা রোযা ভেঙ্গে ফেলে বা রোযা রাখে না তাদেরকে উপুড় করে পায়ের মধ্যে ঝুলিয়ে মুখের দুই পার্শ¦ কেটে কেটে শাস্তি দেওয়া হবে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার নিকট দুই ব্যক্তি আগমন করল। তারা আমার বাহুদ্বয় ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে এল। তারপর আমাকে বলল, আপনি পাহাড়ের উপর উঠুন। আমি বললাম, আমি তো উঠতে পারব না। তারা বলল, আমরা আপনাকে সহজ করে দিব। আমি উপরে উঠলাম। যখন পাহাড়ের সমতলে পৌঁছালাম, হঠাৎ ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম, এ সব কিসের আওয়াজ? তারা বলল, এটা জাহান্নামীদের আর্তনাদ।
আরও পড়ুন: রাসূল (সা:) এর মর্যাদা ও শাতিমে রাসূলের শাস্তি
তারপর তারা আমাকে নিয়ে এগিয়ে চলল। হঠাৎ কিছু লোক দেখতে পেলাম, যাদেরকে তাদের পায়ের মাংসপেশী দ্বারা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এবং তাদের মুখের দুই প্রান্ত ছিড়ে ফেলা হয়েছে এবং তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি বললাম, এরা কারা? তারা বলল, যারা রোযা ভেঙ্গে ফেলে। মুসতাদরাকে হাকিম, হাদস-২৮৩৭ সহিহ
২. একটি রোযার পরিবর্তে আজীবন রোযা রাখলেও এর ক্ষতি শোধ হবে না : রমযান মাসের একদিন রোযা না রাখলে মানুষ শুধু গুনাহগারই হয় না, বরং ওই রোযার পরিবর্তে আজীবন রোযা রাখলেও রমযানের এক রোযার যে মর্যাদা ও কল্যাণ, যে রহমত ও খায়ের-বরকত তা কখনো লাভ করতে পারবে না এবং কোনোভাবেই এর যথার্থ ক্ষতিপূরণ আদায় হবে না। হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম বলেন,
“ যে ব্যক্তি অসুস্থতা ও সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমযানের একটি রোযাও ভঙ্গ করে, সে আজীবন রোযা রাখলেও ওই রোযার হক আদায় হবে না। ( সুনানে তিরমিযী ৭২৩ যয়িফ)
৩. একটি রোযা ভেঙ্গে ফেলার নগত শাস্তি ৬০টি রোযা রাখা : শরিয়তের বিধান হলো কেউ যদি একটি রোযা ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙ্গে ফেলে তাহলে এর পরিবর্তে ৬০টি রোযা কাফফারা হিসেবে রাখতে হয়। হাদিস শরীফে এসেছে,
“আবু হুরায়র রাযি. থেকে বর্ণিত: নবীজির যুগে এক ব্যক্তি রোযা ভেঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম তাকে নির্দেশ দেন, একটি গোলাম আযাদ করতে বা দুই মাস লাগাতার রোযা রাখতে বা ষাটজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াতে। (শরহু মাআনিল আসার ৩১৯৭, সহিহ বুখারি ১৯৩৭)
মুহতারাম হাযিরীন! একটি রোযার জন্য দুই মাস রোযা রাখতে হবে। তাও আবার ধারাবাহিকভাবে লাগাতার রোযাগুলো রাখতে হবে। কোন কারণে ধারাবাহিকতা ছুটে গেলে আবার নতুন করে রোযা শুরু করতে হবে। এমনকি অসুস্থতার কারণে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারলেও আবার নতুন করে ৬০টি রোযা রাখতে হবে। আর এই কাফফারার বিনিময়ে কেবল তার ফরজ দায়িত্বটা শুধু আদায় হবে। কিন্তু রমাদানের রোযা রাখলে যে পরিমাণ সাওয়াব ও খাইর বারাকাত পেত, তা কোনভাবেই পাওয়া সম্ভব হবে না।
যাদের রোযা না রাখার সুযোগ আছে
বেশ কয়েকশ্রেণীর লোক এমন আছে যাদেরকে বিভিন্ন ওযর ও অপারগতার কারণে রোযা না রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন,
১-২.মুসাফির ও অসুস্থ ব্যক্তি : তাদের জন্য রোযা না রাখার অনুমতি আছে তবে পরবর্তীতে এসব রোযা কাযা করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“ সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এ মাস পাবে, সে যেন এ সময় অবশ্যই রোযা রাখে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তবে অন্য দিনে সে সমান সংখ্যা পূরণ করবে।” সূরা বাকারা ১৮৫
৩-৪.গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিনী : যদি তারা রোযা রাখলে নিজের বা সন্তানের কোন ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা থাকে তাহলে রোযা না রাখার অনুমতি আছে ,তবে পরবর্তীতে রোযাগুলো কাযা করতে হবে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“ নিশ্চই আল্লাহ তায়ালা মুসাফির ,দুগ্ধদানকারিনী ও গর্ভবতী থেকে অর্ধেক সালাত ও সওম কমিয়ে দিয়েছেন। সুনানে আবি দাউদ ২৪০৮ সহিহ
৫. অতিশয় দুর্বল বৃদ্ধ ব্যক্তি : বার্ধক্যজনিত কারণে রোযা রাখতে সক্ষম না হলে রোযা না রাখার অনুমতি আছে। সেক্ষেত্রে এমন ব্যক্তি একজন গরীবকে প্রতি রোযার পরিবর্তে দু’বেলা তৃপ্তি সহকারে খাওয়াবে বা পৌনে দুই কেজি গমের মূল্য সদকাহ করে দিবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“ আর যাদের রোযা রাখা অত্যন্ত কষ্টকর তারা একজন মিসকিনকে খাবার খাইয়ে রোযার ফিদিয়া আদায় করতে পারবে।” সূরা বাকারা ১৮৪
অপরদিকে হায়েয ও নিফাসগ্রস্ত অবস্থায় মহিলাদের রোযা রাখার অনুমতি নেই। তারা পরবর্তীতে ছুটে যাওয়া রোযাগুলো কাযা করে নিবে। হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আয়েশা রাযি.কে ঋতুবতী অবস্থার রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন,
“আমাদেরকে তা পরবর্তীতে কাযা করার নির্দেশ দেওয়া হত”। সহিহ মুসলিম ৩৩৫।
‘তোমাদের উপর’ আল্লাহ তায়ালা রোযা ফরয করে বলেছেন, তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে। এমন বলেননি যে,
‘তোমাদের মুখের উপর বা তোমাদের পেটের উপর’। বরং সর্বাঙ্গের উপর রোযাকে ফরয করেছেন। তাই শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গের রোজা রয়েছে। রোযা রেখে প্রতিটি অঙ্গকে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বিরত রাখতে হবে। এজন্য জাবের রাযি. বলেন,
“যখন তুমি রোযা রাখবে তোমার কান, চোখ,জবানও যেন মিথ্যা ও গোনাহ থেকে রোযা রাখে। তোমার রোযার দিনগুলো অন্যান্য দিনের মতো বানিয়ে ফেলো না।”। )মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৮৮৮০)
মুহতারাম হাযিরীন ! শুধু না খেয়ে থাকার নামই রোযা নয়। বরং এর পাশাপাশি আমার প্রতিটি অঙ্গকে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বিরত রাখতে হবে। অন্যথায় শুধুমাত্র সারাদিন উপোস থাকা ছাড়া আর কিছুই প্রপ্তি মিলবে না।
তাই মিথ্যা, গিবত,পরনিন্দা, ছোগলখোরী,অন্যের দোষচর্চাসহ সব ধরণের গোনাহের কাজ থেকে বিরত থকতে হবে। আর না হয় এই রোযার কোন প্রতিদান আমি পাব না। এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস আমরা তুলে ধরছি..
১. রোযা রেখে মিথ্যাচার করলে রোযার কোন সওয়াব থাকে না। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ি কাজ পরিহার করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (সহিহ বুখারি ১৯০৩)
২. অন্য হাদিসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“ কত রোযাদার এমন আছে যাদের রোযার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত সালাত আদায়করী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।” (সুনানে ইবনে মাযাহ ১৬৯০ সহিহ )
৩. রোযাদারকে কেউ গালি দিলেও সে বলবে আমি রোযাদার। সে কোন ধরনের ঝগড়া বা গালমন্দ করবে না। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“তোমাদের কেউ যেন সিয়াম পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন রোযাদার”। (সহিহ মুসলিম ১১৫১)
৪. রোযা রেখে গীবত করলে রোযা ছিদ্র হয়ে যায়। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“রোযা জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য ঢাল স্বরূপ যতক্ষণ তা ছিদ্র না করে ফেলে। আবু মুহাম্মাদ বলেন, গীবতের মাধ্যমে রোযা ছিদ্র হয়ে যায়। (সুনানে দারেমী ১৭৭৩ হাসান)
‘যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর ফরজ করা হয়েছিল’। তাই রোযা নতুন কোন ইবাদত নয়। এটি পূর্ববর্তী শরিয়তেও ছিল। বরং সর্বকালেই এই আমলের প্রচলন ছিল। তাফসীরে রুহুল মাআ’নীতে এসেছে,
“যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছিল অর্থাৎ, আদম আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে বর্তমান পর্যন্ত সকল নবী ও উম্মতের উপর রোযা ফরয ছিল।” (রুহুল মাআ’নী ১/৪৫৩)
তবে রোযার ধরন ছিল বিভিন্ন রকম। পবিত্র কুরআনে হযরত মারইয়াম আ: এর রোযার ধরন বর্ণনা করে বলেন,
“মানুষের মধ্যে কাউকে যদি তুমি দেখ তখন বলিও, আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে রোযা মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে কথা বলব না।” ( সূরা মারইয়াম ২৬)
পূর্ববর্তী শরিয়তে যেমন, রোযার ধরন ভিন্ন ছিল, তেমনি সংখ্যার দিক থেকেও ভিন্নতা ছিল। এতে তারা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি করেছে। কেউ নির্ধারিত সংখ্যার উপর নিজেদের পক্ষ থেকে সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। আবার কেউ কেউ নিজেরাই আল্লাহর দেয়া নির্ধারিত সংখ্যা কমিয়ে ফেলেছে।
মুহতারাম হাযিরীন ! রোযার বিধান যেহেতুতুলনামূলক একটু কঠিন। তাই আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী উম্মতের কথা তুলে ধরেছেন এবং বলেছেন তাদের মতো তোমাদেরকেও রোযার বিধান দেওয়া হয়েছে। তোমাদেরকেই প্রথমে এই কঠিন বিধান দেওয়া হয়নি। তবে তারা এই বিধানে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি করেছে। তোমাদের থেকে যেন এরূপ না হয়। ইমাম শাওকানী রাহি, এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
واختلف المفسرون في وجه التشبيه ما هو؟ فقيل: هو قدر الصوم ووقته، فإن الله كتب على اليهود والنصارى صوم رمضان فغيروا وقيل: هو الوجوب، فإن الله أوجب على اْلمم الصيام فتح القدير للشوكاني )/৩ ৬৯২(
“ পূর্ববর্তীদের রোযার সাথে কোন দিক দিয়ে তুলনা করা হয়েছে এতে মুফাসসিরীনদের মাঝে মতভেদ রয়েছে, কারো বক্তব্য হলো ইহুদী-নাসারাদের উপর রমাদানের রোযা ফরয করা হয়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের পক্ষ থেকে এতে বিকৃতি সাধন করেছে। কারো বক্তব্য হলো, পূর্ববর্তীদের উপরও রোযা ফরয ছিল এদিকে তুলনা করা হয়েছে। (ফাতহুল কাদীর ১/২০৭)
‘যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো’। আয়াতের এ অংশে আল্লাহ তায়ালা রোজার আসল মাকসাদ বর্ণনা করেছেন। আর তা হলো, মুমিনের অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি হওয়া। আল্লাহ তায়ালা এ মাসে তাকাওয়া সৃষ্টির সকল ব্যবস্থাপনা করে দিয়েছেন।
আপনার জন্য চমতকার একটি বই, প্রশ্নোত্তরে সিয়াম ও রমজান ক্রয় করতে এখানে ক্লিক করুন
তাকওয়া সৃষ্টির অন্তরায় দুই জিনিস
মুহতারাম হাযিরীন ! মানুষ আল্লাহ তায়ালাকে ভয় না করা,আল্লাহ তায়ালাকে ভুলে থাকা এবং ভালো কাজ না করে আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি করার পিছনে দু’টি বড় শক্তি কাজ করে।
১. শয়তান: শয়তান সবসময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানুষকে আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘শয়তান তোমাদেকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়’। (সূরা বাকারা ২৬৮)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয় إ শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু” (সূরা ইউসূফ- ৫)
২. মানুষের নফস : মানুষের ভেতরে থাকা নফসও মানুষকে খারাপ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন “মানুষের নফস অবশ্যই খারাপ কাজের নির্দেশ দিয়েই থাকে।” (সুরা ইউসুফ -৫২)
মাহে রমজানে মুমিনের দুই শত্রুই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়
আল্লাহ তায়ালা কুদরতিভাবে এই দ্ইু শত্রুকে পবিত্র মাহে রমাদানে দমন করে রাখেন। এ মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা শয়তানকে শিকলে আবদ্ধ করে রাখেন। যার ফলে শয়তান এ মাসে মানুষকে কুমন্ত্রণা দিতে পারে না। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল (সা:) বলেন, “রমাদানের শুরুর রাতেই শয়তান ও দুষ্ট প্রকৃতির জিনদের শিকলে আবদ্ধ করে দেওয়া হয়।” (সুনানে তিরমিযী ৬৮২)
অপর দিকে রোযার কারণে নফসও দুর্বল হয়ে পরে। খারপ কাজের প্রতি আগের মতো উদ্ভুদ্ধ করতে পারে না। রোযার মাধ্যমে নফস নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। হাদিস শরিফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম বলেন,
“হে যুবকের দল! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ রাখে, সে যেন বিয়ে করে এবং যে বিয়ের সামর্থ্য রাখেনা সে যেন রোযা রাখে। কেননা, রোযা যৌন ক্ষমতাকে দমন করে। (সহিহ বুখারি ৫০৬৫)
আরও পড়ুন: কুরআন ও হাদীসের আলোকে রোজার ফজিলত
মুহতারাম হাযিরীন ! দুনিয়ার আন্তর্জাতিক নিয়মেও একই রকম একটি উপমা পাওয়া যায়। যেমন, কোন রাষ্ট্র যখন নতুন স্বাধীনতা লাভ করে তখন ওই রাষ্ট্রটি যতক্ষণ পর্যন্ত সামরিকভাবে পুন:প্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ওই রাষ্ট্রে অন্য কোন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হামলা করা বা আক্রমণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা মুমিনের তাকওয়াকে শক্তিশালি করার জন্য পুরো রমাদান মাসে মুমিনের প্রধান দুই শত্রু শয়তান ও নফসকে দুর্বল করে রাখেন,যাতে করে মুমিনকে কোন ধরনের কুমন্ত্রণা দিতে না পারে।
এই সুযোগে মুমিন যেন সহজে তাকাওয়ার বলে বলিয়ান হতে পারে এবং তাকওয়ার শক্তি বৃদ্ধি করে সামনের এগার মাস দুই শত্রুর মোকাবেলার জন্য মুমিন যেন প্রস্তুত হতে পারে এজন্য আল্লাহ তায়ালার মাহে রমাদানে এই বিশেষ আয়োজন করে রেখেছেন।
রোযা তাকওয়া চর্চার বাস্তব অনুশীলন
রোযা একমাত্র আমল যার পুরোটাই তাকাওয়া বা খোদাভীতির উপর নির্ভরশীল। এতে রিয়া বা লোক দেখানোর কিছু নেই। কারণ, কাঠফাটা রোদের দিনে দুপরের পর যখন গলা শুকিয়ে আসে, ইচ্ছা করলে মুমিন ঘরের দরজা বন্ধ করে খাবার-পানি গ্রহণ করতে পারে।
ইচ্ছা করলে মুমিন পুকুরে ডুব দিয়ে মানুষের অগোচরে পানি পান করতে পারে। এরপরও খোদার ভয়ে মুমিন পানাহার থেকে বিরত থাকে। এমন কি ইফতারের সময় অনেক প্রকার বাহারি আইটেম সমানে থাকে তথাপি আল্লাহর হুকুম আসার আগ পর্যন্ত মুমিন পানাহারের সাহস করে না। এসব কিছুই তাকওয়ার চর্চা। যত কষ্টই হোক আল্লাহর বিধানের সামনে মাথা নত করা। এটিই রোযার মুল রহস্য। আর এজন্যই হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন, “রোযা আমার জন্যই তাই আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।”( সহিহ মুসলিম,১১৫১)
শেষ কথা ! আল্লাহ তায়ালা এ মাসে আমাদের জন্য এত সুন্দর নিরাপদ আমলের পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছেন, এরপরও যদি আমরা তাকওয়া অর্জনে সফল না হতে পারি, বরং অভ্যাসগত কারণে গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ি, পবিত্রতম এ মাসকে গোনাহের সাক্ষী বানিয়ে ফেলি তাহলে আফসোসের শেষ থাকবে না। এজন্য এ মাসে সকল গোনাহ থেকে বিরত থেকে তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় অন্তরে তৈরী করার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
মুহতারাম, রমাদানে তাকওয়া পয়দা করার অর্থ হলো, বিগত এগার মাসে যে সকল নাফরমানি ও গোনাহের কাজ হয়েছে এগুলোর মাফ নিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি সারা বছর আমলে যে কমতি হয়েছে রমাদানে বেশি বেশি আমল করে তা পুষিয়ে ফেলা। আর সামনের এগার মাসের জন্য তাকওয়াকে এমন শক্তিশালী করে নেওয়া যাতে তা আমাদেরকে নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে পারে এবং খোদার নাফরমানি থেকে সারা বছর বিরত রাখতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এমন শক্তিশালি তাকওয়া দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।



